Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

মানবিকতার আবেদনে এক অমানবিক কান্ড

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২১, ০৬:৪৭ পিএম

মানবিকতার আবেদনে এক অমানবিক কান্ড
Swapno

৩৩৩ নম্বরে কল করে সরকারের খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়, এমন প্রত্যাশা থেকেই মানবিক সাহায্যের আর্তনাদ করেছিলো অর্থ সংকটে পরা বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। কিন্তু মানবিকতার বদলে তিনি পেয়েছেন অমানবিকতার এক রুপ।

 

তার ৪ তলা বিশিষ্ট বাড়ি রয়েছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে সাহায্য পাওয়ার বদলে উল্টো সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরার নির্দেশনায় ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা করতে হয়েছে অর্থ সংকটে থাকা বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও তার পরিবারকে। সহায়তা করতে না পাড়লে জেল; এমন হুমকি থাকায় আত্মমর্যাদা রক্ষায় শেষ সম্বল স্ত্রী’র গহনা বিক্রি করে দিতে হয়েছে ভর্তুকি। স্ত্রী’র গহনা বিক্রি ও ধারদেনা করে ৬৫ হাজার টাকা ব্যায়ে ১০০ জনের মাঝে চাল, আলু, ডাল, লবণ ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতে হয়েছে তাকে।  


অমানবিক এই ঘটনায় পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ভুক্তভুগী পরিবারকে ক্ষতিপুরণ দেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন। ঘটনার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে গঠন করেছেন তদন্ত কমিটিও। তবে, সাহায্য চেয়ে উল্টো রোষানলে পড়া বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিনের ভর্তুকি দেয়ার পেছনের গল্পটা যে কতটা নির্মম, সেই ক্ষতিপূরণ নিরূপন হবে কি দিয়ে? সেই প্রশ্নই তুলেছেন সচেতন মহল। এই ক্ষতিপূরন হবার মত নয় বলেও মন্তব্য করছেন অনেকেই।


ভুক্তভুগি ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ভাই শাহীন ও ভাইয়ের স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, ‘১০০ জনের খাবার দিতে না পারলে জেল হবে- এই লজ্জায় ফরিদ উদ্দিন আহমেদ শুক্রবার রাতে দু’বার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। মানসিক চাপে যদি ফরিদ উদ্দিন আত্মহত্যা করেই বসতেন, তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াতো। কী ক্ষতিপূরন দিতো প্রশাসন? সহায়তা চাওয়ার পর, নির্নয় করে যদি দেখতেন সে সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নয়, তাহলে তাকে সহায়তা না করলেই পারতো।

 

কিন্তু সহায়তাতো করলই না, উল্টো তার সাথে এমন অমানবিক ঘটনা ঘটলো। ভয়ে এবং সামাজিক আত্মমর্যাদা রক্ষায় ফরিদ উদ্দিন বাধ্য হয়ে নিজ স্ত্রী ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর অবশিষ্ট সম্পদ  গহনা বিক্রি ও ধার-দেনা করে জরিমানার অর্থ যোগাতে হয়েছে। মানবিক সহায়তা চেয়ে এক চরম অমানবিকতার শিকার হতে হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দিলে হয়তো সমপরিমান আর্থিক সহায়তা দিবে প্রশাসন। কিন্তু চাপের মুখে পড়ে স্বপরিবারে মানসিকভাবে যেই ক্ষতির শিকার হয়েছেন- সেই ক্ষতিপূরণ হবার নয়।’


নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানাধীন কাশিপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনাটি এখন টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে।
ভুক্তভুগি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, তার আর্থিক অবস্থা খুবই করুণ। কাজ করতে পারেন না। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অন্য মেয়ে টিউশনি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ জোগান। প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য নিয়মিত ওষুধ লাগে। তার নিজেরও দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। দুই চোখেই অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। তিনবার স্ট্রোক করেছেন। কোনো রকমের সঞ্চয় নেই তার। নিজের ওষুধ কেনারও পয়সা নেই। ছয় ভাই ও এক বোন মিলে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিতে চারতলা ভবন করেছেন। চারতলায় উপড়ে টিনসেডের দু’টি কক্ষে স্ত্রী ও দুই সস্তান নিয়ে বহুকষ্টে দিনাতিপাত করছেন। রেডিওতে সংবাদে তিনি জেনেছেন ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়। সরকারি সহায়তা পেতে তিনি কল করেছিলেন ওই নম্বরে। কিন্তু সহায়তা তো পাননি, উল্টো তিনি চারতলা ভবনের মালিক এমন তথ্যের কারণে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা গুণতে হয়েছে তাকে।


নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরার নির্দেশে তাকে ১০০ জনের মাঝে চাল, আলু, ডাল, লবন ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতে হয়েছে। ১০০ জনকে খাদ্য সামগ্রী দেওয়ার মতো সামর্থ্য তার নেই। নিজের স্ত্রী ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর গয়না বিক্রি ও ধার-দেনা করে বিতরণের জন্য এসব খাদ্যসামগ্রী কিনেছেন বলেও জানান। এমনকি স্থানীয় ইউপি সদস্য আইযুব আলীর থেকেও ধার নিয়েছেন ১০ হাজার টাকা।
এদিকে, এই ঘটনার জন্য দায়ি করা হচ্ছে স্থানীয় ৮নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীকে।

 

জানা গেছে, ফরিদ উদ্দিনের বাড়ির পাশেই ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীর বাড়ি। তিনি ফরিদ উদ্দিনের আর্থিক অবস্থার কথা জানতেন।  যেদিন ইউএনও তাকে জরিমানা তথা ১০০ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন সেদিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন আইয়ুব আলী। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, আইয়ুব আলী বলেছেন, জরিমানা ১০০ প্যাকেটই দিতে হবে। ৯৯ প্যাকেট দিলেও চলবে না। প্রশ্ন উঠেছে, আইয়ুব আলী সব জেনেও কেন তা ইউএনও’কে জানালেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে আইয়ুব আলী দাবি করেন, তিনি ইউএনওকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। অল্প জরিমানা করারও অনুরোধ করেছিলেন। তবে ইউএনও তার কথায় পাত্তা দেননি।  


এই বিষয়ে ইউএনও আরিফা জহুরার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়। ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী ফরিদ উদ্দিনের আর্থিক স্বচ্ছলতার তথ্যই দিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তি চারতলা ভবনের মালিক এবং যথেষ্ট স্বচ্ছল বলে জানিয়েছেন।’
এর প্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় গিয়ে ফরিদ উদ্দিনকে ১০০ গরীব মানুষকে সরকারি খাদ্য সহায়তার অনুরূপ প্যাকেট বিতরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়। গতকাল শনিবার খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন ইউএনও আরিফা জহুরা, সদরের এসিল্যান্ড হাসান বিন আলী, কাশীপুর ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আইয়ুব আলীসহ স্থানীয় এলাকাবাসী। এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করার সময় ইউএনও’র সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফরিদ উদ্দিন ও তার পরিবার। তারা জানান, ধার-দেনা করে তারা এই খাদ্যসামগ্রী কিনেছেন। তাদের পারিবারিক অবস্থা অস্বচ্ছল ছিল বলেই ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন। তারা চারতলা ভবনের মালিক না।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘ভুক্তভোগী তাঁর তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি, তাই এধরণের ঘটনা ঘটেছিল। যে টাকাটা তিনি ব্যয় করেছেন সেটির ক্ষতিপূরণ ইতিমধ্যে ৭৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। সদর ইউএনও’র মাধ্যমে ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে। এরবাইরে এখনো তাকে দেয়া হয়নি।  এঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামীম বেপারীকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’  

 

এদিকে শামীম ওসমান সদর উপজেলার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সদ্য  যে ঘটনাটি ঘটেছে ওই বৃদ্ধ লোকটিকে নিয়ে তা আমি জানি না। সত্যিকার ঘটনা জানার চেষ্টা করবো। যদি ওই লোকটি অভাবী হয় তবে ইউএনও কিংবা ডিসি নয়, আমিও ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করবো। 
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন