শাহজাহান দোলন
# এক সময় আমাদেরও সুখের সংসার ছিল
# সাহায্যের আশ্বাস জেলা প্রশাসকের
মোহাম্মদ শাহআলম এবং তাসলিমা বেগম, এরা সম্পর্কে স্বামী ও স্ত্রী। রোদ-বৃষ্টি আর মশার যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে, দুজন বর্তমানে থাকেন শহরের দুই নং রেলগেইট এলাকার একটি ফুটপাতে। মাঝে পথচারীদের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য টাকা দিয়েই চলে, সহায় সম্বলহীন এই দম্পত্তির তিন বেলার খাবার। গতকাল ষাটোর্ধ্ব শাহালম ও তাসলিমা বেগমের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
শাহালম জানান, তিনি বিআইডব্লিউটিসি’র তৃতীয় শ্রেনীর কর্মকচারী হওয়ার সুবাদে অতীতে এক কন্যা সন্তানকে নিয়ে তাঁদের সুখের সংসার ছিল। দেওভোগের মাদ্রাসা এলাকায় চার রুমের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতেন। আনন্দ ফুর্তি কোন কিছুর স্বল্পতা ছিলোনা তাঁদের জীবনে। একমাত্র মেয়েকে বড় আয়োজন করে স্থানীয় এক ছেলের কাছে বিয়েও দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ সরকারি চাকুরি ও পেনশনের টাকা শেষ হওয়ার পর, নিয়তী তাঁদের আজ পথে নামিয়ে এনেছে।
পূর্বের স্মৃতিচারণ করে জীর্ণ শরীরে কাঁপতে কাঁপতে শাহআলম বলেন, ‘ আমি সরকারি চাকুরি করতাম। ভালো টাকা বেতন পেতাম। সেই টাকায় এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের সুখের সংসার ছিলো। মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াশোনা করিয়ে স্থানীয় এক ছেলের সাথে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছি। তখনও সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার ব্রেইন স্ট্রক হয়। তাই অতিরিক্ত অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ায়, চাকুরি থেকে অবসর নেই। এরপর পেনশনের টাকায় আমাদের সংসার চলত। তবে চিকিৎসক, বাড়িভাড়া ও ঔষুধে ধীরে ধীরে সেই পেনশনের টাকাও শেষ হয়ে যায়। তাই বাড়ি ভাড়া এবং অন্যান্য খরচ জোগাড় করতে না পেরে, আজ এক বছর যাবৎ স্ত্রীকে নিয়ে ফুটপাতেই বসবাস করছি।
শাহআলম বলেন, ‘ আমার যখন ভালো সময় ছিলো, তখন আমার অনেক আত্মীয় ছিলো। ভাই, ভায়ের বউ, ভাতিজা-ভাগ্নি আরো কত মানুষ আসত আমার কাছে। কাউকে কখনো ফিরিয়ে দেইনি। কিন্তু আমার যখন খারাপ সময় এসেছে, তখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কেউ আমাদের তাঁদের বাড়িতে আশ্রয় দেয়নি। আর নিজের গ্রামেও কোন জমি নেই যে সেখানে গিয়ে একটা ঘর তুলে থাকবো। সব নদী ভাঙনে শেষ।
এদিকে শাহালম যখন এই প্রতিবেদকের সাথে দুঃখের কথা বলছিলেন তখন তাঁর স্ত্রী তাসলিমা বেগমের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিলো। তাই কাঁদতে কাঁদতেই শাহালমের কথা থামিয়ে দিয়ে তাসলিমা বেগম বলেন, ‘ আমাদের এখন কেউ নেই। রাস্তায় থাকি তাই মেয়ের শশুর বাড়ীতে লজ্জায় যেতে পারিনা। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আর মশা মাছির যন্ত্রণায় অসুস্থ্য। সারাদিন জ্বর থাকে শরীরে, কিন্তু কাউকে বলতে পারিনা। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদি যে, জীবনে কি পাপ করেছিলাম! নইলে আজকে আমাদের এই অবস্থা কেন?
তাসলিমা আরো বলেন, শুনেছি প্রধানমন্ত্রী নাকি গৃহহীন সবাইকে ঘর দিবে, তাই আমাদেরও যদি কেউ একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে খুবই উপকার হবে। আমরা এই ভাবে আর পারতাছিনা।’ শাহালম ও তাসলীমা বেগমের এই কষ্টের কথা জানালে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘ তারা বর্তমানে যেখানে আছেন, সেই জায়গায় আমি লোক পাঠাবো। এবং পরবর্তীতে তাঁদের কিভাবে সাহায্য করা যায় সেটিও দেখবো।’


