পুতা মিষ্টি ও কাঠের নৌকার বিখ্যাত কাইকারটেক হাট
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:১৩ এএম
কাইকারটেক হাট। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে এই হাটের যাত্রা। প্রতি রবিবার সোনারগাঁও উপজেলার মোগড়াপাড়া এলাকার পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে বসে এই হাট। সপ্তাহে শুধু রবিবার এই হাট বসে বলে অনেকেই কাইকারটেকের হাটকে রবিবারের হাট বলে থাকে।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত হাটটির চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ অসাধারণ। হাটের পাশেই রয়েছে কাইকারটেক ব্রিজ। ব্রিজ থেকে চারদিকে তাকালেই চোখে পড়বে সবুজের সমারোহ। দেখে মনে হয়, ২০০ বছরের পুরোনো এই হাট এখনো গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে বুকে লালন করে আছে। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লাসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছে এটি কাইকারটেক হাট নামেই পরিচিত।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র নিয়ে দোকানদাররা পসরা সাজিয়ে আছেন। হাটে কেনাকাটা করতে দলে দলে লোকজন আসছেন। কবুতর, জাল, দা, কুড়াল, জামা-কাপড়, গরু-ছাগল, মিষ্টি, মাছ, হাঁস-মুরগিসহ নিত্য ব্যবহার্য সবকিছুই রয়েছে এই হাটে। খাবার জিনিস থেকে শুরু করে ঘর বানানোর আসবাব পত্র। শখ করে মাছ ধরার জাল কিংবা ছাই। পাওয়া যায় ডিঙ্গি নৌকা, সবুজ বনায়নের জন্য গাছ গাছালী। আরও পাওয়া যায় অনেক শখের জিনিস। এতসব পণ্যের মাঝে ৯০ দশকের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন জিনিসপত্র স্মরণ করিয়ে দিবে পুরোনো দিনের কথা।
ঐতিহ্যবাহী কাইকারটেক হাটের নৌকার কেনাবেচার ইতিহাস বহু বছরের পুরোনো। এ হাটের নৌকার খ্যাতি এলাকা ছড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে গেছে। আর তাই বছরব্যাপী হাট বসলেও আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন এই চার মাস অল্প দামে ভালো মানের নৌকা কেনার জন্য হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর ক্রেতার আগমন ঘটে। ওই ৪ মাস কাইকারটেক হাটে মানুষের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে।
এছাড়া হাটে মাছ ধরার বিভিন্ন সামগ্রী কাস্তে, বটি, কলমের গাছ থেকে শুরু করে মৌসুমী নানা ফল, যেমন-আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল ও ঘরে বানানোর আসবাবপত্র, হার্ডওয়্যারের জিনিসপত্রসহ সবই রয়েছে।
হাটে বিক্রি হওয়া মজার মজার খাবারের স্বাদ ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে। ঐতিহ্যবাহী এই হাটের প্রধান আকর্ষণই হলো বিশেষ এক ধরনের মিষ্টি। ওজন আর পরিমাপে অন্যান্য মিষ্টির তুলনায় এই মিষ্টি কয়েকগুন বড় হয়ে থাকে। এক একটা মিষ্টির ওজন আধা কেজি থেকে দুই কেজি হয়ে থাকে। ক্রেতারা চাইলে অর্ডার করে আরো বড় মিষ্টি কিনতে পারেন। এই মিষ্টিগুলো দেখতে অনেকটা শিলপুতার মতো তাই সবার কাছে এই মিষ্টি ‘পুতা মিষ্টি’ বলেই পরিচিত। এই হাটে অনেক মিষ্টিপ্রেমীরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন শুধু এ মিষ্টির স্বাদ নেওয়ার জন্য।
হাটে পুতা মিষ্টির ছাড়াও তালের রস, কালোজাম, রসগোল্লা, জিলাপি, মোহনভোগ, লালভোগ, বালুশাহসহ নানা পদের মিষ্টি থেকে শুরু করে দই, পরোটা-ভাজি, ডালসহ নানা পদ এখানে পাওয়া যায়। মিষ্টির পাশাপাশি বিক্রি হয় টক দই ও আখের গুড় দিয়ে বানানো লাচ্ছি, বিশেষ ঝালমুড়ি, মুরালি, বুট, পেঁয়াজু, নিমকি, চানাচুর, মোয়াসহ নানা ধরনের লোকজ খাবার।
তাছাড়া রবিবারের এই হাটে পাইকারি দামে যে পরিমাণ টাটকা শাকসবজি পাওয়া যায় তা অন্য কোথাও পাওয়া দুষ্কর বিষয়।
সাগর মিয়া নামে কাইকারটেক হাটের এক দোকানদার বলেন, এ হাটে বাঁশ, কাঠ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি থেকে শুরু করে তরমুজ, চাল, ডালসহ কৃষকদের উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হয়। ঈদুল আজহার সময় নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে বড় পশুর হাট এখানে বসে।
কথা হয় হাটে আসা এক ক্রেতার সাথে। তিনি জানান, ২০০ বছরের পুরনো এই হাটে বর্তমানে অন্যসব হাটের মতোই নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল জিনিস পাওয়া যায়। নদী, প্রাকৃতিক পরিবেশ, কর্ম চঞ্চল হাটের ব্যস্ততা উপভোগ করার পাশাপাশি মুখরোচক খাবারের স্বাদ নিতেই আমার এখানে আসা।


