# ৬ ঘন্টার ব্যবধানে শহরে দুই খুন
# রাতে অনিরাপদ নারায়ণগঞ্জ, বেপরোয়া হোন্ডাবাহিনী
# পুলিশের টহল ও জনগণের সচেতনতা বাড়াতে হবে : এসপি
আবারও অশান্ত হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জ। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক পরিবারের সদস্যের কাছের লোক হতে গিয়ে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা প্রত্যেকেই নতুন করে খোলস মুক্ত হচ্ছেন। তাদের রয়েছে হোন্ডা বাহিনীও। যারা দিনে রাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহর থেকে শহরতলী। ইতিমধ্যেই এসব সন্ত্রাসী বাহিনীর বিষয়ে মাঠে নেমেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা।
এদিকে, সন্ত্রাসীদের দাপটে নারায়ণগঞ্জে যখন গরম হাওয়া বইছে, তখন আশপাশে ঘটে চলেছে একের পর এক রোম হর্ষক ঘটনা। বাড়ছে খুন, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত। গত ২৮ জুন রাতে মাত্র ছয় ঘন্টার ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে পৃথক স্থানে দুটি হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়। এর মধ্যে রাত সাড়ে নয়টার দিকে শহরের চাষাঢ়া রেলস্টশন এলাকায় একটি এবং ভোরে ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় দ্বিতীয়টি।
জানা গেছে, মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার ও একটি ক্লাবকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাষাঢ়ায় ক্লাবটি পরিচালনা করতেন মানিক ও শামীম। আর সেখানেই আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিলো ইসদাইর বুড়ির দোকান এলাকার জুয়েল ও সোহাগ গ্রুপ। মাদক ব্যবসা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিলো বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
এই অবস্থায় গত সোমবার রাতে চাষাঢ়া রেলস্টেশন এলাকায় উভয় পক্ষ ধারালো অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে। এতে রুবেল (৩২) নামে এক যুবক নিহত এবং জুয়েল (৩২), জামান (২৮), চঞ্চল (২৮), হাফিজুল (১৮) ও সোহাগ (৪০) নামে কয়েকজন আহত হয়। সূত্রের দাবী, সংঘর্ষকারী উভয় পক্ষই নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী একটি পরিবারের অনুসারী ছিলেন।
এদিকে, ওই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ছয় ঘন্টা ব্যবধানে ফতুল্লা ইসদাইরস্থ ওসমানী স্টেডিয়ামের প্রধান গেইট সংলগ্ন শুকতারা ক্লাব গলির সামনে ঘটে আরো একটি রোম হর্ষক হত্যাকাণ্ড। ভোর ৪টার দিকে মাসদাইর কাজীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ইজিবাইক চালক রাজা মিয়া (৫৫)’কে অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারীরা জবাই করে ইজিবাইক ছিনিয়ে নেয়। তিনি কাজীবাড়ি এলাকার আবুল হাজীর বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করে একই এলাকার বাসিন্দা জামাল শেখের ইজিবাইক ভাড়ায় চালিয়ে আসছিলেন। চাষাঢ়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতিমধ্যেই চারজনকে আটক করা হলেও ইসদাইর এলাকায় সংঘঠিত ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুজ্জামান দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘চাষাঢ়ায় যেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, ওই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ৬ জনকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। তবে, ইসদাইর এলাকায় চালককে খুন করে ইজিবাইক ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায়নি। আমাদের সর্বাত্বক চেষ্টা চলছে। আশা করছি, দ্রুতই ওই ঘটনায় জড়িতদেরও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এর আগে, গত ২০ জুন ফতুল্লার হাজীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে হৃদয় (২৫) নামক এক যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত হৃদয় হাজীগঞ্জ উচাবাড়ির খোকন মিয়ার পুত্র। একটি সূত্র জানিয়েছে, মাদক কারবারের জেরে খুন হয় হয় হৃদয়। এদিকে, চলতি মাসের ১৮ তারিখে ফতুল্লার পিলকুনি পেয়ারা বাগান এলাকায় যাত্রীবেশে দূর্বৃত্তরা আনোয়ার হোসেন নামে এক ইজিবাইক চালককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ইজিবাইক ছিনিয়ে নেয়। নিহত আনোয়ার হোসেন চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার আশ্রাবপুর গ্রামের আবুল হাশেম মজুমদারের ছেলে।
গত ১ জুন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভা এলাকার গন্ধর্বপুর নামাপাড়া এলাকায় যুবলীগ কর্মী সোলায়মান (৩০) মিয়াকে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে এবং কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের লোকজন। গত ২৬ মে ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকায় পপি নামে এক গৃহবধুকে গলা কেটে হত্যা করে তার স্বামী হিরা। ওই ঘটনায় খুনি স্বামীকে গ্রেফতারও করে পুলিশ।
অন্যদিকে, গত ২৪ জুন রাতে ফতুল্লার বুড়িগঙ্গা নদীর বক্তাবলী এলাকায় যাত্রীবাহী ট্রলারে নগদ টাকাসহ প্রায় ৮ লাখ টাকার মালামাল লুটে নেয় সংঘবদ্ধ ডাকাত দল। এসময় ডাকাতদের হামলায় ট্রলারে থাকা নারীসহ ১০/১২ জন আহত হন। ওই ঘটনায় রতন শেখ নামে এক ভুক্তভুগি বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৮/৯ জনকে আসামী করে ২৭ জুন ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে নৌ থানা পুলিশ।
এভাবে প্রতিনিয়তই ঘটছে খুনের ঘটনা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছিনতাই। বিশেষ করে রাতে শহরের লিংক রোড ও বঙ্গবন্ধু সড়ক সহ অন্যান্য সড়কে চলাচল রত পণ্যবাহি গাড়ি থেকেও কৌশলে মালামাল ছিনতাই করে থাকে একাধিক চক্র। এই অবস্থায় আতঙ্ক বিরাজ করছে নগরবাসির মাঝে। এতে করে রাতের নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছে অনিরাপদ।
রাতে নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী একটি মহলের কর্মী পরিচয়ে এমটি উশৃঙ্খল বাহিনী মটর সাইকেলের মহড়া দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন। এদের বিরুদ্ধে দ্রুতই আইনী ব্যবস্থা নেয়ার দাবিসহ নারায়ণগঞ্জে প্রশাসনের তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করার অনুরোধ জানিয়েছেন নগরবাসী।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল আলম দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘চাষাঢ়ায় দুই গ্রুপের মারামারিতে যেই খুনের ঘটনা ঘটেছে, সেটা বিচ্ছিন্ন, তবে ইসদাইরে চালককে খুন করে ইজিবাইক ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আমরা বিচ্ছিন্ন মনে করছি না। কারণ এর আগেও ফতুল্লায় ইজিবাইক ছিনতাই ও চালককে খুনের ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজনই গ্রেফতার হয়েছে এবং মূল হোতাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে, এই অবস্থাতেই আরেকটি ঘটনা ঘটলো। তাই এগুলো কোন একটি চক্র ঘটিয়েছে কিনা, সেটা দেখার বিষয়। আমরা সেভাবেই কার্যক্রম চালাচ্ছি। অটো ছিনতাইয়ের কোন চক্র গড়ে উঠলো কিনা, তা উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতারে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, দ্রুতই জড়িতদের গ্রেফতার ও তাদের কার্যক্রম উন্মোচন করতে পারবো।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি সড়কেই আমাদের একটি করে মোবাইল টিম থাকে। কাল ভোরে যেই স্থানে ঘটনা ঘটেছিলো, তার খুব কাছেই মোবাইল টিম ছিলো। কিন্তু পুরো রাস্তাতো পুলিশ সেভাবে কাভার করতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি, পুলিশের টহলের পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে রাত ১০-১১টার পরে যারা অটো চালাবে, তাদের উদ্দেশ্যে আমরা বলেছিলাম যে, যাত্রীর মোবাইল নম্বর আগেই সংগ্রহ করে তার পরিবারের কাছে দিয়ে রাখা এবং রাত্রীকালিন চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করা। তাহলেই এই ধরনের ঘটনা কমানো সম্ভব। মোট কথা টহলদারির পাশাপাশি জনগণেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।


