জীবিত না মৃত জানেনা পুলিশ তবুও অপেক্ষায় বাবা-মা
মো. মোমিনুল ইসলাম ও বাদশা খাঁন
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২১, ১০:০০ পিএম
# ভয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে অপহরণকারী, পুলিশ প্রহরায় পালিয়েছে দুখু
# আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফলতি অথবা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে-রবিউর রাব্বি
আড়াই বছরেও সন্ধান মিলেনি ফতুল্লা থেকে অহরণ হওয়া ১২ বছর বয়সী শিশু সোহেল রানার। বাবা-মা এখনো পথ চেয়ে, ফিরে আসবে তাদের সন্তান। এদিকে পুলিশ বলছে রানা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে নিশ্চিত কোন তথ্য তাদের কাছে নেই। দুইটি সংস্থা দীর্ঘ তদন্তে করেও উদঘাটন করতে পারেনি প্রকৃত রহস্য। অপহরণকারী দুখু মিয়া নিজেকে শেষ রক্ষা করতে গিয়ে ব্লেড দিয়ে গলা কেটে করে আত্মহত্যা চেষ্টা।
পরে পুলিশ রক্তাক্ত অবস্থায় দুখুকে উদ্ধার করে ভর্তি করে হাসপাতালে। চিকিৎসকদের কছে ভিডিও জবানবন্দিতে দুখু মিয়া বলে ছিলেন শিশু রানাকে হত্যা শেষে তার লাশ ভাসিয়েছিলেন খালে। পুলিশের চোখে ধুল দিয়ে চিকিৎসাধীন দুখু পালিয়ে যায় অজানার উদ্দেশ্য। প্রশ্ন উঠেছে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন অপরাধী পালায় কি করে? এদিকে আদালত তদন্ত সংস্থার অসম্পন্ন প্রতিবেদন দেখে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিলেও নতুন সংস্থা উদ্ধার করতে পারেনি রানাকে, গ্রেপ্তার হয়নি সেই অপহরণকারী দুখু মিয়াও।
ফতুল্লার রসুলপুর এলাকার চায়ের দোকানদার সোবহান হাওলাদারের ছেলে রানা ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারী অপহরণ হয়। পরিবারের অভাব দূর করতে ১২ বছর বয়সেই শ্রমিক হিসেবে স্থানীয় চাকদা রোলিং মিলে চাকুরীতে যোগ দিয়েছিলেন রানা। মিলটির সামনেই ছিল তার সোবহানের চায়ের দোকান। একই মিলে চাকরী করতো প্রতিবেশী দুখুমিয়া।
শিশুটির বাবা জানায়, দিনটি ছিল সোমবার, ওইদিন রাত ৮টায় কর্মস্থলে যায় তার ছেলে। রাতের কাজ শেষে পরদিন তার বাড়ী ফেরার কথা থাকলেও রানা আর বাড়ী ফেরেনি। সন্তান না ফেরায় সেইদিন সোবহান হাওলাদার রানার কর্মস্থল চাকদা রোলিং মিলে খোঁজ নিয়েছিলেন। এদিকে রানার সন্ধানে ব্যস্ত থাকা সোবহানের ফোনে সকাল ৯টায় অপরিচিত ব্যক্তি ফোন করে জানায় রানা রয়েছে তাদের জিম্মায়, ৫ লক্ষ টাকা দিলে ছেড়ে দেবে শিশুটিকে, অন্যথায় হত্যা করা হবে তাকে। অপহরণকারীর সেই কথাগুলো রেকর্ড ছিল সোবহানের মুঠোফোনে। রেকর্ড করা কথা চাকদা রোলিং মিল সংশ্লিষ্টদের শুনালে তারা নিশ্চিত করেন ব্যক্তিটি দুখু মিয়া। এদিকে রানার নিখোঁজের পর থেকেই সন্ধান মিলছিলনা চাকদা মিলের অপর শ্রমিক দুখু মিয়ার।
এদিকে সন্তানকে ফিরে পেতে কিছুটা কৌশল অবলম্বন করে অপহরণকারীকে ফোন করেন সোবহান, বলেন প্রস্তুত আছে ৪ লক্ষ টাকা, জানতে চান অর্থ পৌঁছে দেওয়ার স্থান। তবে চতুর দুখু মিয়া ফেঁসে যাওয়ার আশংকায় শিশুটির পরিবারের সাথে বন্ধ করে দেন যোগাযোগ। কয়েকদিন পর অপহরণকারী ভিন্ন দুইটি নম্বরে ফোন করে পরিবারটির কাছে দাবী করে ২০ হাজার টাকা। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার ব্যকুলতায় সোহেল রানার বাবা সেবহান তাৎক্ষনিক ২০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন অপহরণকারীকে। তবে এতেও খ্যান্ত হয়নি চক্রটি, দাবী করেন আরো ২ লাখ টাকা, পরে বন্ধ করে দেন যোগাযোগ।
এই ঘটনায় শিশু রানার বাবা সোবহান ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেছিলেন ফতুল্লা মডেল থানায়। সেই মামলায় প্রেতিবেশী মো. দুখু মিয়া, তার বোন জামাতা নুরুজ্জামান ও দুখু মিয়ার আপন খালা শাহানারাকে আসামী করা হয়। ফতুল্লা থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) আমজাদ হোসেন অর্ধ মাস তদন্ত করেছিলেন মামলাটি, তবে তিনি রানাকে কিংবা অপহরণকারীদের কোন সন্ধান দিতে পারেননি। এরপর মামলাটি পিবিআই এর তফসিলভূক্ত হওয়ায় এক আদেশে নারায়ণগঞ্জ পিবিআই এর পরিদর্শক আলী আকবর হোসেন তদন্তের দায়িত্ব নেন।
পরিদর্শক আলী আকবর হোসেন তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্ধান করে জানতে পারেন আসামী দুখু মিয়া বরিশালের কাউনিয়া থানার পলাশপুর এলাকায় আত্মগোপনে আছেন। পরবর্তীতে আলী আকবর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহায়তায় দুখু মিয়ার অবস্থান নিশ্চিত করেন। এদিকে দুখু মিয়া টের পেয়ে জান পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজকে তাকে। তাই আটক হওয়ার ভয়ে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে ব্লেড দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রতিবেশীরা দুখু মিয়াকে উদ্ধার করে সংবাদ দেয় পুলিশে, তাকে ভর্তি করা হয় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খোঁজ পেয়ে দ্রুত ছুটে জান হাসপাতালে ভর্তি থাকা দুখুকে গ্রেপ্তার করতে। পরে বরিশালের পুলিশের সাহায্য নিয়ে তাকে নাক, কান, গলা বিভাগের ৪০৩ নং ওয়ার্ডে ভর্তি রেখে পুলিশ পাহাড়া দেয়া হয়। তখন পুলিশকে দুখু মিয়া জানায়, সোহেল রানাকে ২১ জানুয়ারী রাতে চাকদা রোলিং মিলস থেকে ডেকে নিয়ে অপহরণ করা হয়। ওই রাতেই নাজমুলসহ আরো কয়েকজন মিলে সোহেল রানাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পাশের ডোবার ময়লায় লাশ ভাসিয়ে দিয়েছেন। পরে পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জে ফিরে এসে বেতার বার্তায় জানতে পারেন আসামী দুখু মিয়া পুলিশ প্রহরায় হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে। এই ঘটনায় বরিশাল কোতয়ালী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা হয়।
দুখু মিয়ার দেওয়া তথ্যে পিবিআই পুলিশ নাজমুল ও নুরুজ্জমান নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তবে অপহরণের ঘটনায় নুরুজ্জামান, নাজমুল ও শাহানারা জড়িত আছেন এমন কোন তথ্য প্রমান পায়নি পিবিআই। যার প্রেক্ষিতে তাদের বাদ দিয়ে আলোচিত মামলাটির তদন্ত অসমাপ্ত রেখে শুধু মাত্র দুখু মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন আদালতে। তবে তার দাখিলকৃত অভিযোগপত্রটি অসম্পুর্ণ এবং অপূর্ণাঙ্গ বিধায় বিজ্ঞ আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য আবার ফতুল্লা থানাকে নির্দেশ দেন। এরপর ফতুল্লা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম মামলাটির অধিকতর তদন্ত শুরু করে। তিনি চাঁকদা রোলিং মিলস আশপাশ এলাকার বিভিন্ন ডোবা, পুকুর জলাশয় খোঁজ করেন। কিন্ত কোথাও সোহেল রানার মরদেহের সন্ধান পাননি। তদন্তকালে তিনিও আসামী দুখু মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
তাছাড়া অপহরণ চক্রের অন্য সদস্যদেরও শনাক্ত করতে পারেনি। পরিশেষে তিনিও পূর্বের পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তার অসম্পন্ন তদন্ত অনুসরণ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন আদালতে। তবে সেই তদন্তেও শিশুটির বেঁচে থাকা কিংবা মৃত্যু বরণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি থানা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক আলী আকবর যুগের চিন্তাকে জানান, ঘটনার সাথে জড়িত মামলার এক মাত্র আসামী দুখু মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুনরায় থানা পুলিশকে আদেশ দিয়েছেন ।
তিনি আরও বলেন, পালিয়ে যাওয়া দুখুকে আমরা আর গ্রেপ্তার করতে পারিনি, খুঁজে পাইনি শিশু রানাকেও। মামলার সব শেষ তদন্ত কর্মকর্তা ফতুল্লাল মডেল থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম জানান, তদন্তকালে তিনিও শিশু রানার সন্ধান পাননি। খোঁজ পাননি পালিয়ে যাওয়া দুখুরও। সোহেল রানার অপহরণের সাথে অন্য কাউকে জড়িত থাকার তথ্য প্রমান না পেয়ে তিনি দুখুকে একজন মাত্র আসামী করে চার্জশীট দিয়েছি। তবে উল্লেখ রেখেছি যদি জীবিত অথবা মৃত সোহেল রানাকে পাওয়া যায় তাহলে চার্জশীটে সংযুক্ত করা হবে। তবে দু’টি সংস্থার তদন্তে শিশু সোহেল রানাকে উদ্ধার করতে না পারা ও পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামী দুখু মিয়া হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি।
কমিটির উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি বলেন, এ ঘটনা গুলো প্রমান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফলতি অথবা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আমি এই জন্য বলছি, যদি তারা চায় যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করবে তাহলে অজস্ত্র প্রমানের মাধ্যমে তারা তা করতে পারে। হয় তারা মামলাটি আন্তরিক ভাবে তদন্ত করেনি, নয়তো অপরাধীদের সাথে যুক্ত রয়েছে। এই মামলায় যারা তদন্ত করছে তাদের কি ধরনের গাফলতি রয়েছে তা নিশ্চিতের মাধ্যমে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তাহলে এসব মামলা যারা তদন্ত করে তারা আরও গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করবে।
তিনি আরও জানান, এমন আরেটি ঘটনায় রয়েছে দেওভোগের সাদমান সাকি নামের এক শিশুর। তাকেও এখনো পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। শিশুটিকে অপহনের সাথে কারা জড়িত তাও খুঁজে বের করতে পারেনি। এই মামলাটিও পুলিশের বিভিন্ন সংস্থায় গুরপাক করছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছেনা।


