Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

সরকারী দপ্তরগুলো যেন ঠুঁটো জগন্নাথ

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২১, ০৭:৫৮ পিএম

সরকারী দপ্তরগুলো যেন ঠুঁটো জগন্নাথ
Swapno

# শিল্প কারখানায় তদারকি নেই


# শতভাগ ফায়ায় সেফটি ব্যবস্থা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে, তবুও মিলছে সনদ 


# নেই আইনের প্রয়োগ, চিঠি দিয়ে দায় সারছে কর্তাব্যক্তিরা  


# দপ্তরগুলোতে রয়েছে সমন্বয়হীনতা, ভিন্ন দপ্তরের প্রতি দোষারোপ


# ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হতে পারে নারায়ণগঞ্জ


 
শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠা শিল্প প্রতিষ্ঠান বা কল-কারখানাগুলোতে রয়েছে নানা অসঙ্গতি। এসব অসঙ্গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে ছোট বড় দূর্ঘটনা। এরই মধ্যে রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডিতে ৫২ জনের প্রাণহানীর ঘটনা দাগ কেটেছে দেশবাসির হৃদয়ে। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে রূপগঞ্জের ওই প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা নিয়ে।

 

আলোচনা চলছে শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ফায়ার সেফটি, ফায়ার এক্সিট বা ইমারজেন্সি এক্সিট ও সেফটি লবি ব্যবস্থা নিয়েও। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রূপগঞ্জের ওই প্রতিষ্ঠানের মতই নারায়ণগঞ্জের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। তবে, এসবের বিরুদ্ধে নেয়া হয় না কোন আইনী ব্যবস্থা। কেন আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয় না- এর সদুত্তরও নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে। তবে, রহস্যজনক কারণে আইনী ব্যবস্থা না নেয়া হলেও কেবল চিঠি দিয়েই দ্বায় সারছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তরা।

 


অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত সেফটি ব্যবস্থা না থাকা সত্বেও রহস্যজনকভাবে এসকল প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে বিস্ফোরক ও ফায়ার সেফটির সনদপত্র! কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরও ছাড়পত্র দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ! বছর বছর তা নবায়নও হচ্ছে!  শুধু কী তাই? বিল্ডিং কোড না মেনে অধিকাংশ শিল্প কারখানা গড়ে উঠলেও অদৃশ্য কারণে সেদিকে নজড় দিচ্ছে না রাজউক। অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, ফায়ার এক্সিট বা ইমারজেন্সি এক্সিট ব্যবস্থা না থাকা এবং বিল্ডিং কোড না মেনেও যে নারায়ণগঞ্জে শিল্প কারখানা চালানো হচ্ছে- রূপগঞ্জের ওই কারখানাটিই এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

 

  
ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র জানিয়েছে, রূপগঞ্জের হাশেম ফুড ও সেজান জুসের ওই কারখানায় ছিলো না পর্যাপ্ত ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির আকার ও ধরন হিসেবে ফায়ার এক্সিট ৫ থেকে ৬টি থাকা জরুরী হলেও সেখানে ছিলো মাত্র ২টি। যদিও পৃথক একটি সূত্র বলছে, ওই প্রতিষ্ঠানে কোন ফায়ার এক্সিটই ছিলো না। অগ্নিকান্ডে এতো প্রাণহানীর অন্যমত কারণও ধরা হচ্ছে ফায়ার বা ইমারজেন্সি এক্সিট পর্যাপ্ত না থাকা। অথচ, ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকা সত্বেও কলকারখানা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন এবং ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি সনদও মিলেছিলো রূপগঞ্জের হাশেম ফুড ও সেজান জুসের ওই কারখানাটিতে।

 


প্রশ্ন উঠেছে- পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা সত্বেও কোন বলে সনদপত্র প্রাপ্ত বা রেজিস্ট্রিভুক্ত হচ্ছে এসকল প্রতিষ্ঠান? এমন প্রশ্ন যখন চারিদিকে, তখন সরকারের এই প্রতিষ্ঠানগুলো দোষ চাপাচ্ছেন একে অপরের দিকে।   কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বলছে, অগ্নি নির্বাপন বা বিস্ফোরকের সদনপত্র তাদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস দিয়ে থাকে। আবার ফায়ার সার্ভিস বলছে, তাদের কাছ থেকে সনদপত্র নেয়ার আগেই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বহু প্রতিষ্ঠানকে  রেজিস্ট্রেশন দিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, ভবন তৈরীর সময়ে বিল্ডিং কোড মানার বিষয়ে নজর দেয় না রাজউক। কোন কোন ক্ষেত্রে নজর দিলেও ফায়ার সেফটির সনদের জন্য বাধ্যও করে না রাউজক- এমন অভিযোগ ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার। এক্ষেত্রে, একে অপরের প্রতি দোষ চাপালেও দপ্তরগুলোর মাঝে সমন্বয়হীনতা ফুটে উঠেছে মোটা দাগে।  

 


নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘২০০৩ সালে একটি আইন হয়েছে যে, ২৩ মিটার বা ৬ তলার উপরে ভবন করতে হলে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি লাগবে। কিন্তু রাজউকের আবার নতুন আইন হয়েছে যে, ৩৩ মিটার বা ১০ তলার উপর থেকে। অর্থাৎ তাদের আইনের আছে, ১০ তলার উপরে ভবন করতে হলে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন লাগবে। কিন্তু আমাদের আইনে আছে সাত তলা। অথচ, আমাদের ৭ তলার আইন ২০০৩ সালে হওয়ার পর রাজউকের এই নতুন আইন হয়েছে। এখানে দুটি ডিপার্টম্যান্টে আইনী ভাবেই সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে।

 

এছাড়া, যখনই ভবন বা গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, তখনই যদি আমাদের কাছে আসতো, তাহলে ফায়ার প্ল্যানটা বাস্তবায়ন করা যেত। কিন্তু ফায়ার প্ল্যান্ট ছাড়াই শিল্প কারখানা করা হচ্ছে।’তাহলে আপনার ফায়ার সেফটির অনুমোদন দিচ্ছেন কেন? আর আইনের প্রয়োগও হচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের ইন্সপেকশন অফিসার এগুলো পরিদর্শনের পর চিঠি দেয়। কিন্তু মালিক পক্ষ চিঠি পেয়েও উদ্যোগ নেয় না। এই জন্য এখন থেকে জেলা প্রশাসন, কলকারখানা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ প্রশাসনসহ কয়েকটি ডিপার্টমেন্টের সমন্বয়ে একটি কমিটি হবে। এই কমিটি নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি কারখানা পরিদর্শনের পর কোন অসঙ্গতি দেখলে পর্যায়ক্রমে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

 


কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলার উপ-পরিচালক সৌমেন বড়–য়া দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘আমাদের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত কারখানা ৩ হাজার ৪৫০টি। ফায়ার সার্ভিস নিজেরাও এসব কারখানা পরিদর্শন করেন। ফায়ার সেফটির বিষয়টি আমাদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসও দেখে এবং তারা ছাড়পত্র দেয়। যা বছর বছর নবায়নও করে। আমরা দেখি ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স ও বৈদ্যুতিক সক্ষমতা আছে কিনা- এসকল বিষয় দেখে আমরা সনদপত্র দেই। এমন আরো কিছু ডকুমেন্ট চেক করি। আর পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কলকারখানার ক্ষেত্রে পরিবেশের লাইসেন্সও লাগে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের লাইসেন্স দেখতে চায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে আমরাও পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্স দেখতে চাই। যেসকল প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন বিরোধী বা সেফটি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকে, তাদের আমরা চিঠি দেই।’  এদিকে সচেতন মহল বলছেন, আইন থাকতেও তা প্রয়োগ না করে কেবল চিঠি দিয়েই দ্বায় সারা হলে আগামীতে হয়তো রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডির মত আরো ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সম্মুখিন হতে পারে নারায়ণগঞ্জ।  
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন