কাউয়া-হাইব্রীড নিয়ে হাই-বাদল দ্বন্দ্ব চরমে
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২১, ০৯:০২ পিএম
# খন্দকার মোশতাকে’র বাসায় লাইন ধরে ঢুকেছিলেন আবদুল হাই অভিযোগ ভিপি বাদলের
# হাইয়ের কাছে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার প্রমাণ চান ভিপি বাদল
# ডা.বীরু ছাত্রশিবির, লায়ন বাবুল হাইব্রীড এমন অভিযোগে দ্বিধাবিভক্ত
# হাইব্রীড ফজর আলীকে নিয়েও দ্বন্দ্ব চরমে
এবার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর কিছু অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল। ২০১৬ সালে কমিটি দেয়ার পর থেকে কমিটির বেশিরভাগ নেতার সাথে দুরুত্ব তৈরি হয়ে দহরম-মহরম ছিল হাই ও বাদলের। সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে বিতর্কও তৈরি নেপথ্যে ছিলেন তারা দুইজন।
এবার সেই সোনারগাঁয়ে সভাপতি আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ তুলেছেন ভিপি বাদল। যা এখন পুরো নারায়ণগঞ্জে ‘টক অব দ্য ডিস্টিক্টে’ পরিণত হয়েছে।শুক্রবার বিকেলে সোনারগাঁয়ের সনমান্দী ইউনিয়নে আবদুল হাইকে নিয়ে কিছু বিষ্ফোরক মন্তব্য করেন ভিপি বাদল। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগে হাইব্রীডটা কে দেখান। দেখান না। আমি সাধারণ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের। যদি কোন প্রমাণ করতে পারেন তাকে বহিঃষ্কার করা হবে। কোন এক নেতা সেদিন শুনলাম সন্মানদী এসে গেছেন, ঘুরে গেছেন। আবার ওই গোগনগর আলীরটেকে মিটিং করে গেছেন। বললেন যে, হাইব্রীডদের নাম ছিল, আমি সই দেই নাই।
বলতে চাই, জনাব তখন আমি বাদল কোথায় ছিলাম? আমি কি ছিলাম না সেখানে? আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আপনি কিসের মুক্তিযোদ্ধা? কোন সেক্টরে আপনি যুদ্ধ করেছিলেন? আপনি তার প্রমাণ দেখান। মানুষ বলে, আপনার বোনের জামাই এমপি ছিল, খন্দকার মোশতাকের দলে ! ঢোকার জন্য লাইন দিয়ে খন্দকার মোশতাকের বাসায় আপনি গিয়েছিলেন! যদি প্রমাণ চান এটা মানুষ প্রমাণ দিবে। বেশি কথা বলবেননা, কথা কম বলবেন। আওয়ামী লীগ মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে, মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য কাজ করে, মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে।’
সূত্র জানিয়েছে, সোনারগাঁয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির নেতাদের সাথে কিছুদিন আগেও সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদলের সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও এখন সেটি সাপে-নেউলে। সূত্র জানায়, শোক দিবসের কোন অনুষ্ঠানে সোনারগাঁয়ে যোগ দিতে পারেনি ভিপি বাদল। যদিও সোনারগাঁয়ে গিয়ে সভা করেছেন আবদুল হাই। সূত্র জানায়, সম্পতি জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য ডা. আবু জাফর চৌধুরী বীরু ও সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য লায়ন বাবুলকি নিয়ে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছর জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য ডা. আবু জাফর চৌধুরী বিরু সম্পর্কে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন জেলা পরিষদের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মাসুম। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার আবু জাফর আহমেদ বিরু স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ডাক্তার আবু জাফর চৌধুরী। উনি ছাত্র জীবনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে লেখাপড়ার সময় ছাত্র শিবিরের রাজনীতি করতো। তার বাবা নূর মোহাম্মদ চৌধুরী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেন। তিনি সোনারগাঁয়ের প্রখ্যাত রাজাকার এসএম সোলায়মানের সহযোগী ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলে কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। বিরুর আরেক আপন ছোট ভাই লিটন চৌধুরী সোনারগাঁয়ে জামপুর ইউনিয়ন যুবদলের সহ-সভাপতি। তার ভগ্নিপতি মিয়া আব্বাস ছিলেন বাগেরহাটের সাবেক এমপি। যুদ্ধাপরাধ হয়ে পালিয়ে কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ছিলেন ২০ দলীয় জোটের আমলের এমপি। আরেক বোন জামাতা আবদুল মালেক মিয়া জামায়াতের ইসলামের রোকন। তিনি নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িত। তিনি হেফাজতের মামলারও আসামী।’
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের গিয়ে কমিটি দিতে গিয়ে লাঞ্ছিত হন আবদুল হাই ও ভিপি বাদল। তার দুইজনেই তখন সাবেক সাংসদ আবদুল্লাহ আল কায়সার ও সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালামকে বাদ দিয়ে একটি কমিটি দিয়েছিলেন।লাঞ্ছিত হওয়ার পর তারা আশ্রয় নেন ডা.আবু জাফর চৌধুরী বীরুর বাড়িতে। কিন্তু সোনারগাঁয়ে নতুন আহবায়ক কমিটিতে অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য সাংসদ আব্দুল্লাহ আল কায়সার। আর এদিকে বীরু ও লায়ন বাবুলের নানা অসঙ্গতি বেড়িয়ে পড়ায় আবদুল হাই ও ভিপি বাদলের সম্পর্কে অবনতি ঘটে।
সূত্র জানিয়েছে, বীরু ও লায়ন বাবুলকে মূলত শেল্টার দেন ভিপি বাদল। সূত্র জানায়, ক্ষমতায় যেই থাকুক, কর্তৃত্ব যাতে থাকে নিজেদের সেই বন্দোবস্ত করার অভিযোগ উঠেছে সদ্য সোনারগাঁ উপজেলা আহবায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তুর্ভক্ত লায়ন বাবুলের বিরুদ্ধে। অথচ সোনারগাঁ উপজেলা আহবায়ক কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন সোনরগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালাম। এতে তৃণমূলে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া বারদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এনিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একদিকে সবাই লায়ন বাবুল পরিবারকে প্রভাবশালী হিসেবে অভিহিত করছেন।
অপরদিকে ইউনিয়নের লোকজন এই পরিবারকে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক পরিবার বলে অভিহিত করছেন। তারা বলছেন, গতবার লায়ন বাবুলের ভাই না পারলেও এবার ইউপি নির্বাচনে বাবুলকে আর কেউ ঠেকাতে পারবেনা। সবদলেই তাদের আধিপত্য রয়েছে। যদিও এব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই দাবি করেছেন, উপজেলা আহবায়ক কমিটিতে বিতর্কিত নামগুলো বাদ দিতে তিনি সাধারণ সম্পাদক এড.আবু হাসনাত শহীদ মো.বাদলকে বলেছিলেন। যার মধ্যে লায়ন বাবুলের নামটিও রয়েছে। এখন এটা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হবে সেটি তিনি আগেই ধারণা করেছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সোনারগাঁয়ের বারদী ইউনিয়নের গোলাপাড়া গ্রামের সালাউদ্দিনের তিন ছেলে তিনদলের রাজনীতি করেন। ওই পরিবারের সদস্য লায়ন বাবুল সদ্য সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটিতে সদস্য পদে স্থান পেয়েছেন। নৌকা প্রতীকে এবার বারদী ইউনিয়নেও তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে লায়ন বাবুলের বাবা সালাউদ্দিনও এলাকার চিহ্নিত প্রভাবশালী বিএনপি নেতা। লায়ন বাবুলের ভাই জসিম উদ্দিন বিএনপি জামাতের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। বিএনপির হয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করে একাধিক মামলার আসামী হয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৩-২০১৪ সালে বিএনপি জামাতের আগুন সন্ত্রাস কর্মকাণ্ডের মামলায় এজহারভুক্ত আসামী তিনি।
এছাড়া লায়ন বাবুল নিজেও জাতীয় পার্টি ঘনিষ্ট একজন ব্যক্তি। এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার সাথেও রয়েছে তার গভীর সখ্যতা। কিন্তু এলাকায় আওয়ামী লীগের দাপট থাকায় জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যাওয়ার মনস্থির করেন লায়ন বাবুল। মাধ্যম হিসেবে লায়ন বাবুলের আরেকভাই আমিনুল ইসলামকে বেঁছে নেন তিনি। আমিনুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। এবং গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জহিরুল হকের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।
বারদী ইউনিয়নের এলাকাবাসী জানান, লায়ন বাবুলের পুরো পরিবার সবদলের রাজনীতি ঠিক রেখে নিজেদের আখের গোছান। সম্প্রতি সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটিতে সদস্যপদ বাগিয়ে এনে নিজেদের জাহির করছে তার পরিবার। তারা বলছে, যে কোন দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের কোন সমস্যা নেই। এবার গত বার ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লায়ন বাবুলের ছোট ভাই আমিনুল ইসলামকে সরিয়ে এবার আসন্ন বারদী ইউনিয়ন পরিষদ নিবার্চনে লায়ন বাবুল নিজেই প্রার্থী হবেন। তাই এই পরিবারটির এমন রাজনৈতিক নাটকীয় ঘটনা ঘটিয়ে তারা নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তির অবস্থান জানান দিচ্ছেন। একজন নাশকতা মামলার আসামীর ভাই সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগে স্থান পেতে পারেন এটাই সকলের কাছে বিস্ময়। তারা মনে করছেন, এতে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে।
বারদী ইউনিয়ন ৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি ২৬ বছর ধরে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। কোন দিন দেখি নাই লায়ন বাবুল আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। কিন্তু তার ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি সাথে জড়িত। কিন্তু লায়ন বাবুল উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদ পেয়েছে তা আমরা ভেবে পাচ্ছি না। তার পিতা ও বড় ভাই বিএনপির রাজনীতি করতেন।
বারদী ইউনিয়ন ৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামও ক্ষোভ করে বলেন, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ২০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছি। লায়ন বাবুল কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে দেখা যায়নি। নতুন করে লায়ন বাবুল আওয়ামী লীগের কিছু নেতাদের সাথে সখ্যতা তৈরি করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হয়েছেন। অবাক হয়েছি তখন যখন লায়ন বাবুলের মত লোক উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটিতে স্থান পান। সূত্র জানিয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদলের সাথে লায়ন বাবুলের ঘনিষ্ট সম্পর্ক। তাকে ম্যানেজ করেই লায়ন বাবুল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটিতে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। যদিও এতে সম্মত ছিলেননা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই।
আব্দুল হাই যুগের চিন্তাকে জানান, ‘লায়ন বাবুল কিভাবে সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটিতে স্থান পেলো সেটি আমি বলবোনা। এব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদলকে জিজ্ঞাসা করেন। আমি কমিটি দেয়ার সময়ই বলেছিলাম বিতর্কিত কেউ যাতে আহবায়ক কমিটিতে ঢুকতে না পারে।’
এদিকে সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোগনগর ইউনিয়ন নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদল। ভিপি বাদল এখানে ব্যবসায়ী ফজর আলীকে সমর্থন দিচ্ছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ফজর আলীকে হাইব্রীড নেতা বলে সমর্থন জানান। এছাড়া ফজর আলীকে প্রাধান্য দিয়ে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যে কমিটি দেয়া হয়েছে সেটির বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা দেয়ায় ঝুলে গেছে সেই কমিটি।
সূত্র জানায়, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সভায় আওয়ামী লীগ নেতা জসিম উদ্দিনকে সমর্থন জানিয়েছেন। সেসব সভায় আবদুল হাই নানাভাবে দলের হাইব্রীড-কাউয়া টাইপ নেতাদের ব্যাপারে সজাগর থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আর এতে নিজের বলয়ের বেশ কিছু নেতার বিপক্ষে যাওয়ায় আবদুল হাইয়ের সরাসরি বিরোধীতায় জড়িয়ে পড়েছেন সাধারণ সম্পাদক ভিপি বাদল।


