Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

চারিদিকে শিশু শ্রমিক, নজর নেই কর্তৃপক্ষের

Icon

তুষার আহমেদ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২১, ১০:১২ পিএম

চারিদিকে শিশু শ্রমিক, নজর নেই কর্তৃপক্ষের
Swapno

# হোসিয়ারিগুলো শিশু শ্রমিকদের অভয়ারণ্য, পরিবহনেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা


# আইনের প্রয়োগ না থাকায় বাড়ছে শিশু শ্রম


# শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে কথা বললেও প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা নেই : নুরুদ্দিন


# শুধু শিশু শ্রম ধারায় মামলা হয় না : সৌমেন বড়ুয়া

 

ফতুল্লার দক্ষিন সেহাচর এলাকার ইসমাঈল। বয়স আট শেষে নয়ে পড়েছে মাত্র। এই বয়সেই টিফিন বাটি হাতে ছুটছেন হোসিয়ারীতে। হোসিয়ারীর একটি মেশিনের হেলপাড় তিনি। শরীরের হাড় পোক্ত না হতেই ভারি সব যন্ত্রপাতির সাথে তার সম্পর্ক হয়েছে ৮ মাস আগে ! যে বয়সে রঙিন মলাটের বই আর কলম হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই এসব হোসিয়ারী, কল-কারখানা ও পরিবহন সেক্টরে বিবর্ণ হচ্ছে ইসমাইলদের মত হাজারো শিশুর ‘জীবন মলাট’। জীবনের গুরুত্বপূর্ন এই অধ্যায়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখার কথা থাকলেও তাদের ভাগ্যে সেই আলোর ছিটে ফোটাও জোটেনি।  

 


তথ্য বলছে, কেবল ফতুল্লার ইসমাইলই নয়, শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জের বহু প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে ইসমাইলদের মত হাড় পোক্ত না হওয়া এমন হাজারো শিশু শ্রমিক। কলকারখানাগুলোতে শিশু শ্রমিক নিয়োগ আইনগত ভাবেই নিষিদ্ধ হলেও সেই আইনের প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।  ক্রমশই বাড়ছে শিশু-শ্রমিকদের সংখ্যা- এমনটাই বলছেন বোদ্ধা মহল। তথ্য বলছে, কতিপয় অসাধু মালিকরা নামমাত্র বেতনে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে ব্যবহার করছেন প্রাপ্ত বয়স্কদের মত ঝুঁকিপূর্ন কাজে। এতে, প্রায় সময়ই নানাবিধ দূর্ঘটনায় উপনিত হচ্ছে শিশুরা। এমনকি পান থেকে চুন খসলেই মালিক পক্ষের দ্বারা শিশু শ্রমিকরা শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতনের শিকারও হচ্ছে প্রায় সময়। যা ছাপা হচ্ছে খবরের কাগজে।

 

অথচ, অদৃশ্যকারণে তা নজরে আসছে না সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারি সংস্থা বা দপ্তরগুলোর। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনের প্রয়োগ না থাকার ফলেই শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে শিশু শ্রম।  এরই মাঝে গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই কারখানায় এখনো পর্যন্ত ৫২ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, কারখানাটিতে ছিলো বেশকিছু শিশু শ্রমিক। যাদের মধ্যে অনেকেই আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তথ্য বলছে, রূপগঞ্জ উপজেলাতো বটেই নারায়ণগঞ্জের বিসিক ও সিদ্ধিরগঞ্জ মিলিয়ে আরও প্রায় পৌনে একশো  প্রতিষ্ঠিত কারখানায় রয়েছে শিশু শ্রমিক।

 

এছাড়া, বর্তমান সময়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাসহ প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ব্যাপক ভাবে মিনি হোসিয়ারী কারখানা গড়ে উঠায় এসব এলাকায় শিশু শ্রমের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু কী তাই? লেগুনা ও টেম্পু’সহ বিভিন্ন গণপরিবহনে হেলপাড়ের দায়িত্বে দেখা যায় শিশুদের। চলন্ত পরিবহনের দরজায় ঝুলে ঝুঁকিপূর্ন ভাবে কাজ করছে শিশুরা। কর্তাব্যক্তিদের নজরদারী ও কঠোরতার অভাব থাকায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশু শ্রম। শিশুরা বয়সের কারণে অপরিপক্ক থাকায় ঝুঁকিপূর্ন কাজ করতে গিয়ে প্রায় সময়ই ছোট-বড় দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, শিশু বয়সে কাজে নিয়োজিত হওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ভাবে বেশকিছু বিরুপ প্রভাব রয়েছে। যেমন পরিবেশগত কারণেই অনেকে হয়ে উঠেন অপরাধী। পিতা-মাতার সঠিক পরিচর্যা না পাওয়া এবং সু-শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই এধরনের শিশুরা বিপথে চলে যাচ্ছে। সংঘ দোষের কারণে অনেকে শিশু বয়সেই হয়ে যাচ্ছে মাদকসেবী। বিশেষ করে সময়ের ‘কিশোরগ্যাং’ নামক ব্যধির অন্যতম উৎসও ভাবা হয় শিশু শ্রমকে।  

 


তবে, অল্পবয়সে সংগ্রামী জীবন বেছে নেয়া প্রতিটি শিশুর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। কারো কর্মক্ষম বাবা-মা থাকলেও পরিবারে বাড়তি আয়ের লোভে বলি হচ্ছে শিশুর শ্রেষ্ঠ সময়। এছাড়া বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে শিশুর একাকিত্ব, আবার পারিবারিক অস্বচ্ছলতায় অনেকে শিশু বয়সেই বাধ্য হচ্ছে সংসারের ঘানি টানতে।   শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো মনে করছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঠিক নজরদারীর অভাবেই বাড়ছে শিশু শ্রম এবং হুমকির মুখে পড়ছে শিশুর ভবিষ্যত। আবার সরকারের পক্ষ থেকে শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বলা হলেও এর পর্যাপ্ত প্রতিকার মূলক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না।

 


আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা নুরুদ্দিন দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেছেন, ‘১৯৬০ সাল থেকেই শিশুশ্রম বিদ্যমান। বর্তমানে হোসিয়ারীর সংখ্যা বৃদ্ধিপাওয়ায় নারায়ণগঞ্জে শিশু শ্রম আরো বেড়েছে। সরকার শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে কথা বললেও তাদের পূনর্বাসন বা প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাই শিশু শ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। সরকার এই বিষয়ে মৌখিক ভাবে বললেও বাস্তবতায় ভিন্ন। যেমন, রেলওয়ের পাশে কতো শিশু রয়েছে, যাদের পরিচর্যা সরকার সেভাবে করছে না। সরকারকে আরো সচেষ্ট হতে হবে। শিশুদের মূলধারার শিক্ষা অথবা কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে এর সুফল, ওই শিশুর পাশাপাশি তার পরিবার এবং রাষ্ট্র সকলেই ভোগ করবে।’

 


তবে, আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে তৎপর না হওয়ায় প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেলা কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ুয়া দৈনিক যুগের চিন্তাকে জানান, ‘শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে শিশু এবং ১৪ থেকে ১৮’র মধ্যে কিশোর হিসেবে বিবেচ্য। আমরা সব সময়েই বলি যে, ১৪’র নিচে কোন শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেয়া যাবে না।’ নির্দেশনার পরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু শ্রমিক বাড়ছে, এক্ষেত্রে আইনী পক্রিয়া কী বা কতটুকু প্রয়োগ করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান মালিককে প্রথমে নোটিশ দেই। তাদের জবাব যদি সন্তোষজনক না হয়, সে ক্ষেত্রে একটা তাগিদপত্র দেয়া যায়। আমাদের শেষ পদক্ষেপ শ্রম আদালতে মামলা করা।’

 

নারায়ণগঞ্জের প্রেক্ষাপটে শিশু শ্রম আইনে এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করেছেন কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে সৌমেন বড়–য়া বলেন, ‘আমাদের অফিসাররা যখন নোটিশ বা চিঠি দেয়, তখন অনেক জায়গায় শিশু শ্রম আইনের ধারা থাকে, আবার অনেক জায়গায় থাকে না। নির্দিষ্ট করে শুধু শিশু শ্রম নিয়ে একটা ধারায় মামলা কখনো হয় না। তবে, নির্দিষ্ট করে কোন প্রতিষ্ঠানে যদি শিশু শ্রমিক সেভাবে পাই, তাহলে মামলা হলেও হতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত করোনা থেকে আমরা কোভিড ইন্সপেকশন করে আসি। এটাই এখন চালু আছে। তবে যদি কোন অভিযোগ পেয়ে থাকি, তাহলে সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হয়।’ 
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন