# সরকার এবং রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে : রফিউর রাব্বি
# অভিভাবকদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে : হাজী নুরউদ্দিন
# পুলিশের নজরদারি রয়েছে, অভিভাবকদেরও সজাগ থাকতে হবে : এসপি
নগরীসহ জেলার আশ পাশের এলাকা গুলোতে হঠাৎ করেই অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বীভৎস কায়দায় খুন করা হচ্ছে। সেই সাথে লাশ গুম করতে মানব দেহকে খণ্ডবিখণ্ড করা হচ্ছে। আবার ছুড়িকাঘাতসহ পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক সংকট, পরকীয়া, মাদক, টিকটকসহ বিভিন্ন কারণে ঘটছে খুনের ঘটনা। একের পর এক খুনের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে জনমনে। তার মাঝে চাঞ্চলকর কয়েকটি ঘটনার ক্লু বের করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেই সাথে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। এর পরেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমছে না। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণে নৃশংসতার চিত্র ফুটে ওঠে। এদিকে সচেতন মহল সহ নগরবাসী এই অপরাধ থেকে বের হওয়ার জন্য পথ খুঁজতে গিয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। সেই সাথে তাদের সন্তানদের প্রতি খোজ রাখার আহবান জানান সচেতন মহল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নারায়ণগঞ্জে অপরাধে জড়াচ্ছে টিকটকাররা
জনপ্রিয় সংক্ষিপ্ত ভিডিও তৈরির অ্যাপ টিকটক। অপব্যবহার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের এ মাধ্যমটি। টিকটকের মাধ্যমেই অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে কিশোররা। এতে খালি হচ্ছে অসংখ্য মায়ের বুক। এছাড়াও কিশোরী ও তরুণীরা তাদের সম্ভ্রম হারাচ্ছেন। বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে তরুন তরুণীরা টিকটকে জরিয়ে পরছে। তাদের বেশির কিশোর কিশোরীর গায়ে দেরশ থেকে ২০ টাকার প্যান্ট শার্ট পড়া থাকে। সেই সাথে হাতে একটি এন্ড্রোয়েট দামি মোবাইল থাকে। দাম কমপক্ষে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। তারা কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত। এদের কেউ প্রিন্টিং কারখানা, কেউ গার্মেন্টস আবার কেউ ডাইং কারখানায় চাকরি করে। এছাড়াও মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। সপ্তাহ শেষে ছুটির দিনে ওরা দলবেঁধে ‘টিকটক’ ভিডিও চিত্র তৈরি করে ফেসবুকে ছাড়ে। বন্ধুদের শেয়ার করে। কিন্তু বেশভূষায় তার ছাপ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে ভাসমান, কোনো আত্মীয়ের বাসায় থাকে কিংবা কোনো মেসবাড়িতে থাকে। এদের বেশিরভাগই জামালপুর, বরিশাল, নাটোর, নোয়াখালি, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, মাগুরা, গাইবান্ধা, যশোর ও রংপুর থেকে আসা।
নৃশংস কয়েকটি ঘটনা
বুধবার (২ ফেব্রুয়ারি) টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য এক কিশোরীকে (মাদরাসাছাত্রী) তার নানিবাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় কথিত প্রেমিকসহ পাঁচ টিকটকার। কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদী এলাকায় তারা রাত পর্যন্ত টিকটক ভিডিওর শুটিং করে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ইস্পাহানি মাঝির গল্লী এলাকার নির্জন জায়গায় নিয়ে কথিত প্রেমিক ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে। এসময় এলাকাবাসী ধর্ষণের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিন সহযোগীকে আটক করে। সেসময় কৌশলে প্রেমিক ও দুই সহযোগী পালিয়ে যায়। পরে কথিত প্রেমিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের সবার বয়স ১৫ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।
গত ২৮ জানুয়ারি রাতে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় কিশোর আমান আলী (১৭)। এ ঘটনায় মামলা করার আগেই সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয় ৬ কিশোরকে। তারা সবাই আমানের সহকর্মী ও বন্ধু হিসেবে পরিচিত। তাদের দৈনন্দিন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম দেখে চোখ কপালে উঠেছে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের। শুরুতে পরিবারের সন্দেহ থেকেই আমানের সঙ্গে চলাফেরা করে ৮ জনকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেফতার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। গ্রেফতাররা হচ্ছেন-রাসেল (১৯), আব্দুল হাকিম (১৯), সৌরভ ওরফে হৃদয় (১৮), আনিস (১৮), আব্দুস ছালাম স্বাধীন (১৯) ও আশিক (১৮)। তারা সবাই আমানের ঘনিষ্ট বন্ধু।
গ্রেফতারদের একজন জানান, ‘আমানসহ ৯ বন্ধু মিলে আমরা নিয়মিত একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। সেখান থেকেই স্বপ্ন জাগে একদিন ফতুল্লার শিল্পাঞ্চলের ডন তথা প্রভাব বিস্তারকারী হবো। কে কত দ্রুতগতিতে অস্ত্র চালাতে পারবে তা ইংরেজি সিনেমার অ্যাকশন দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হতাম। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বন্ধুদের কেউ কেউ প্রস্তাব দেয় রাজনৈতিক নেতার হাত ধরার। আবার কেউ প্রস্তাব দেয় নিজেরাই গ্রুপ তৈরি করে বিসিক নিয়ন্ত্রণ করবো। এরপর থেকে নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য প্রতি মাসে প্রাপ্ত বেতনের টাকায় ছুরি, চাকু কিনে তা সংগ্রহ করা শুরু হয়। তাদের মোবাইলে দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারমুখী ভঙ্গিমায় তোলা ছবি পাওয়া গেছে। তারা যে টাকা বেতন পেতো তা দিয়ে প্রতি মাসেই ব্যক্তিগতভাবে ছুরি, চাকু কিনে সংগ্রহ করতো। এসব ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা ছিল তাদের।
১৪ জানুয়ারী ভোরে আকাশকে ঘুম থেকে উঠে গাড়িতে থাকা মালামাল আনলোড করার নির্দেশ দেয় টিপু। শীতের এক সকালে ঘুম থেকে উঠা নিয়ে গালাগালের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে হেলপার আকাশকে (২১) গলাটিপে হত্যা করে মহাসড়কের পাশে লাশ ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতক ট্রাক চালক টিপু। শুরুতে পুরো ঘটনাটি ক্লুলেস থাকলেও পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে প্রথমে পরিচয় পরে উদঘাটন হলো হত্যাকান্ডেরকারণ। ছদ্মবেশে গ্রেপ্তার করে সেই চালক আরিফুর রহমান টিপুকে (৩০)। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের মিডিয়া উইং হাফিজুর রহমান ২ ফেব্রুয়ারী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। হত্যাকান্ডের পর আকাশের বাবার দায়ের করা মামলার তদন্তকারী অফিসার কখনও চালক, কখনও হেলপার বা ব্যবসায়ী পরিচয়ে ছদ্দবেশে খুঁজতে থাকেন সেই চালককে। চালকের নাম পাওয়ার পর তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় পাওয়া যায় তার ঠিকানা। চাল ব্যবসায়ী সেজে কাঙ্খিত সেই চালকের সাথে যোগাযোগ করা হয়। সময় অনুযায়ী ২৯ জানুয়ারি চলে আসে ট্রাকসহ চালক। গ্রেপ্তার করা হয় টিপুকে। তিন দিনের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে স্বীকার করেন তিনিই খুন করেছেন ভিকটিম আকাশকে। ১ ফেব্রুয়ারি আদালতে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়ে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে আসামি আরিফুর রহমান টিপু।
স্বীকারোক্তিতে টিপু জানান, গত ১৩ জানুয়ারী রাতে সে ও ভিকটিম আকাশ গাঁজা সেবন করে। তাদের ট্রাকে ছিলো পুরাতন বই ও কাগজ যা রাজধানীর মাতুয়াইলে পৌঁছে দিতে হবে। কুমিল্লা থেকে রওনা হয়ে শুক্রবার রাতে তারা শিমরাইল স্ট্যান্ডে পৌঁছায়। সেখানে রাত্রিযাপন করে পরদিন ১৪ জানুয়ারী ভোরে আকাশকে ঘুম থেকে উঠে গাড়িতে থাকা মালামাল আনলোড করার নির্দেশ দেয় টিপু। কিন্তু ঘুম থেকে উঠতে অস্বীকৃতি জানায় আকাশ। এতে চালক টিপু তাকে গালিগালাজ করে। প্রতিউত্তরে আকাশও গালি দিলে টিপু তার গলা চেপে ধরে। ট্রাক সিটের ভেতরেই হত্যা করে তাকে। হত্যা শেষে ট্রাক নিয়ে মাতুয়াইলে পণ্য খালাস করে পুনরায় কুমিল্লার দিকে রওনা দেয়। সেখানেই চলার পথে জুম্মার নামাজের পূর্বে মহাসড়কে আকাশের মরদেহ ফেলে পালিয়ে যায়।
২০২০ সালের ২৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এইচআর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতর এক তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী তরুণী টঙ্গী আবদুল্লাহপুর এলাকার বাসিন্দা। মামলার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, টিকটকে অভিনয় করার জন্য ওই তরুণীর (১৮) সঙ্গে চুক্তি করেন নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া এলাকার সালাম নামের এক ব্যক্তি। সালামের দেওয়া একটি নম্বরে যোগাযোগ করে ওই তরুণী রূপগঞ্জ উপজেলার ব্রাক্ষ্মণখালী এলাকায় আসেন। রাত ৮টার দিকে স্কুলে গেলে তাকে রিসিভ করেন এইচআর মডেল স্কুলের কেয়ারটেকার জামাল হোসেন। তরুণী স্কুলে উপস্থিত হয়ে বুঝতে পারেন এখানে কোনো শুটিং হবে না। বিপদ আঁচ করতে পেরে বেরিয়ে যেতে চাইলে তার মুখ বেঁধে ফেলা হয়। পরে রাত ১০টা ৩টা পর্যন্ত তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করেন আসামিরা।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ‘কিশোর অপরাধ হচ্ছে একটা সামাজিক ব্যাধি। সমাজের যখন অবক্ষয় চলে,পারিবারিক অশান্তি নামে, মানুষ যখন আর্থিক সংকটে পরে তখন এই সকল অপরাধ বেরে যায়। সেই সাথে মানুষ বেচে থাকার জন্য খাবার না পেলে তখন তারা বিভিন্ন অপরাধে জরিয়ে পরে। এর থেকে পরিত্রানের জন্য রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার অভাব রয়েছে। মানুষকে সু শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। এই সকল অপরাধ মুক্ত করার জন্য সরকার এবং রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে হয়ত কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।’
‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা নুর উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘টিকটকে বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলেগুলো বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। একটি চক্র বেতনের টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে মহড়া দেয়। উঠতি বয়সের মেয়েরাও এখানে জড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এগুলোর লাগাম টেনে ধরা দরকার।’ তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত এগুলোর পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়। সন্তানদের বখে যাওয়া ঠেকাতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জায়েদুল আলম যুগের চিন্তার প্রতিবেদককে বলেন, টিকটক সামাজিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এটা দমনের জন্য সামাজিকভাবে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। যারা এগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের বাবা-মাসহ সকল অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। সেই সাথে পারিবারিক কলহ সহ পরকীয়ায় জরিয়ে নারী পুরুষ অপরাধে জরিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদেরকে সামাজিক, রাজনৈতিক ভাবে সচেতনতার পাশা পাশি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে সকল ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। সর্বোপরি পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসকল অপরাধ কমে আসবে বলে মনে করি। সেই সঙ্গে সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদেরও সচেতন হতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের নজরদারি রয়েছে। যেখানেই এসব ঘটনা ঘটছে সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


