মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন শ্রমিক ও নিহতের স্বজনরা
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২১, ০৬:০৩ পিএম
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেড নামে একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ৫২ জনের নিহতের ঘটনায় মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন শ্রমিক ও নিহতের স্বজনরা। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানার ভবনের প্রতিটি তলায় ক্যামিকেল ও ক্যামিকেল মিশ্রিত কাঁচামাল ছিলো। আর এসব ক্যামিকেলের কারণে আগুনের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া শ্রমিকদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানা চলাকালিন সময়ে মালিকপক্ষ গেইট গুলো তালাবদ্ধ করে রেখেছে। আর আগুন লাগার সাথে সাথে শ্রমিকরা বের হতে পারে নাই। শ্রমিক ও নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, হাসেম ফুড কারখানাটি অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চলতো। এ কারখানাটিকে অগ্নিনির্বাপনের কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এছাড়া কারখানাটিতে বেশিরভাগই শিশু শ্রমিক কাজ করতো। এছাড়া কারখানাটি অতিরিক্ত খাদ্য পণ্যে অতিরিক্ত ক্যামিকেল ব্যবহার করতো। এ কারণেই অতিরিক্ত ক্যামিকেলের কারণে আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের এতো দেরি হয়। এছাড়া কারখানাটির ভবন থেকে বের হতে শ্রমিকদের জন্য কোন ইমারজেন্সী এক্সিটের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এছাড়া নিহত শ্রমিকদের মাঝে বেশিরভাগই শিশু।
১২ বছর বয়সী শিশু শ্রমিক বিশাখা রানী ক্ষোভের সূরে বলেন, বাবা মাসহ আমাদের ৫ বোনের সংসার। বেতন ভাতা ও ওভার টাইম না পাওয়ায় আমরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম। এ কারণে আমরা শ্রমিকরা বেতনের ভাতার দাবিতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করি। আর এই ক্ষোভেই কারখানা মালিপক্ষ এই ভবনে আগুন লাগিয়ে আমার স্বপ্না রানীসহ অন্যান্য শ্রমিকদের হত্যা করে। আমরা এ হত্যার বিচার চাই। নিখোঁজ শ্রমিক তাছলিমা আক্তারের বাবা আক্তার হোসেন বলেন, মালিকপক্ষের দোষেই কারখানায় আগুন লাগে। এছাড়া মালিকপক্ষ শ্রমিকদের চারতলায় আটকে রেখে হত্যা করে। আমরা এ নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার চাই।
নিখোঁজ শ্রমিক অমৃতা রানীর (১৭) বোন রোজিনা আক্তার জানান, তার বোন ওমৃতা আক্তার চারতলায় কাজ করছিল। ওমৃতা রানী বলছিল মালিকপক্ষ তাদের আটকিয়ে রেখে জোর করে ১২ ঘন্টা ডিউটি করাতেন। ঘটনার দিনও তারা কেচিগেট তালা দিয়ে রাখায় চারতলার কোন শ্রমিক বের হতে পারেনি। হাসেম ফুড লিমিটেড কারখানাটির যে ভবনটিতে আগুন লেগেছে সে ভবনটি বিল্ডিং কোড না মেনে করা হয়েছে। অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কারখানাটি পরিচালনা করায় এ অগ্নিকান্ডে সূত্রপাত হয়। কারখানা অন্যান্য শ্রমিক আরো অভিযোগ করে বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন ভাতা ঠিক মতো পরিশোধ করেন না। শ্রমিকরা বেতন চাইলে মালিকপক্ষ তাদের মারধরসহ ও চাকুরীচ্যুত করা হুমকি ধামকি প্রদান করেন। কারখানাটিতে দুটি গেট থাকলেও একটি গেট কারখানা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে রাখে। কোন দুর্ঘটনা হলে শ্রমিকরা দ্রুত গতিতে বের হতে গেলেও শ্রমিকদের পদদলিত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ যুগের চিন্তাকে বলেন, এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। অগ্নিকান্ডে যারা নিহত হয়েছে তাদের প্রত্যোকের পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য নগদ ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের পরিবারদের নগদ ১০ হাজার টাকার করে দেওয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক অপারেশন অফিসার জিল্লুর রহমান বলেন, গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টা থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হাসেম ফুডে জীবনের ঝুকিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনের কাজ শুরু করেন। চারতলা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। শুক্রবার চতুর্থ এ পর্যন্ত ৪৯ টি লাশ উদ্ধার করে হয়েছে। লাশ গুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও হতাহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক) বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে হতাহতের ব্যপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া এ ঘটনার ব্যপারে তদন্ত কমিটির উপর ছেড়ে দেয়া হলো। কারখানার অব্যবস্থাপনার কারনে যদি এ ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সে ব্যপারেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


