হাসপাতালে পরীক্ষা হলে, ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে যাবে কারা?
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২১, ০৮:০৬ পিএম
# বিনা চিকিৎসাতেও ফেরত যান অনেক রোগী
#এক্সরে করানোর লোক মাত্র ১ জন : সিভিল সার্জন
নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল। শহরের মন্ডলপাড়ায় অবস্থিত সরকারি এই হাসপাতালটি বহু বছরের পুরনো। তাই নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকার লোকজন চিকিৎসাসেবা নিতে এখানেই বেশি আসে। তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, দিন দিন হাসপাতালটিতে সেবার মান কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
পাশাপাশি এখানকার রোগীদেরও এ বিষয়ে রয়েছে নানান অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তাদের, তাদের (কর্মকর্তা) মতে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে খুব অল্প সংখ্যক রোগীই চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকে। বাকিদের কপালে জোটে শুধুই ভোগান্তি। কিন্তু কেন সরকারি এই হাসপাতালটিতে এসে সাধারণ রোগীরা আজ বিনা চিকিৎসায় ফিরে যাচ্ছে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল এখন এর চর্তুদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একাধিক নাম সর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর কাছে জিম্মি। এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলো তাঁদের অসংখ্য দালালদের মাধ্যমে এই হাসপাতালটিতে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে রামরাজত্ব্য চালাচ্ছে। ফলে হাসপাতালের চিকিৎসার মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি এখানে আসা রোগীরা নানা ভাবে ভোগান্তি শিকার হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই হাসপাতালের এক তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারী বলেন, আমাদের এখানে এক্সরে মেশিনসহ রোগীদের বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য যে সকল আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন তার সবই আছে। কিন্তু অধিকাংশ রোগীরাই বিশেষ প্রয়োজনে এসব আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারেনা। কারণ সরকারি হাসপাতালেই যদি রোগীরা এ সকল আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের দেখা পেয়ে যায়, তাহলে ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে যাবে কারা?
তাই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, সত্যিই বিশেষ প্রয়োজনে রোগীরা ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারেনা। গতকাল হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আনোয়ার নামে এক চায়ের দোকানী বলেন, কিছুদিন আগে সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালে এক ভদ্রলোক এসেছিলো তাঁর মেয়কে নিয়ে। মেয়টির পা এমন ভাবেই ভেঙেছিলো যে, চামড়ার ওপর দিয়ে রক্ত পড়ছিলো। তখন শহরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই আমি সেই ভদ্রলোকের সাথে ধরাধরি করে মেয়টিকে নিয়ে জরুরী বিভাগে যাই। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ডাক্তার সাহেব বললেন, এক্সরে করতে হবে কিন্তু এখানে নয়! ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে যেতে হবে। এক্সরে রিপোর্ট দেখার পর ব্যবস্থা।
এতে লোকটি অনেক কষ্ট করেই বৃষ্টির মধ্যে তার মেয়কে নিয়ে ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে যায়। পরবর্তীতে সেখান থেকেই পুরো চিকিৎসা করিয়েছে, আর এখানে আসেনি। কিন্তু হাসপাতালে এক্সরে মেশিন থাকা সত্বেও কেন সেদিন ঐ ব্যক্তি এক্সরে করাতে পারেনি? এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, মূলত দুপুরের পর আমাদের এখানে এক্সেরে করা বন্ধ হয়ে যায়। তাই এ সময় কোন রোগীর এক্সরের প্রয়োজন হলে তাকে বাধ্য হয়েই বাহিরের ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে যেতে হয়। কিন্তু এর পেছনে অন্যকোন কারণ আছে কিনা সেটা জানা নেই।
জানতে চাইলে এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহম্মেদ বলেন, দুপুরের পরে কেউ যদি হাসপাতালে আসে এবং তার যদি এক্সরের প্রয়োজন হয় তাহলে তাকে বাইরে থেকেই এক্সরে করাতে হবে। কারণ আমাদের এখানে এক্সরে করানোর জন্য মাত্র ১ জন লোক আছে। তাই তাকে দিয়েতো আর ২৪ ঘন্টা ডিউটি করানো যাবেনা। মূলত ব্রিটিশ আমল থেকেই এই হাসপাতালে দুপুর পর্যন্ত এক্সরের নিয়ম চালু আছে। কিন্তু এখানে লোকবল বৃদ্ধি করা গেলে হয়তো সারাক্ষণই রোগীরা এই হাসপাতাল থেকেই এক্সরে করাতে পারবে।
এদিকে, ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে শুধু এক্সরেই নয়, আরো অন্যান্য পরীক্ষাও ঠিক মতো করানো হয়না। আর এর পেছনে বিভিন্ন ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর হাত রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। কারণ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের পাশেই ইউনাইটেড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, একতা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও নিউ হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি নাম সর্বস্ব রোগ নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।
এসব রোগ নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে গেলেই দেখা যায়, রক্তপরীক্ষা, এক্সরে, ইসিজি, প্রস্রাবপরিক্ষাসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য শত শত রোগী প্রতিদিন ভীড় জমায়। তবে রোগ নির্ণয়ের জন্য আসা এসব রোগীদের মধ্যে অধিকাংশ রোগীই ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল থেকেই আসে বলে জানান ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের কর্মকর্তারা। আর এসব রোগীদের ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে আসার পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ্য ও চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় হাত আছে বলেও জানান এরা।


