মানুষকে শান্তিতে রাখাই আমার রাজনীতি : মেয়র আইভী
প্রেস নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৫৪ এএম
২০১১ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এ কে এম শামীম ওসমানকে লক্ষাধিক ভোটে হারিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী মেয়র নির্বাচিত হন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তারপর থেকেই অপ্রতিরোধ্য। সদ্য সমাপ্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকারের চেয়ে ৬৭ হাজার ভোট বেশি পেয়ে ‘হ্যাট্রিক’ বিজয় পেয়েছেন।
পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে গত ১৮ বছর নগরকর্তার চেয়ারে বসে বদলে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ নগরীর চিরচেনা রূপ। জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হলেও মানুষ তাকে ভালোবাসে দল-মতের উর্ধ্বে উঠে। সারাদেশে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা নাসিক নির্বাচনে টানা তৃতীয় বিজয় সেই জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। নিজের রাজনীতি, নগর পরিকল্পনা ও চলমান নানান বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এই মেয়র। আলাপে ছিলেন প্রেস নারায়ণগঞ্জের চীফ রিপোর্টার ও সংবাদের জেলা প্রতিনিধি সৌরভ হোসেন সিয়াম।
প্রশ্ন: নির্বাচনের আগেও জানতে চেয়েছিলাম, বিজয়ের পরও জানতে চাইছি, আইভী কেন এত জনপ্রিয়?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আইভী কতটুকু জনপ্রিয় আমি জানি না। জনপ্রিয়তা এমন এক জিনিস যা আজকে আছে কালকে নাও থাকতে পারে। তবে আমি মানুষের সাথে মিশেছি একদম নিঃস্বার্থভাবে। তাদের ভালোবেসেছি নিঃস্বার্থভাবে। কখনও চাওয়া-পাওয়ার চিন্তা করি নাই, কী পাবো তা ভাবি নাই। যখন যেখানে যতটুকু কাজ করা দরকার ততটুকু করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে। কারণ আমি যখন কথা দিয়েছি সেই কথা রাখার চেষ্টা করেছি। আমি কখনও আমার কথার বরখেলাপ করিনি। বিনিময়ে আমি কখনও কিছু চাইনি। হয়তো এই কারণে মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে।
প্রশ্ন: বিগত নির্বাচনগুলোও আলোচিত ছিল। তবে সকলেই বলছে, এবারের নির্বাচন আলাদা ছিল। আপনার কাছে কী মনে হয়?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: এই নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি তো বিগত তিনটা নির্বাচন করেছি, তার থেকে এবারেরটা একটু পার্থক্য ছিল। সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচন তো জমজমাট হয়েছে। তাতে আপনাদেরও সুবিধা হয়েছে। এখন এটা নিয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছি না। যা হওয়ার তো হয়েছেই। আসলে সব নির্বাচনই জটিল। একেকটার ধারা একেক রকম হয়। ৫ বছর পরপর নির্বাচন তো, এর মধ্যে অনেককিছুই সংগঠিত হতে থাকে। সুতরাং প্রত্যেক নির্বাচনেই আলাদা মেজাজ ছিল। তবে মানুষকে সাথে নিয়েই তো সফলতা পেয়েছি।
প্রশ্ন: নিজের দলেরই একটি অংশ সরাসরি বিরোধীতাই কী জটিলতার কারণ?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি ঠিক তা বলবো না। বিভিন্ন সমীকরণই ছিল। কে বিরোধীতা করেছে আর কে করে নাই সেটা তো আপনারা দেখেছেন। এখন যেহেতু নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, এখন আর এগুলো নিয়ে কথা না বাড়িয়ে নিজেকে জনগণের কাজে নিয়োজিত রাখার দরকার বলে আমার মনে হয়। যারা বিরোধীতা করার তারা করবেই। এই চিন্তা আমি মাথায় রাখি না, রাখতে চাইও না। আমি আমার সাধারণ মানুষকে নিয়েই কাজকর্ম করে যেতে চাই।
প্রশ্ন: ইভিএম অভিজ্ঞতা কেমন?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: অভিজ্ঞতা খুব বেশি সুখকর ছিল না। কারণ ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ভোটগ্রহণ খুব ধীরগতির ছিল। হয়তো নতুন প্রযুক্তি হওয়ার কারণে হতে পারে। তাছাড়া এইখানে যেটা হয়েছে, নারী ভোটকক্ষগুলো কেন্দ্রের তিনতলা, চারতলাতে দেওয়া হয়েছে। আগে কখনই এইরকম দেখিনি। খুবই সুচতুরভাবে এই কাজটি করা হয়েছে। আরেকটা জিনিস হলো, নারীদের ভোটকক্ষ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন ধরুন, কোনো কেন্দ্রে দশটা ভোটকক্ষ ছিল, সেখানে পাঁচটা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই কাজটা সকালবেলা তাৎক্ষনিকভাবে করা হয়েছে। এটা নির্বাচনের ভালো দিক ছিল না বলে মনে করি। আমার নারী ভোটাররা অনেকেই ভোট দিতে পারে নাই। প্রচুর ভোটাররা ফেরত গিয়েছে। এটা আপনারা নিজেও দেখেছেন। ইভিএমে ভোট দিতে একেকজনের তিন-চার মিনিট লেগেছে। অনেকের আরও বেশি সময় লেগেছে। এই কালক্ষেপণ হওয়ার কারণে আমার ভোট কিন্তু অনেক কমেছে। গতবার ৬২ শতাংশ ভোট কাস্টিং ছিল। এবার ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট কাস্টিং হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এজন্য ভোটের ব্যবধান কমেছে। কাস্টিং বেশি হলে ভোটের ব্যবধান আরও বাড়তো।
প্রশ্ন: শীঘ্রই শপথ হতে যাচ্ছে। পুরোনো চেয়ারে নতুন করে বসবেন। নতুন কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: অনেক পরিকল্পনা আছে। প্রথমত যেই কাজগুলো করছিলাম সেগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে করবো। ময়লা-আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্নের কাজ শুরু করেছিলাম। এটাতে বেশি করে মনোযোগ দিতে হবে। নদীর ওইপাড়েও (বন্দর) ময়লা-আবর্জনার জন্য একটি জায়গা অধিগ্রহণ করছি। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন নয় অন্য কিছু করার চিন্তা রয়েছে। সেখানে কী করবো তা নিয়ে দাতা সংস্থাগুলোর সাথে আলাপ-আলোাচনা করবো।
পানি সরবরাহের জন্য জন্য দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প জমা দিয়েছি। নতুন করে একটা পানি শোধনাগার করতে চাচ্ছি। গোদনাইলের পানি শোধনাগারটি অনেক পুরোনো। নতুনটা করতে চাচ্ছি নদীর ওইপাড়ে মেঘনা নদীর কাছাকাছি কোনো জায়গায়। এইটার প্রতি বেশি মনোনিবেশ করবো। এটা একটা বড় প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট)। এইরকম আরও কিছু কাজ করতে চাচ্ছি। নগর পরিবহন, মাল্টিমডেল হাব নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছি। নদীর দুই পাড়েই আমরা কাজ করতে চাচ্ছি। দুইপাড়ের রাস্তা, ফুটপাত বাঁধিয়ে সবুজায়ন করতে চাচ্ছি। এইরকম চার-পাঁচটা বড় কাজ করতে চাচ্ছি। শীতলক্ষ্যার উপর কদমরসুল সেতুরও দ্রুত ভিত্তিপ্রস্তর করতে চাই।
প্রশ্ন: শীতলক্ষ্যা নিয়ে আপনি বড় পরিকল্পনা করেছেন। গত মেয়াদে এ নিয়ে অনেকটা এগিয়েছিলেন।
সেলিনা হায়াৎ আইভী: শীতলক্ষ্যা তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা; এই চারটি নদী নিয়ে সরকারও কাজ করছে। সেখানে শীতলক্ষ্যাও আছে। আমরাও সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে সরকারের সহযোগী হয়ে কাজ করতে চাচ্ছি। প্রথমত ডাইংসহ অন্যান্য কলকারখানার বর্জ্যমিশ্রিত পানি সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হচ্ছে। সিটি করপোরেশনেরও ময়লা পানি নদীতে যাচ্ছে। সেইখানে আমাকে আগে কাজ করতে হবে। ইটিপি তৈরি করে পানিকে পরিষ্কার করে নদীতে ফেলতে হবে। পাশাপাশি অন্যদেরও সাথে নিয়ে কাজ করতে চাই।
প্রশ্ন: স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি হলেও জনপ্রশাসনের তেমন সহযোগিতা পান না। এই কথা আপনি নিজেও বলেছেন। সমন্বয়টা এবার কী হবে?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি তো আশা করবোই। কারণ আশা করতে তো কোনো বাধা নেই। আমরা তো চাইবোই, সবগুলো প্রশাসন একসাথে মিলে কাজ করার জন্য। কারণ কিছু কিছু কাজ প্রশাসনের সহযোগিতা না পেলে করা যায় না। আমার চাওয়া তো সবসময়ই ছিল। কম-বেশি সহযোগিতা তো তারা করেছে। আমরা চাই যে, এটা ব্যাপকভাবে করুক, জনকল্যাণে করুক।
প্রশ্ন: জনপ্রতিনিধি তো আপনি প্রায় দেড় যুগেরও বেশি। রাজনীতির মাঠে নিজের অবস্থান বোধহয় এবার খুব শক্ত হলো?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি তো একজন ছোট-খাটো কর্মী। অবস্থান শক্ত নাকি দুর্বল হলো তা কখনও যাচাই করে দেখিনি। আমি তো মাঠের কর্মী। আমি তো মাঠেই কাজ করবো। মাঠের কাজ করতে হলে অবস্থান যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হয় না। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী, জননেত্রী শেখ হাসিনার একজন ক্ষুদ্র কর্মী। আমি আমার দলে থেকে দলের আদর্শ-নীতি মেনে দল-মতের উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে চাই। এই ধারাটা আমি বজায় রাখবো। আমি আমার ধারায় কাজ করতে চাই।
প্রশ্ন: নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি; বিশেষ করে আওয়ামী লীগে বড় পরিবর্তনের আভাস পাচ্ছি।
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি তো এখনও তেমন কোনো আভাস পেলাম না। আপনারা কোত্থেকে পান আমি ঠিক জানি না। তবে আমাদের অনেকগুলো সংগঠনেরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে পরিবর্তন অনিবার্য। অনেক সংগঠন সাত-আট-দশ বছর যাবৎ আছে। তিন বছর অন্তর কমিটি করতে হয়। সেক্ষেত্রে পরিবর্তন হতে পারে। তবে এর সাথে সিটি নির্বাচনের সম্পৃক্ততা দেখি না। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো এমনিতেই পরিবর্তন হবে। আমি আবারও বলি, দলের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হয়েও আমি জনস্বার্থে কাজ করতে চাই।
প্রশ্ন: আপনার বাবার সময় আওয়ামী লীগের বড় শক্তি ছিল ‘চুনকা কুটির’। সেই চুনকা কুটির আবারও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ‘পাওয়ার হাউজ’ হচ্ছে বলে অনেকেই বলছেন...
সেলিনা হায়াৎ আইভী: এটা বরাবরই ছিল। আমার বাবা (আলী আহাম্মদ চুনকা) আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত-প্রাণ কর্মী ছিলেন। রাজনীতি ছাড়া তিনি জীবনে অন্য কিছু চিন্তা করতে পারেন নাই। উনি বঙ্গবন্ধুর এমনই একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন যে, দলের প্রয়োজনে বাড়ি, গাড়ি, জমি বিক্রি করেছেন। মায়ের অলংকারও বিক্রি করে রাজনীতি করেছেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আওয়ামী লীগেরই একজন কর্মী ছিলেন, দলের জন্য কাজ করেছেন। আমরাও চেষ্টা করেছি, বাবার আদর্শকে অনুসরণ করে সর্বক্ষণ দলের প্রতি যে দায়িত্ব-কর্তব্য তা পালন করার।
প্রশ্ন: নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি পদে আছেন। আপনার শুভাকাঙ্খিরা আপনাকে আরও উপরে দেখতে চান। সেক্ষেত্রে আপনার ভাবনা কী?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: কে কী চায় তাতে কিছু আসে যায় না। জননেত্রী শেখ হাসিনা কী চাচ্ছেন সেটা সবচেয়ে বড় কথা। আমি যেখানে কাজ করছি সেখানে জনগণেরই কাজ করছি। এইটাও রাজনীতি, এটা জনকল্যাণে রাজনীতি। সুতরাং এখানে আলাদা করে দেখার কিছু নেই। উন্নত ও নিরাপদ নগরীতে মানুষকে শান্তিতে রাখাই আমার রাজনীতি। আমি যেভাবে আছি সেভাবেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি।
প্রশ্ন: জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কখনও ভেবেছেন বা ভাবছেন?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: এখনও ভাবিনি। প্রয়োজন পড়লে ভাববো।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী সিটি মেয়র হয়েছিলেন আপনি। দীর্ঘ পথচলায় নারী হিসেবে আলাদা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: প্রথম প্রথম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এখন আর সেই জটিলতা নাই। কিন্তু সুযোগ পেলেই অনেকে খুব সহজেই নারীকে অসম্মান বা অপমান করে ফেলে। আমি নারী বলেই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো সহজ হয়। এইগুলোকে আর মাথায় রাখি না। প্রথমেই আমি চিন্তা করি, আমি একজন মানুষ। আমি নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবি। তারপর ভাবি, জনগণ আমাকে একজন লিডার হিসেবে কাজ করতে সুযোগ দিয়েছে। তারপর আমি নারী, আমি কারও মা, কারও বোন, কারও স্ত্রী; সেই চিন্তা মাথায় আসে। কিন্তু প্রতিকূলতা আছে, বাধা আছে, বাধা থাকেই। সেগুলোকে অতিক্রম করে নেই, করে নিতে হয়।


