# ২০২১ এর জানুয়ারী থেকে জুলাই পর্যন্ত হিসেব অনুযায়ী সদর থানায় ৬, ফতুল্লায় ২০, সিদ্ধিরগঞ্জে ১০, বন্দরে ৯, সোনারগাঁয়ে ৫, আড়াইহাজারে ৩ এবং রূপগঞ্জ ৭ মামলা
# ঝুঁকিতে সবচাইতে বেশি ফতুল্লার শিশু
# ৬০ টি মামলার ৩৮টি’র তদন্ত শেষে চার্জশীট
# শিশু ধর্ষণের অভিযোগ গ্রেপ্তার হয়েছে ৫৩ জন
# ডাক্তারী পরীক্ষায় মিলছে চাঞ্চল্যকর তথ্য
নারকীয় যন্ত্রাণায় চিৎকার করতে গিয়ে পেরে উঠেনা শিশুরা। প্রতিবাদ করার একমাত্র মাধ্যমটিকেও মুখ চেপে বন্ধ করে দেয়া হয়। সমাজের এক শ্রেণির মানুষ অর্থ, চটপটি, চকলেট ও মজা খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে অবুঝ শিশুদের উপর চালাচ্ছে নরকীয় নির্যাতন। নারায়ণগঞ্জে অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুনী কিংবা নারীদের ধর্ষণের ঘটনার পাশিপাশি ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। পরিসংখ্যান বলছে নিকট আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীরাই শিশুদের উপর এমন নির্যাতন করছে।
অপর দিকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বাদ যায়নি এমন নির্যাতন করা থেকে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের দ্বারাও বলৎকারের শিকার হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষার্থীরা। একটি সূত্রে জানা গেছে, গত সাত মাসে নারায়ণগঞ্জ জেলাজুড়ে শিশুদের নির্যাতনের ঘটনায় ৬০টি মামলা নিয়েছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় ৬টি, ফতুল্লায় ২০টি, সিদ্ধিরগঞ্জে ১০টি, বন্দরে ৯টি, সোনারগাঁয়ে ৫টি, আড়াইহাজারে ৩টি ও রূপগঞ্জ থানায় ৭টি মামলা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে উঠে আসা মামলার গুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ৬০টি মামলার মধ্যে ৪২টি ধর্ষণ, ১৬টি ধর্ষণের চেষ্টা ও ৩টি যৌন নির্যাতনের।
এদিকে বোদ্ধামহল বলছে থানার মামলাগুলো শুধু মাত্র একটা সংখ্যা, এর বাহিরেও এমন অনেক ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে যা ভূক্তভোগী পরিবার থানা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারছেননা। তারা বলছেন, অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা এলাকাগুলোর অপদার্থ নেতারাই মিমাংসা করে দেন অর্থের বিনিময়ে। শিশুদেরকে নির্যাতন করা হয়েছে এ সকল মামলাগুলো ঘেটে দেখা গেছে, নির্যাতনের শিকার হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স সাড়ে ছয় থেকে বার বছরের মধ্যে। আরো রয়েছে ১৪ থেকে ১৬ বছরের অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরী। যাদের অধিকাংশই প্রেমের প্রতরণায় হারিয়েছেন নিজেদের সম্ভ্রম। অভিযোগ উঠেছে ফতুল্লার পশ্চিম রসুলবাগ এলাকায় মাতৃদগ্ধ পান করা দেড় বছরের এক শিশুকে এবং ফতুল্লা মাসদাই এলাকায় দুই বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এমন দুইটি মামলার তদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের আদালতে চার্জশীট জমা দিয়েছে ফতুল্লা পুলিশ।
অপর দিকে পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছে, ধর্ষণ মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডাক্তারী মতামত। যেহেতু ধর্ষণ মামলাগুলোতে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকেনা সেহেতু মামলাগুলোতে ডাক্তারের মতামতই অধিক গুরুত্ব বহন করে। এদিকে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী কয়েকজন শিশুর ধর্ষণ সংক্রান্ত মেডিকেল পরীক্ষা থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসছে। পরীক্ষাগুলোতে ওই সকল শিশুদের নতুনভাবে ধর্ষণ হওয়ার কোন আলামত না পাওয়া গেলেও তারা পূর্বেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমন মতামতই প্রদান করছে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার।
এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা জেনারেল (ভিক্টোরীয়া) হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার আসাদুজ্জামান এক প্রশ্নের জবাবে জানান, খুবই কম শিশুদের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে। তিনি জানান, ‘চলমান দিনগুলোতে ধর্ষণের আলামত না পাওয়া গেলেও ওই সকল শিশুরা পূর্বেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সেটা একবার কিংবা ইকাধিকবারও হতে পারে বলে তিনি জানান।’
অন্যদিকে সমগ্র বাংলাদেশের বেশ কিছু আলোচিত ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছিল তুমুল আন্দোলনে। জেলার গণসংহতি আন্দোলনের নেতাকর্মীরাসহ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দরা তমুল আলোচিত ধর্ষণের ঘটনায় মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচী পালন করতে দেখা গিয়েছে, কিন্তু বিষয়গুলো এমনিতেই আলোচিত ছিল। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে নারী নির্যাতন ও শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে তাদের তেমন প্রতিবাদ করতে দেখা যাচ্ছেনা।
জেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী লক্ষী চক্রবর্তী বলেন, ধর্ষণের বিচার চেয়ে ও ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার জন্য আমরা মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রশাসনকে অনেকবার জানিয়েছি। কিছুদিন আগেও বিবৃতি দেয়া হয়েছে যাতে করে পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ তাদের তৎপরতা আরও বাড়ায়। তবে করোনা মহামারির কারণে আমাদের অনেক কার্যক্রম করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও আমরা চেষ্টা করছি নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণের শিকার ভোক্তভুগীরা যাতে বিচার পান সেজন্য তাদের সহযোগিতা করা।
নারী সংহতি নারায়ণগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক পপি রানী সরকার বলেন, ‘আমরা যে ঘটনা গুলো দ্রুত আলোচনা হয় আমরা সে সব বিষয়ে কর্মসূচি করে থাকি কিন্তু অনেক ঘটনা আছে যা আলোচনায় আসে না। সে কারণে আমরাও জানি না এমন অনেক ঘটনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সব শিশুদের ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে তেমন আলোচনা হয় না। তবে যে সব ঘটনা গুলো জানছি বা আলোচনায় আসছে আমরা তার প্রতিবাদ করছি, বিচার দাবি করছি।’


