ইসদাইর ও চাষাঢ়া রেলস্টেশনে মাদকের মাসোহারাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় এখানো পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে আট জন। গ্রেফতারকৃত আট জনের মধ্যে রয়েছে ফতুল্লা ইউনিয়ন ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন শিমুল। তিনি ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুমের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত। মাসুমের রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের যেকোন কর্মকান্ডের অগ্রভাগে দেখা যায় ফারুক হোসেন শিমুলকে। শিমুল ইসদাইরে ডিস, ইন্টারনেট ও ইট-বালুর ব্যবসা করতেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী হওয়ার পর তার সহযোগি জামান, জুয়েল ও সোহাগসহ অন্যান্যদের নিয়ে চাঁনমারি বস্তি ও ইসদাইরসহ চাষাঢ়া রেলস্টেশন এলাকার মাদকের স্পট থেকে মাসোহারা আদায় করে আসছিলো। এর মধ্যে চাষাঢ়ার মাদক কারবারীদের কাছ থেকে গত দু’মাস ধরে ৫০ হাজার টাকা করে এক লাখ টাকা মাসোহারাও আদায় করে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। এছাড়া, এলাকায় কোন জমি কেনা বেচা হলে সেখান থেকে চাঁদা আদায় এবং ভবন নির্মান করলে তাদের কাছ থেকে ইট-বালু সিমেন্ট নিতে একপ্রকার বাধ্য করতো।
চাষাঢ়া রেলস্টেশনে রুবেল হত্যা মামলায় শিমুলসহ অন্যান্যরা গ্রেফতার হওয়ার পর এসব তথ্য বেড়িয়ে আসতে শুরু করে। এদিকে, শিমুল ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুমের ছত্রচ্ছায়ায় চলাফেরা করায় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুমকে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেয়া মাসোহারা ও অন্যান্য সেক্টর থেকে উত্তোলনকৃত চাঁদার টাকা শিমুল ও তার সহযোগিদের শেল্টারদাতার পকেটে যেত বলেও এলাকায় চাউর হচ্ছে।
শিমুল ও তার সহযোগিদের প্রসঙ্গে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুম দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেছেন, ‘শিমুলকে আমি অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে করতাম। তাকে আমি বিশ্বাসও করতাম যে, সেকোন অবৈধ কাজ বা অবৈধ উপার্জনের সাথে জড়িত নয়। কিন্তু ওই ঘটনার পর জানতে পেরেছি যে, মাদকের টাকা নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। এটা জানার পর আমি নিজেই হতবাক হই। কারণ শিমুলসহ অন্যরা বলতো যে, তারা মাদক উৎখাতের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এসব চাঁদা বা মাসোহারার বিষয়ে আমি কিছুই অবগত নই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিমুল আমার রাজনৈতিক কর্মী ছিলো তা ঠিক। এখন সে এমন একটি ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ায় আমার দিকে প্রশ্ন উঠাও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আমি এসবের বিষয়ে অবগত নই।’
জানা গেছে, গত ২৮ জুন মাদকের মাসোহারাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় নির্দোষ রাজমিস্ত্রী রুবেল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৩০ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেছেন নিহতের ভাই। এই মামলার এজাহারে উভয় পক্ষকেই আসামীর তালিকায় আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে উভয় পক্ষের মোট ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো শিমুল, সম্রাট, সেলিম, আলী, রাকিব ওরফে টাইগার, বিজয়, মনির হোসেন ও শাহতাজ।
একটি সূত্র জানিয়েছে, চাঁনমারির মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের পর ইসদাইর বাজার ও চাষাঢ়া রেলস্টেশন এলাকার মাদকদের স্পট থেকে মাসোহারা পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো জামান সোহাগ ও শিমুল। একপর্যায়ে তারা মসোহারা আদায়ের লক্ষ্যে ইসদাইর রেললাইন বস্তি ও চাষাঢ়া রেলস্টেশনে কয়েক দফা মহড়া দেয়। অতঃপর ইসদাইর ও চাষাঢ়া রেলস্টেশনের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম ও মানিক বাহিনী জামান-শিমুল গ্রুপের দাবি মেনে নেয় এবং মাসে ৫০ হাজার টাকা করে মাসোহারা দেয়া শুরু করে।
গত দু’মাস তারা ৫০ হাজার টাকা করে মাসোহারা দিয়ে আসছিলো। কিন্তু মাসোহারার টাকার পরিমান আরো বাড়ানোর দাবি করছিলো জামান ও শিমুল গ্রুপ। এতে রাজি না হওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যেই উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। এই অবস্থায় জামান গ্রুপের লোকজন শামীম গ্রুপের এক সদস্যকে মারধর করে। অতঃপর গত ২৮ জুন রাতে শামীম ও মানিক গ্রুপের লোকজন ঘটনা মিমাংসা করার কথা বলে জামানকে ডেকে পাঠায়। কিন্তু জামান সেখানে যেতে আপত্তি জানালে তাদের গ্রুপের সোহাগ রাত সাড়ে নয়টার দিকে নিজেই শামীম ও মানিকের আহবানে চাষাঢ়া রেলস্টেশনে যায়। এসময় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা মাদক ব্যবসায়ী শামীম ও মানিক গ্রুপ ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোহাগকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপাতে থাকে। ঘটনা দেখে পাশে থাকা রুবেল নামে এক রাজমিস্ত্রি ভয়ে দৌড়ে পালানোর সময় শামীম ও মানিক গ্রুপের লোকজন ওই রাজমিস্ত্রি রুবেলকে জামান গ্রুপের লোক ভেবে এলোপাথারী কুপিয়ে হত্যা করে।
জানা গেছে, দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ী শামীম ও মানিককে সেল্টার দিয়ে আসছে ইসদাইরের নাসির নামে এক সন্ত্রাসী। নাসির হাজী সাহেব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া প্রভাবশালী পরিবারের এক সদস্যের অনুসারী। নাসিরও এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে এলাকায় বলয় তৈরী করেছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। তার সেল্টারে শামীম ও মানিক গ্রুপ ক্রমশই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।


