ভাষার মাস : কথকতা খেজুর ও তেঁতুল বৃত্তান্ত
করীম রেজা
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৪৪ পিএম
১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন মানব সভ্যতার ইতিহাসে নজির বিহীন ঘটনা। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ৩০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলা। আধুনিক বিশ্বে বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে আছে নানা জিজ্ঞাসা। বাংলা ভাষী মানুষের ব্যবহারিক আচরণেই এ সকল প্রশ্নের সমাহার। আত্মসচেতনতা নিয়েও আছে নানান বাদানুবাদ। “বিদেশের কুকুর ধরায় স্বদেশের ঠাকুরকে অবহেলা করতে বাঙালি পারঙ্গম”-বলেছেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। “আত্মঘাতি বাঙালি”- পুস্তকে নীরবচন্দ্র চৌধরী বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন।
ভাষা ব্যবহারে পৃথিবীর অন্যান্য জাতি বা দেশের তুলনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদাসীন। বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডার সমৃদ্ধ থাকার পরেও আমরা সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাই। বিদেশি শব্দের অনুবাদ করি একটি নতুন শব্দ বা শব্দ বন্ধ দিয়ে। কয়েকদিন আগে একটি লেখায় “বজায়ক্ষম” বলে একটি শব্দ চোখে পড়ে।
ফেসবুকের সুবিধা নিয়ে লেখকের কাছে জানতে চাইলাম যে, “টেকসই” শব্দের বদলে তিনি তা ব্যবহার করেছেন কিনা। তিনি ইতিবাচক জবাব দিলেন। টেকসই, লাগসই, মুৎসই প্রভৃতি শব্দ থাকার পর, তা ব্যবহার করা হয় না। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায়,“ধাক্কা” শব্দের বিপুল ব্যবহার-বিস্তার। ইংরেজী ংযড়পশ ‘শক’ শব্দের বাংলা অনুবাদরূপে ধাক্কা যত্রতত্র প্রয়োগ করা হয়। বাক্যের উদ্দিষ্ট ভাবের দিকে খেয়াল করলেই কিন্তু উপযুক্ত অর্থবোধক সহজ বাংলা শব্দ লেখা যায়। তেঁতুলের ইংরেজী শব্দ ট্যামারিন্ড আমরা সবাই জানি। এও জানি ট্যামারিন্ড শব্দের মূল উৎস বাংলা। যদিও শব্দটি সরাসরি বাংলা থেকে ইংরেজীতে না গিয়ে ভায়া হয়ে গিয়েছে। তাইতো এটিকে প্রথমে মূল বাংলারূপে চিনতে অসুবিধা হয়। ইংরেজি ভাষায় প্রবেশের আগে তেঁতুলের অবস্থান ছিল আরবী ভাষায়। আরবী ভাষায় কারিগরি অর্থাৎ আত্মস্থ করার-কৌশলের কারণে রূপ বদল হয়েছে। আরববাসীরা তেঁতুলের সঙ্গে তাদের দেশের খেজুরের খুব মিল খুঁজে পায়। যেমন খেজুরের খোসার নিচে মাংসল খাদ্য উপাদান আছে। আছে একটি শক্ত দানা বা বীজও। আকার আয়তন স্বাদ-গন্ধ ভিন্ন হলেও তারা ঐ মিলটুকু গুরুত্ব দিয়ে ওই ফলের একটি নিজস্ব নামকরণ করে। নিজের ভাষায় ফলটির বিদেশি পরিচয় দেশীয় ফলের সঙ্গে মিল রেখে পরিচিত হয়। আরবী ভাষায় খেজুর “তামর” নামে পরিচিত। তেঁতুলও তামরের মতো প্রায়। উৎস হিন্দুস্থান। তাই এর নাম হল হিন্দুস্থানী খেজুর। আরবীতে “তামর আল হিন্দ”। ইউরোপে আরব শাসর্ন প্রতিষ্ঠিত হলে কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ভাষা প্রভাবও অবশ্যম্ভারী হয়। ইংরেজি ভাষায় নিজস্ব নিয়মে ”তামর-আল-হিন্দ”- উচ্চারণে হল “ট্যামারহিন্ড” কালে কালে পরিবর্তন হয়ে ট্যামারিন্ড। তেমনি আরবী ভাষায় “ভোতজ আল হিন্দ”- নামের আরেকটি ফল দেখা যায়, যার উৎস ভূমি এই ভারত উপমহাদেশ তথা বাংলা। বাংলার গৌরব কীর্তনের সুর ধারা স্তিমিত হতে থাকবে যদি আত্মসচেনতার র্চচা ব্যক্তি, সমষ্টি ও প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জোরালো না হয়।


