কারখানার ভবনের নিচতলায় যখন আগুন লাগে তখন প্রায় প্রতিটি ফ্লোরের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেয় আর তখন কারখানার কর্মকর্তা নামক ব্যক্তিরা তাদের জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করেন। কাজ বন্ধ না করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করেছেন কারখানার শ্রমিক ও নিহতদের স্বজনরা। বৃহস্পতিবার রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতার কর্ণগোপ এলাকার হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ কারখানার একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুক্রবার সকালে নিখোঁজ হওয়া শ্রমিকদের স্বজনদের মধ্যে যারা কারখানার সামনে উপস্থিত ছিলেন তারা এই অভিযোগ করেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় সংঘটিত হওয়া অগিকাণ্ডের পর প্রায় ছয়টা সাড়ে ছয়টার দিকে তাদের সাথে যখন মোবাইল ফোনে কথা বলেন তখন কারখানায় আবদ্ধ হওয়া শ্রমিকরা তাদের স্বজনদের জানান, কারখানার ম্যানেজার তাদের তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। এখানে উপস্থিত থাকা স্বজনদের বেশীরভাগই অভিযোগ করেন, আগুনের খবর পেয়ে যখন সব শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেয় তখনো কর্মকর্তারা যদি তাদের কাজ করতে বাধ্য না করতেন তাহলে তখন যারা নিচে নেমে এসেছিল তারা হয়তো অনেকে বের হয়ে আসতে পারতেন। বেঁচে যেত অনেকগুলো প্রাণ।
কারখানায় নিখোঁজ হওয়া রিপন খান ইয়াছিনের মা নাজমা আক্তার জানান, তার ছেলে কারখানা চতুর্থ তলায় কাজ করতো। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কিছু বাড়তি উপার্জন করে পরিবারকে সাহায্য করার জন্য প্রায় চার মাস আগে ইয়াছিন এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। এ সময় নাজমা বেগম বুক চাপড়িয়ে কাঁদছেন আর মিডিয়া কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলছেন আপনারা যদি একটু চেষ্টা করেন, সবার মায়ের বুকটা যদি একটু ভরা করেন, ভাই একটু চেষ্টা করেন। এই দুঃসময়ে যে কোন একটি অবলম্বনকে কেন্দ্র করে পুত্রকে ফিরিয়ে পাওয়ার অন্তিম চেষ্টা। যেন কোন একটি উছিলায় ফিরে আসবে তার বুকের ধন রিপন খান ইয়াছিন।
ছোট ভাই টিপু সুলতান মোবাইলে বড় ভাই মোহাম্মদ আলীর ছবি নিয়ে সবাইকে দেখাচ্ছেন আর জানতে চাচ্ছেন তার ভাইয়ের কোন খোঁজ কারো কাছে আছে কি না। টিপু সুলতান এসময় জানান, কারখানায় যখন আগুন লাগে তখন মোহাম্মদ আলী এখানে আবদ্ধ ছিল। মোহাম্মদ আলী যখন বুঝতে পারেন তার আর বের হওয়ার কোন উপায় নাই, তখন সে তার বিভিন্ন স্বজনের কাছে মোবাইল করে ক্ষমা চান। টিপু সুলতান জানান, দুই মাস আগে তার বাবা মারা গেছেন। এ সময় মোহাম্মদ আলী এখানে আবদ্ধ অবস্থায় মোবাইলে কি কথা হয়েছিল তার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন টিপু সুলতান। তিনি জানান, সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে ছয়টার দিকে তার ভাই ফোন করে বলেন, পুরো বিল্ডিং ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তারা সামনে পিছনে কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। নিচের ফ্লোরে আগুনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় তিন তলার শ্রমিকরা সব চার তলায় এসেছে।
এর বাইরেও বিভিন্ন লোকজন তাদের নিখোঁজ স্বজনের ছবি নিয়ে কেউবা তাদের নাম নিয়ে চিৎকার করে ডাকছেন, এর কাছে তার কাছে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তার কোন হদিস আছে কিনা প্রশাসনের নিখোঁজ তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ করছেন। আর অপেক্ষায় আছেন হয়তো কোন হদিস মিলবে। হোক তা তাজা কিংবা দগ্ধ, স্বজনের সন্ধানটা তো পেতে হবে। হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ কোম্পানীর অগ্নিকাণ্ডের এমন কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওঠে এসেছে, যেগুলো দেশের আইনে গুরুতর অপরাধ। এখানে যতগুলো শ্রমিক নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে তার বেশীর ভাগই শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়সের শ্রমিক।
আগুন লেগেছে এমন খবরের পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে জোরপূর্বক কাজ করানো। যা হতাহতের সংখ্যা বাড়তে সাহায্য করা এবং আরেকটি অতীবগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোন দুর্ঘটনার সময় বাহিরে বের হওয়ার গেট বন্ধ করে দেয়া। এখানে জেলা প্রশাসন, ফায়ার ডিফেন্সসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, হয়তো আরো গঠন করা হবে। তবে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে পারলে এবং তদন্ত কমিটির প্রদত্ত সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করলে হয়তো এ ধরণের দুর্ঘটনায় রক্ষা পাবে অনেক প্রাণ, এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর মিছিলের তালিকাটা হয়তো এভাবে দীর্ঘায়িত হবে না।


