১০ মাসে তিন দুর্ঘটনায় ১২০ জনের প্রাণহানি
শাহজাহান দোলন
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২১, ০৫:৫১ পিএম
# এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধে দ্রুতই আমাদের ১০ টি ইউনিট মাঠে নামবে - ডিসি
# দায়ীদের সঠিক বিচার না হওয়াতেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে - এবি সিদ্দিক
গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের তল্লায় একটি মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৩৪ জনের প্রাণহানি দিয়ে শুরু হয় নারায়ণগঞ্জে মৃত্যুর মিছিল। এরপর চলতি বছরের ৪ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩৪ জন এবং সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ৮ জুলাই রূপগঞ্জের হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে এ পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে সব মিলিয়ে গত ১০ মাসে নারায়ণগঞ্জে তল্লা ট্রাজেডি, শীতলক্ষ্যায় কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চ ডুবি ও রূপগঞ্জের এই অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১২০ জন নিরহ মানুষের প্রাণ গেছে। তাই পৃথক এই তিনটি ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ জেলা নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব দূর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য অনেক নিয়ম কানুন আছে; তবে এগুলো কার্যকরে আমাদের সরকারি অথোরটি ব্যর্থ হওয়ায় একের পর এক দূর্ঘটনা ঘটছে। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দ্রুতই এই অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলো রোধে প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিট অ্যাকশনে যাবে।
রূপগঞ্জে কারখানায় আগুনে পুড়ে ৫২ জনের মৃত্যু : গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর। কিন্তু এরমধ্যেই কারখানার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে তিন জনসহ আগুনে পুড়ে প্রায় ৫২ জনেরও বেশি শ্রমিক মারা যায়। এছাড়া এই প্রতিবেদন লিখার আগ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত শ্রমিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন বলে জানা গেছে। আর এদের অধিকাংশের অবস্থাই সংকটাপন্ন। জানা যায়, কারখানাটিতে অতিমাত্রায় দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন ভবনের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে মূলত কি কারণে এই আগুনের সূত্রপাত সেটি এখনো সকলের অজানা। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারাখানাটিতে পর্যাপ্ত বের হওয়ার ব্যবস্থা ছিলনা এবং অগ্নিকান্ডের পর কারখানার প্রায় অধিকাংশ গেটই বন্ধ ছিলো। এতে অনেকেই দূর্ঘটনা এড়াতে পারেনি। সেপ্টেম্বর মাসে তল্লায় লোভ ও অবহেলার বলি ৩৪ জন : গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের তল্লায় একটি মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফরণের ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ৩৭ জন মুসুল্লির মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়।
পরবর্তীতে জানা যায়, তল্লার সেই মসজিদটির পাশে তিতাসের একটি লিকেজ গ্যাসের পাইপ ছিল। তাই প্রায় সময় নামাজ পড়তে আসা মুসুল্লিরা মসজিদে গ্যাসের গন্ধ পেত। এতে গ্যাসের লিকেজ বন্ধ করতে মসজিদ কমিটি তিতাসকে বিষয়টি জানালেও, তিতাসের ঠিকাদার মসজিদ কমিটির কাছে গ্যাস লাইন মেরামতের জন্য ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু ঠিকাদারের সেই ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করার আগেই, মসজিদে সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটে যায়। সূত্র জানায়, এ ঘটনার পর ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে, সেই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সি.আই.ডি। তবে সি.আই.ডি প্রথমে এই ঘটনার জন্য তিতাস কর্তৃপক্ষ, ডি.পি.ডি.সি ও মাসজিদ কমিটির সদস্যদের লোভ ও অবহেলাকে এর জন্য দায়ী করেন। অথচ দেখা যায় পরবর্তীতে তিতাসের আটজন কর্মকর্তাকে বাদ রেখেই তারা আদালতে চার্জশিট দেন। এতে তিতাসের ৮ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হলেও, পরে এরা জামিনে বেরিয়ে স্বপদে বহাল হন। আর এই দূর্ঘটনার পর তিতাসের কর্মকর্তাদের এতো সহজে রেহাই পেয়ে যাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহতদের পরিবারের সদস্যসহ নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের লোকজন।
বেপরোয়া কার্গো জাহাজের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩৪ জনের : গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লা ঘাট এলাকার সাবিত আল হাসান নামে একটি মুন্সিগঞ্জ গামী লঞ্চকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায় এস.কে.এল-৩ নামের এক বড় কার্গো জাহাজ। এতে প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। এদিকে ঘটনার পর সেখান থেকে ৩৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। সূত্র জানায়, শীতলক্ষ্যায় সেই লঞ্চডুবির ঘটনার জন্য মালবাহী জাহাজ এস.কে.এল-৩ এর চালকের বেপরোয়া গতি ও দূর্ঘটনাস্থলের পাশেই নিমাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের ত্রুটিকে দায়ী করেছিল নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের গঠিত এটি তদন্ত কমিটি। এছাড়া এই দুর্ঘটনার পর বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ কার্গো জাহাজের চালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেন। সেই মামলায় হত্যার উদ্দেশ্যে বেপরোয়া গতিতে কার্গো জাহাজটি ধাক্কা দিয়ে লঞ্চটি ডুবিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে দূর্ঘটনার চারদিন পর মুন্সিগঞ্জের গজারীয়া থেকে চালক ও ১৪ জন স্টাফসহ কার্গো জাহাজটি আটক হলেও, পরে এদের সকলেই ছাড়া পেয়ে গেছে।
এসব দূর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এবি সিদ্দিক বলেন, এসব দুর্ঘটনাগুলো প্রতিরোধে আমাদের কাছে অনেক নিয়ম কানুন আছে, তবে সরকারি অথোরটি এসব কার্যকরে ব্যর্থ হওয়ায় একের পর এক দূর্ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া দেখা যায়, অধিকাংশ বড় বড় দূর্ঘটনার পরই অভিযুক্তদের সঠিক বিচার হয়না। এটাও কিন্তু দূর্ঘটনা বৃদ্ধির একটি কারণ। তাই আমি নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে এ সকল দূর্ঘটনা বন্ধে প্রশাসনকে আরো কঠোর হওয়ার আনুরোধ করছি।
আর দ্রুতই এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা প্রতিরোধে নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনকে মাঠে নামানো হবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, আপনারা দেখেছেন যে; এ পর্যন্ত নারায়ণঞ্জে সবকটি অনাকাঙ্খিত ঘটনার পরপরই আমরা এর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। সর্বশেষ শীতলক্ষ্যায় যে লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে এতোও আমরা অনেক বড় রিপোর্ট মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পাঠিয়েছি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে অনেক কলকারখানাই দূর্ঘটনা এড়াতে সরকারি বিধি নিষেধ অমান্য করে থাকে। সর্বশেষ রূপগঞ্জে যেই অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে এতেও আমরা ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, সেখানে পর্যাপ্ত বের হওয়ার রাস্তা ছিলোনা। অন্যদিকে কারখানার অধিকাংশ গেইটই নাকি তখন বন্ধ ছিলো। তাই দ্রুতই আমরা এই ধরণের দূর্ঘটনা এড়াতে নারায়ণগঞ্জের ১০ টি ইউনিটের সাথে বসে আলোচনা করে এসব কলকারখানর বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাবো।


