# বিভিন্ন ঘটনায় পিবিআই পরিচয় উদঘাটন করেছে :এসপি পিবিআই
# পিবিআই’র মতো জেলা পুলিশকেও আরও পরিশ্রশী হওয়া প্রয়োজন : রফিউর রাব্বি
# পিবিআই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক উন্নত কাজ করছে : ধীমান সাহা জুয়েল
কয়েক বছর আগেও অজ্ঞাতনামা পরিচয়ে উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে অনেক সময় ব্যয় হতো। মরদেহের পরিচয় খুঁজে বের করতে বিপাকে পড়তে হতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। নিহতের স্বজনরা জানতেন না প্রিয় মানুষটি হারানোর খবর। তবে সেই সমস্যা কাটিয়ে তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে অজ্ঞাতনামা (বেওয়ারিশ) মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করছে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই)। সংস্থাটির নারায়ণগঞ্জের কর্মকর্তরা এ পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ শনাক্ত করেছেন। বলছিলেন, এ সংস্থার উপপরিদর্শক টিপু সুলতান।
তিনি বলেন, পরিকল্পিকভাবে হত্যা কান্ডের পর লাশ গুম করার চেষ্টা সহ নানা জটিল বিষয়ে তদন্ত করতে হয় তাদের। তবে মরদেহ উদ্ধার হলেও পরিচয় উদঘাটনে আগে যে সমস্যা ছিলো আগে তা এখন নেই। টিপু সুলতান বলেন, গত দুই বছরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা পরিচয়ে থানা পুলিশ যে সব লাশ উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে কারো পরিচয় মিলেছে, কারো পাওয়া যায়নি। যাদের পরিচয় মেলেনি তাদের পরিচয় উৎঘাটন করা হয়েছে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর মাধ্যমে খোঁজ মিলেছে অজ্ঞাতনামা (বেওয়ারিশ) লাশের।
টিপু সুলতান আরও বলেন, আগে আপসোস হতো। কারণ মৃতের স্বজনরা জানতোই না তার প্রিয় মানুষটির মৃত্যু হয়েছে। তবে বর্তমানে এ প্রক্রিয়ায় নিহতের স্বজনা দ্রুত সংবাদ পেয়ে যায় মৃত ব্যক্তির। অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় শনাক্ত করার পুরো বিষয়টি তদারকি করেন পিবিআই পুলিশ সুপার। পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, জেলার কোথাও অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হলে থানা পুলিশ পিবিআই কে জানায়। তারপর সেই মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
কারণ এর মধ্যে হত্যাকান্ডের ঘটনা যেমনি রয়েছে তেমননি স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাতেও মৃত ব্যক্তির পরিচয় খুঁজে বের করা প্রয়োজন। নয়তো মৃতের স্বজনরা জানতে পারে না তার নিখোঁজ মানুষটি মৃত। মনিরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় পিবিআই পরিচয় উদঘাটন করেছে। এর মধ্যে চাঞ্চল্যকর ঘটনাও রয়েছে। পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, গত বছর আড়াইহাজারের শিমুলতলায় জঙ্গল থেকে অজ্ঞাতনামা (বেওয়ারিশ) এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে প্রথমে ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত হয়নি। খবর পেয়ে তার আঙুলের ছাপ নিয়ে ছিলো পিবিআই। পরে মামলার তদন্তভারও আসে এ সংস্থার কাছে।
তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে জানা যায়, অজ্ঞাতনামা সেই মরদেহটি পাপিয়া বেগম নামে এক নারীর। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের মুক্তিনগর এলাকায় দুই ভাই ও বাবাকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। পাপিয়া একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে। পারিবারিক কলহের জেরে পাপিয়াকে তার ভাই হত্যা করে লাশ গুম করতে মরদেহটি জঙ্গলে ফেলে দেয়। মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে পিবিআই। গ্রেপ্তার করা হয় মামলার আসামীদের। ২০২০ সালের ১২ জুলাই সকালে নগরীর মন্ডলপাড়া লেক পাড়ে এক অজ্ঞাতব্যক্তি লাশ পাওয়া যায় পানিতে ভাসমান অবস্থায়। তবে তার পরিচয় শনাক্ত করতে না পারেনি পুলিশ। পরে পিবিআই ক্রাইমসিন ইউনিট তার পরিচয় শনাক্ত করে ওই ব্যত্তির নাম মোঃ রাশেদ খান, তিনি মুন্সীগঞ্জের টংঙ্গীবাড়ী উপজেলার বেতকা এলাকা মৃত দবির উদ্দিন খানের ছেলে। পরে মৃতের পরিবারের কাছে খবর পাঠিয়ে দেয়া হয়। ওই ঘটনার তদন্তও চলমান রয়েছে সংস্থাটির কাছে। তার আগে ৩০ জুন নারায়ণগঞ্জ জোরেল হাসপাতাল এক ব্যক্তিরা মরদেহ রেখে চলে যায় অজ্ঞাতনামারা।
পরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয় তিনি মোঃ আনোয়ার হোসেন খাঁন, জামালপুরের সরিষাবাড়ীর বাসিন্দা। তার পিতা নাম মোঃ আবুল হাসান। একই বছর ১৫ অক্টোবর সকালে নগরীর ২ নম্বর রেলগেটের এলাকায় সিটি কর্পোরেশন পার্কের পাকা বেঞ্চে উপর থেকে এ ব্যক্তির মরহেদ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওই পরিচয় খুঁজে পায় পিবিআই। মৃতের নাম সায়েম, তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলা বাসাইল গ্রামের ছায়েদ খানের ছেলে। ২২ মার্চ রূপগঞ্জ কালনী এলাকায় গরু চোর সন্দেহে এক ব্যক্তিকে মারধর করে সড়কে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে থানা পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতাল নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত হয়। কিন্তু ওই ব্যক্তির পরিচয় কারো জানো ছিলো না। খবর পেয়ে এই মৃত ব্যক্তির পরিচয় উদঘাটন করতে নামে পিবিআই। পরে সংস্থাটি জানায়, মৃত ব্যক্তিটির মোঃ বিল্লাল হোসেন। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার ঘোগা এলাকার মোঃ বাচ্চু মিয়া ছেলে। এমন অনেকে ঘটনায় অজ্ঞাতনামা (বেওয়ারিশ) লাশের পরিচয় খুঁজে বের করেছে পিবিআই। অধিকাংশ মামলা আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন বলে জানিয়েছেন বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুল।
তিনি বলেন, কিছু মামলা তদন্ত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিদেশে এ সংস্থার কাছে আসে। কিন্তু অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে ক্রাইমসিন ইউনিট সব সময় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে এ কারণে জেলার কোথায় অজ্ঞাতনামা (বেওয়ারিশ) লাশ উদ্ধার হলে থানা পুলিশ আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। তিনি আরও বলেন, কোন অপরাধী অপকর্ম সংঘঠিত করে আইনের নজরের বাইরে যেতে পারবে না। কারণ পুলিশও আগের চেয়ে আরও আধুনিক। পুলিশের এই বিশেষ শাখার অত্যাধুনিক কাজে সন্তুষ্ট নারায়ণগঞ্জ নাগরিক সমাজের নেতারাও।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাবি বলেন, পিবিআই যে কাজটি করছে তা আমরা সাধুবাদ জানাই। কারনে স্বজন হারানো খবর যদি তার প্রিয় মানুষটি না পায় তাহলে তিনি জানেন কতো কষ্ট। এ সংস্থাটির মতো জেলা পুলিশকেও আরও পরিশ্রমি হওয়া প্রয়োজন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর নারায়ণগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, পুলিশের শক্তিশালী এ সংস্থাটি অনেক কাজ করে থাকে। তার মধ্যে অজ্ঞাতনামা (বেওয়ারিশ) সনাক্ত করা তাদের একটি কাজ। তারা তাদের প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক উন্নত কাজ করছে তাই সরকারের উচিত তাদের আরও শক্তিশালী করা। পাশাপাশি জেলা পুলিশকেও উন্নত করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আমীর খসরু বলেন, আগে অনেকে তার প্রিয় মানুষটির খবর পেতেন না। পুলিশের বিশেষ ইউনিট পিবিআই এর মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় মিলছে। জেলা পুলিশ না করলেও পিবিআই কাজটি করায় নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয় না বলে জানান তিনি।


