কাজী সেজে বিয়ে পড়ায় ফটোকপির দোকানে
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:০৪ পিএম
# প্রতারণা করে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ
# আদালতপাড়ায় উৎপাত বেশি, রয়েছে অন্যত্রও
# শীঘ্রই অভিযান পরিচালনার আশ্বাস
অনুসরণ করছে না আইন, মানছে না বিধান, নেই ধর্মীয় শিক্ষা। তবুও তারা পরিচয় দেন কাজী। তাই অর্থের লোভে ফটোকপির দোকান, চায়ের স্টল, আইনজীবীর চেম্বারসহ অলি-গলিতে অফিস বানিয়ে স্বাক্ষী ও উকিল সাজিয়ে নিকাহ্ রেজিষ্ট্রি করেছেন দীর্ঘদিন ধরে।
নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া এলাকায় কাজী সেজে অনেকেই নিকাহ্ রেজিষ্ট্রি করছেন। জেলা কাজী সমিতির দাবি, সেখানে যেসব বিয়ে হয় তা অবৈধ। কারণ তাদের কাছে বৈধ রেজিষ্টার বই নেই। জেলা রেজিষ্টার কর্মকর্তা বলছেন, এলাকাভিত্তিক নির্ধারিত একজন কাজী ছাড়া বাকিরা প্রতারক চক্র। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বলছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য মতে, ইসলামী শরিয়া মোতাবেক একজন কাজী প্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ের কাবিন রেজিষ্ট্রি করে থাকেন। সে জন্য তাকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নির্ধারিত এলাকার কাজী হিসেবে অনুমতি দেয়া হয়। তার কাছে একটি কাবিনের ভলিয়ম থাকে। সেখানে বর ও কনের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়। নিকাহ্ রেজিষ্টার করার জন্য প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র দাখিল করতে কাজীকে। ওয়ার্ড বা ইউনিয়নভিত্তিক কাজীর নিকাহ্নামার সংখ্যা পরবর্তীতে যুক্ত হয় মূল ভলিয়মে। অথচ এগুলো ছাড়াই অনেকেই বিয়ে রেজিষ্ট্রি করছেন আদালত পাড়া এলাকায়। তারা নিজেদের পরিচয় দেন কাজী হিসেবে। আবার অনেক সময় বলে থাকেন কাজীর সহযোগী। এমনকি নারীও রয়েছে তাদের তালিকায়।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আদালতপাড়ার আশপাশে মিলিয়ে নারীসহ অন্তত ১০ জন রয়েছে যারা কাজী না হয়েও কাজী সেজে নিকাহ্ রেজিষ্ট্রি করছে। এজন্য বিভিন্ন দোকান, আইনজীবীর চেম্বার ও অলি-গলিতে অফিস বানিয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে যারা তাদের কাছে বিয়ে রেজিষ্ট্রি করতে যায় তাদের স্বাক্ষর নেয়া হয় একটি বই এ। এরপর নাম-ঠিকানা লিখে বলা হয় বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ জানতে চাইলে অনেক সময় বলা হয়, ওমুক-তমুক উপজেলা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কাজীর ভলিয়ম বই আছে তাদের কাছে।
এছাড়া তারা নোটারীও করে থাকেন প্রায় সময়। সেজন্য নেন মোটা অংকের অর্থ। তাছাড়া কাবিননামা সনদের জন্য টাকা নেন আরেক ধাপে। তারা নকল কাগজপত্র বানিয়ে দিয়েও বিয়ে রেজিষ্ট্রি করে থাকে বলে জানা গেছে। সূত্র আরও জানায়, আদালতপাড়ার আশপাশে নুরু, কবির, রাকিব, আলমগীর ও হেলেনা নামের এক নারীসহ আরও কয়েকজন এভাবেই বিয়ে রেজিষ্ট্রি করছে দীর্ঘদিন ধরে। এদের মধ্যে হেলেনা নামের ওই নারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে জেলা কাজী সমিতি। তবে তাতে বন্ধ হয়নি তাদের প্রতারণার ফাঁদ। ফলে যারা না জেনে বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের কাছে যাচ্ছেন তারা সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন জেলা আইনজীবি সভাপতিও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আদালতপাড়া এলাকায় কাজী পরিচয়ধারী এক ব্যক্তি জানান, সেখানে যারা বিয়ে রেজিষ্ট্রি করান তারা মূলত মুহুরি ও পূর্বে রেজিষ্ট্রি করে গেছে এমন ব্যাক্তি ও কিছু নির্ধারিত দালালের মাধ্যমে বর-কনে খুঁজে পান। তাদের কাছে যেসব বিয়ে হয় তার মধ্যে অধিকাংশ গোপন বিয়ে। শুধু মাত্র নাম-ঠিকানা দিয়ে বিয়ে রেজিষ্ট্রি হয়েছে এমন ঘটনাও রয়েছে। তিনি আরও জানান, যারা এখানে বিয়ে রেজিষ্ট্রি করান তাদের মধ্যে কারো কারো কাছে বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড এলাকার কাজীর ভলিয়ম বই রয়েছে। ওই সব ভলিয়মের জন্য মূল কাজীরা বিয়ে প্রতি কমিশন পান।
তবে জেলা কাজী সমিতির সভাপতি কাজী ইসলাম মিয়া জানিয়েছেন, আদালতপাড়া এলাকায় একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিয়ে রেজিষ্ট্রার করছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। তারা বিভিন্ন প্রেস থেকে ভলিয়ম বানিয়ে বিয়ের রেজিষ্ট্রির নামে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। তাদের দেয়া বিয়ে আমাদের মূল ভলিয়মে উল্লেখ নেই। এতে করে তাদের কাছে গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তারা কাজী না হয়ে কাজী সেজে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এ নিয়ে অনেকবার প্রতিবাদ করা হয়েছে। আমরা আশা করছি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।
এ বিষয়ে জেলা রেজিষ্ট্রি কর্মকর্তা জিয়াউল হক বলেন, আদালতপাড়া সহ আশপাশে আমাদের একজন বৈধ কাজী রয়েছে। তার নাম ফারুক। তিনি ছাড়া যারাই সেখানে নিকাহ্ রেজিষ্ট্রি করে তারা অবৈধভাবে করে। সেখানে কারা কারা অবৈধভাবে নিকাহ রেজিষ্ট্রি করে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে সে বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। পাশাপাশি আমরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সহযোগিতাও চাই।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোয়েন্দা) জাহিদ পারভেজ জানান, বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। আমরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।


