Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

জেলায় আট মাসে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা ছিনতাই

Icon

মো. মোমিনুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২১, ০৭:১৮ পিএম

জেলায় আট মাসে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা ছিনতাই
Swapno

#এই সময়ে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৩০টিরও বেশি


# রাত ১১টার পর যুবকদের সন্দেহ হলে ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ


# ছিনতাইকারী চক্র হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে হরহামেশা


নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই ছিনতাইকারী চক্র অবস্থান নেয় জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে। রামদা, চাপাতি, সুইচ গিয়ার চাকু, লোহার রড, হকিষ্টিক, আগ্নেয়াস্ত্রসহ গুরুতর আঘাত করা যায় এমন সব অস্ত্র থাকে চক্রটির কাছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান, পথচারী, রিক্সার যাত্রী, অটো রিক্সা, ইজিবাইক ও মোটর সাইকেল চালকদের অনুসরণ করে পরিকল্পনা আটে তারা। সুযোগ বুঝে সশস্ত্র দলটি গলায় চাকু ধরে লুট করে নিয়ে যায় জন সাধারণের সর্বশ্ব। গোয়েন্দা ও পুলিশের পরিচয় দিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাও রয়েছে বেশ কয়েকটি।

 

পরিসংখ্যান বলছে ছিনতাইয়ের ঘটনায় বিগত ৮ মাসে নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে ৩০টির অধিক মামলা হয়েছে। মামলার গুলোর বিবরণ থেকে জানা গেছে, নগদ অর্থ, মোবাইল, গরু, ছাগল, মোটর সাইকেল, গাড়ী, স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে, যার অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩৭ টাকা। ইতিপূর্বে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ছিনতাই চক্রের হত্যাযজ্ঞ দেখেছে নগরবাসী। মাদকাসক্ত এই চক্রটি সামান্য কিছু অর্থের জন্য হত্যার মত জঘন্য অপরাধ করতেও কার্পণ্য করছেনা। তবে পুলিশ বলছে অনেকদিনে থেকেই চক্রটি এমন কাজ করে আসছে।


 
একটি সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ প্রশাসন ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন মনে করে গুুরুত্ব কম দিচ্ছে। প্রশাসন বর্তমান সময়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অধিক মনোযোগী। এরফলে নারায়ণগঞ্জ জেলা এখন অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জেলা পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ বলছে করোনাকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোষ্ট বসিয়েছে তারা, বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য এখন তল্লাশী চৌকিতে নিয়োজিত। এদিকে করোনা ভাইরাসকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে স্থানীয় অপরাধীদের লাগাম ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বিশিষ্টজনদের। তারা বলছে, ছিনতাইকারীদের গুরুত্ব দিয়ে চক্রটির মূল কারিগরদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় অবহেলার ফলাফল আত্মঘাতি হবে।


 
স্থানীয় পত্রিকার ফটো সাংবাদিক নূর ইসলাম। তিনি জানান, ৬ মাস ব্যবধানে তিনি দুইবার ছিনতাইকারীদের ক্ষপ্পরে খুইয়েছেন মোবাইল ফোনসহ নগদ অর্থ। একটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করতে পারেননি। নূর ইসলাম আরো জানান, সর্বশেষ গত ৪ আগষ্ট নগরীর ডিআইটি এলাকা থেকে তার একটি মোবাইল ও নগদ টাকা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনিয়ে নিয়ে যায় একটি সংঘদ্ধ ছিনতাইচক্র।


 
চলতি বছরের জানুয়ারী মাস থেকে আগষ্ট মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা জুড়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০টির অধিক মামলা নিয়েছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা একটি, ফতুল্লায় ৩টি, সিদ্ধিরগঞ্জে ৪টি, বন্দর থানায় ৭টি, আড়াইহাজারে ২টি, সোনারগাঁয়ে ৪টি এবং রূপগঞ্জ থানায় ৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। যেখানে ২৮ জন ভূক্তভোগী লোক অভিযোগ করেছিলেন এবং পুলিশ ও র‌্যাব বাদী হয়ে ২টি মামলা করেছে। পুলিশ বলছে, সদর মডেল থানা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পৃথক দুইটি স্থানে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির সময় ২টি সুইচ গিয়ার চাকু, ৫টি মোবাইল সেটসহ ৩ জন ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়।
 


গত ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ড্রাইভার ও যাত্রীদের জিম্মি করে ২২ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি টয়োটা প্রিমিও এফ গাড়ী ছিনতাই করে নিয়ে যায় একটি চক্র। ওই সময় গাড়ীটির এক মালিক মো. ইমানুল খাঁন বাদী হয়ে আড়াই হাজার থানায় মামলা করেছিলেন। ইমানুল বলছেন, ৪ মাস হলো মামলা করেছি, কিন্তু পুলিশ এখনো পর্যন্ত ছিনতাই হওয়া গাড়ীটি উদ্ধার করে দিতে পারেনি। সর্বশেষ মামলাটি পিবিআই, নারায়ণগঞ্জ তদন্ত করছে।


 
মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া ছোট রায়পাড়া ডিজিটাল পেপার মিল লি. এর সিনিয়র ম্যানেজার দীপক চন্দ্র কুমার। গত ৯ মার্চ কোম্পানীর কর্মচারীদের বেতনের নগদ আট লক্ষ সত্তর হাজার টাকা নিয়ে গাড়ী যোগে সোনারগায়ের পিরোজপুর এলাকায় আসলে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সেই টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সেই সাথে তার সাথে থাকা এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার টাকা মূলের একটি আইফোন-১২ ম্যাক্স ও এ্যাপেল কোম্পানীর একটি ল্যাটপ (মূল্য-এক লক্ষ পয়ষট্টি হাজার) টাকা ছিনতাই হয়। দীপক চন্দ্র কুমার সরকার বলছে, এই ঘটনায় মামলা করলেও এখনো পর্যন্ত পুলিশ ছিনিয়ে নেয়া টাকা, মোবাইল ও ল্যাপটপ উদ্ধার করে দিতে পারে নি।


 
চট্টগ্রাম হাটহাজারী এলাকার বাসিন্দা পরিতোষ চন্দ্র ধর। ঢাকা থেকে স্বর্ণ বিক্রির ৩৮ লক্ষ টাকা নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুর ব্রীজে আসতেই ছিনতাইকারীর খপ্পরে পরে। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তিনজন ছিনতাইকারী লুট করে নিয়ে যায় পরিতোষের ৩৮ লক্ষ টাকা। এই ঘটনায় তিনি গত ২৩ ফেব্রুয়ারী সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করেছিলেন।
 


 
পরিতোষ চন্দ্র ধর যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, গত ৬ মাসে ৩টি সংস্থা তার মামলাটি তদন্ত করলেও ছিনতাই হওয়া টাকা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। প্রথমে সিদ্ধিরগঞ্জ পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি)। বর্তমানে মামলাটি পিবিআই, নারায়ণগঞ্জ তদন্ত করছে বলে জানান তিনি। পরিতোষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতোগুলো সংস্থা পরিবর্তন হলেও কোন সংস্থাই তাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। সিদ্ধিরগঞ্জে ফোন করে জানতে পারেন মামলাটি ডিবিতে। ডিবিতে ফোন করলে জানতে পারেন মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই।


 
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কুমিল্লা জেলার বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) সুজয় চন্দ্র পাল বলছেন, সমগ্র বাংলাদেশের পুলিশকে একযোগে কাজ করতে হবে। তানাহলে  সংঘব্ধ এই ছিনতাই চাক্রটিকে আইনের আউতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবেনা। তিনি বলছেন, জুন মাসের ২৭ তারিখ গ্রামের বাড়ী কিশোরগঞ্জ থেকে কুমিল্লা যাওয়ার পথে কাঁচপুর থেকে একটি টয়োটা গাড়ীতে উঠেছিলেন। গাড়ীতে ড্রাইভারসহ অপর একটি যাত্রী ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর আরো দুইজন আরোহী গাড়ীতে উঠে।

 

এরপর বন্দরের মদনপুর চৌরাস্তা অতিক্রম করার পর পিছনের সিটে থাকা যাত্রীরা তার উপর অতর্কিতভাবে হামলা করে। পরে তার হাত-পা ও চোখ বেধে মানি ব্যাগে থাকা নগদ ৫ হাজার ৬শত টাকা, একটি এটিএম কার্ড ও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয়। এরপর তাকে বেধরক পিটিয়ে তার কাছ থেকে এটিএম কার্ডের পিন নম্বর সংগ্রহ করে বুথ থেকে আরো ১ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে হাত-পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় বন্দরের দেওয়ানবাগ এলাকা ফেলে চলে যায় চক্রটি। এই ঘটনায় মামলা করলেও পুলিশ বলছে আসামীদের গ্রেপ্তারের জন্য সচেষ্ট রয়েছেন তারা।


 
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরীফুল ইসলাম জানান, গত ফেব্রুয়ারী মাসে তার বাড়ীর কেয়ারটেকার মো. আক্কাস এর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছিনি নিয়ে যায় স্থানীয় মো. নাহিদ (৩০) মো. সুমন ভূইয়া (২৫)। এই ঘটনায় মামলা করেছিলেন তিনি। জানা গেছে, ওই ঘটনায় রূপগঞ্জ পুলিশ নাহিদ নামের এক ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করতে পারলেও এখনো পর্যন্ত অধরা রয়েছে সুমন ভূইয়া। এখনো উদ্ধার হয়নি ছিনতাই হওয়া টাকা।


 
গত মার্চ মাসে রূপগঞ্জের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কর্ণগোপ এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে ১টি প্রাইভেটকার ছিনতাই করা হয়। প্রাইভেটকারটির মালিক মো. সাদ্দাম জানান, পুলিশের লগোসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদী ছিল ছিনতাইকারীদের সাথে। গাড়ীতে ইয়াবা ট্যাবলেট আছে জানিয়ে চক্রের সদস্যরা গাড়ীর কাগজপত্র চয় তার কাছে। পরে সাদ্দামের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় প্রাইভেটকারটি। সাদ্দাম বলছেন, তিনি রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। এখনো পর্যন্ত গাড়ী উদ্ধার হয়নি।    


 
এদিকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মোস্তাফিজিুর রহমান বলছেন, ছিনতাই রোধে মাঠে কাজ করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। একই সাথে থানাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; রাত ১১টার পর যেকোন উঠতি বয়সী যুবকদের সন্দেহ হলে ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন