Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

লাশের জন্য কখনও কারখানায় কখনও ঢাকা মেডিক্যালে

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২১, ০৮:২৮ পিএম

লাশের জন্য কখনও কারখানায় কখনও ঢাকা মেডিক্যালে
Swapno

রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেড নামে একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ৫২ জন নিহত হয়। লাশের অপেক্ষায় স্বজনদের কান্না যেন থামছেই না। গতকাল রবিবার দুপুরের কারখানার সামনে ও কারখানার বাহিরে নিহত  ও নিখোঁজ শ্রমিকদের ছবি নিয়ে স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা গেছে। তারা অধীর আগ্রহে পোড়া মরদেহের জন্য অপেক্ষা করছেন।

 

স্বজনদের একটাই দাবী, পোড়া-গলা যা-ই হোক মৃতদেহ চাই। এজন্য লকডাউনের মধ্যেও নিখোঁজদের ছবি নিয়ে কখনও তারা ফ্যাক্টরিতে, কখনও রূপগঞ্জ থেকে ঢাকা  মেডিক্যালে ছুটছেন। সকলেই তাদের স্বজনদের লাশ দ্রুত ফিরে পেতে যায়। আর এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। এ মর্মান্তিক ঘটনায় রূপগঞ্জের চারপাশ  শোকাহত। স্বজনদের কান্নায় কারখানার চারপাশ ভারী হয়ে গেছে। স্বজনরা সকলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডিএনএর নমুনা দিয়ে আসেন। তবে তিন সপ্তাহ পরে লাশ শনাক্ত হবে জানায় ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষ। 

 


আগুনে পোড়া হাসেম ফুডের গেটের সামনে কাঁদছিলেন রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকার মিতু আক্তারের (১৪) বাবা গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে এ কারখানায় কাজ করে। বড় মেয়ের রাতে ডিউটি থাকার কারণে ঘটনার সময় সে ফ্যাক্টরিতে ছিল না। তাই সে বেঁচে গেছে। ছোট মেয়ে মিতু আমার পকেট থেকে দশ টাকা নিয়ে এসে কাজে যোগ দিয়েছিল। সেই  যে আসলো, আর তো মেয়ে ফিরলো না।’ এই বলে তিনি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

 

কান্নারত অবস্থায় তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে জীবিত, মৃত, পচা-গলা-পোড়া যা-ই থাকুক আমাকে দিয়ে দিন। তার মাকে নিয়ে শান্তনা দিই।’ এ কথা বলে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘চারতলায় যখন মেয়ে আটকা ছিল তখন বোতলে কাগজে নানা কিছুতে লিখে বাঁচার জন্য আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। শুনেছি ফ্যাক্টরি ম্যানেজার হাবিব তাদের চারতলার একটি এসি রুমে নিয়ে আটকে বলে এখানে আসো। অক্সিজেন পাবা। কিন্তু ম্যানেজার হাবিবসহ এ রুমে যারা ছিল সবাই মারা গেছে।’

 


অগ্নিকান্ডের ভবনের চতুর্থতলার শ্রমিক সেলিনা আক্তার (১৩) এর বাবা সেলিম মিয়া। মেয়েকে হারিয়ে পাগল প্রায় সেলিম মিয়া। বারবার দৌঁড়ে চলে যায় ওই ভবনটির সামনে। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলছিলেন, একবার মাইডারে তোমরা দেখতো দেও বাবা। আমার মাইয়ারে কেন কাজে পাঠাইলাম! পাগল হয়ে কারখানার সামনে ঘুরছিলো চম্পা রানী বর্মণের মা সুমা রানী বর্মণ ও তার পরিবারের লোকজন। তাদের সঙ্গে শেষবারের কথা হয়েছিল সন্ধ্যায় কম্পারানীর শেষ কথা হয়েছিল ’ মাগো আমারে বাচাঁও’। আমি শ্বাস লইতে পারতাছি না। আমি বুঝি তোমাগো  দেখতে পারমু না। কারখানার বাইরে কাদঁছিলেন নিখোঁজ তুলি আক্তারের মা ও বাবা আব্দুল মান্নান এক মধ্য বয়সী নারী আর বলছিলেন, একবার মা কইয়া ডাক আমারে। আমি তোরে ছাড়া কেমনে থাকমু। কারখানার মালিকরা সবটি গেট বন্ধ কইরা দিছিলো। প্রত্যেকটা গেট তালা দিয়ে সবটি মানুষটিরে মারছে।

 

এদিকে, গত রবিবার সকালে গিয়েও ওই ভবনটি ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। ভবনটির বেশকিছু অংশে বড় বড় ফাটল দেখা দেয়। ভবনের পলেস্থরা ও বেশকিছু অংশ ধসে পড়েছে। ফাটলের দেখা দেওয়ার কারণে ভবনটিকে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা দেয়। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভবনটির আশপাশে থাকা বসবাসকারী সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। যেকোন সময় ভবনটি  ভেঙে পড়তে পারে। ভবনটির পাশে বসবাসকারী টিটু মিয়া জানান, শুনেছি ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনটি যেকোন সময় ভেঙে পড়তে পারে। এতে আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এ কারণে ভবনটি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভেঙে ফেলার অনুরোধ জানাচ্ছি।  

 

এদিকে, ভবনে কিছু অংশে এখনো ধোঁয়া উঠতে থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের কোন কর্মীকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। নতুন করে আবার  ধোঁয়া উঠতে দেখেই অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।  এরআগে, গত বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকেলে রূগপঞ্জের কর্নগোপ এলাকার হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আগুনে পুড়ে ৫২ জন নিহত হয়। তবে চতুর্থতলাটি তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকায় ওখানকার কোন শ্রমিকই বের হতে পারেনি। ওইতলা থেকে ৪৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৩০ ঘন্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। এ ঘটনায় তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

এ আগুনের ঘটনায় ভুলতা ফাড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর নাজিম উদ্দিন মজুমদার বাদী হয়ে হাসেম ফুডের চেয়ারম্যান আবুল হাসেমসহ আটজনকে আসামী করে মামলা দায়ের করে। পরে তাদের গ্রেপ্তার করে ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। বিল্ডিং কোড না মেনে অব্যবস্থাপনায় এ ভবনটি নিমার্ণ করা হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস। এ ভবনটি নির্মাণের সময় কোন নিয়মই মানেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ। 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন