Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

সাবদীতে ফুল চাষীদের দুর্দিন

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:১১ পিএম

সাবদীতে ফুল চাষীদের দুর্দিন
Swapno

# করোনা শুরু হওয়ার পর পেশা ছেড়েছেন তিন চতুর্থাংশ
# সময়মতো ফুল উৎপাদন হচ্ছে না : ফুল চাষী
# চাষীদের পাশে দাঁড়াতে এমপি নির্দেশ দিয়েছেন : দেলোয়ার প্রধান

 
ফুল শুধু সৌন্দর্য্যই নয়, ভালবাসা এবং পবিত্রতারও প্রতীক। আর প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রকাশ করার অন্যতম মাধ্যম হলো ফুল। ফুলের গন্ধে ঘুম কেড়ে নেয়ার মতোই একটি গ্রাম ছিল সাবদি। গ্রামটি বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত। এখানকার ফুলের বাগান আর সাবদীর কোল ঘেষে ব্রহ্মপুত্র নদের সৌন্দর্য্যে এখানে একটি পর্যটক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। এ গ্রামের আশপাশের সব জমি ও বাড়ির আঙ্গিনায় হরেক রকমের ফুলের বাগানের সৌন্দর্য্যে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই চোখ জুড়িয়ে যেত। বছরের এই সময়টায় (ফেব্রুয়ারি মাসে) এই গ্রামের যেদিকে দু’চোখ যায় কেবল ফুল আর ফুল দেখা যেত। এখানে চাষ হতো ডালিয়া গ্লারি মাম, স্ট্যাক, গাঁদা, ক্যালেরডোলা, চেরী, কাঠমালতি ও জিপসিসহ প্রায় দশ থেকে ১২ প্রজাতির ফুল। তবে গত তিন বছর যাবৎ অর্থাৎ করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে এখানকার কৃষকদের ভাগ্যের চাকা থমকে দাঁড়ায়। 

 

এর ফলে এখানে উৎপাদিত ফুল সরবরাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হওয়ার ফলে ব্যবসায় লাভবান হতে না পেরে এখানকার প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ চাষীই ফুল চাষ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যায়। বাকি একভাগ কোন রকম ফুল চাষের পেশায় টিকে থাকলেও এবার সেই পেশায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বৃষ্টি। গত জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকের একটানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে এখানকার চাষাবাদের জমিতে পানি জমে বেশীরভাগ গাছ পঁচে যায় এবং পুণরায় লগ্নি করতে হয়। কিন্তু তারা যেই দিবসগুলোকে টার্গেট করে এই চাষাবাদ করে অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি ভেলেন্টাইন ডে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সরবরাহ করার মতো ফুল উৎপাদন সম্ভব হবে না। তাই এবার সেই ফুল চাষীদের মন ভারী। কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। ফুল বিক্রি করে বড় একটা লভ্যাংশের চিন্তা এখন তারা আর করতে পারছে না। বরং মূলধন নিয়েই চিন্তিত তারা। আর এ জন্য তারা সহযোগিতা চাচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।
 
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জমিতে ফুলের পরিমান খুবই কম। ফেব্রুয়ারির এ সময় যেখানে মাঠের পর মাঠ ফুলের ঢালি সাজিয়ে রাখতো প্রকৃতি। সেখানে জমির পর জমি পড়ে আছে চাষাবাদহীন অবস্থায়। অথচ এসব জমিতে আগে চাষ হতো ফুল। আর প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য দেখতে শুধু নারায়ণগঞ্জই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা এখানে চলে আসতো প্রকৃতির এমন মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। এ সময় কিছু জমিতে ফুল চাষীদের চাষাবাদের কাজ করতে দেখা গেলেও কথা বলতে রাজি হননি অনেকে। কারণ তাদের মন ভাল নেই। যারা বলেছেন, শুধু হতাশার কথাই বলেছেন।
 
ফুল চাষী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এবার আমাদের মনে হয়না যে চালান (মূলধন) আসবে। অসময় যদি বৃষ্টি না হতো ফুলের গাছগুলো পঁচে না যেত তাহলে আমরা কিছুটা ভাল করতে পারতাম। প্রায় ১৫ কানি (দেড় শত শতাংশ) জমিতে এবারের ফুল চাষে তার প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রথমবার বৃষ্টিতে বেশীরভাগ চারা-ই পঁচে গিয়েছে। যা ছিল তার বেশীর ভাগই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নষ্ট ফুলগুলো যেগুলো ২০টাকা বিক্রি করতাম তা এখন ৫ টাকায় বিক্রি করতে হবে। তাছাড়া প্রথম বার গাছ নষ্ট হওয়া দ্বিতীয় বার চারা লাগাতে হইছে বিধায় এখন যথা সময়ে ফুল উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা নাই। আমরা ফেব্রুয়ারির ১৪ এবং ২১ তারিখকে টার্গেটে রেখে এবারের যে ফুলের চাষ করেছি তা সময় মতো উৎপাদন হবে না। এখন লাভের চিন্তা বাদ দিয়ে চালানো চিন্তা করতে হচ্ছে।
 
অপর চাষী জাকির হোসেন জানান, আমরা ১৪ এবং ২১  ফেব্রুয়ারিকে টার্গেট করে প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস পূর্ব থেকেই জমি তৈরিসহ প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। এবার তিনি প্রায় একলাখ টাকার মতো খরচ করে ফেলেছেন। এমনিতে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো লাগার কথা কিন্তু জানুয়ারির প্রথম দিকে হওয়া বৃষ্টিতে প্রথম বার লাগানো গাছগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার গাছ লাগাতে হয়েছে। তাই এবার বেশী টাকা খরচ হয়েছে। অন্যদিকে সময় মতো ফুল উৎপাদন হচ্ছে না। তাই মূলধন তুলতেই অনেক কষ্ট হয়ে যাবে। এ সময় তিনি এই প্রতিবেদককে অনুরোধ করে বলেন, আপনারা মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের সমস্যার কথাগুলো সরকারকে জানান। এমনিতেই করোনার কারণে এখানকার ফুল চাষীরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আমরা কোন রকম টিকে ছিলাম। কিন্তু এবার আমাদের অসস্থা খুবই খারাপ। সরকার সহযোগিতা না করলে আমাদের বেঁচে থাকাই কষ্ট হয়ে যাবে।  
 
এবিষয়ে কথা বললে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদ এর চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধান বলেন, এ পেশায় যারা আছেন তাদের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। ২০২০ সালে প্রথম যখন করোনা বাংলাদেশে আক্রমণ শুরু করে তখন তারা বিশাল একটি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পরের বছর তারা কিছু ঋণ করে পুনরায় চাষাবাদ শুরু করে এবং ফুলের ব্যাপক উৎপাদনও হয়। কিন্তু করোনার কারণে সেবছরও তারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল। এরমধ্যে তাদের প্রায় ৭৫ভাগ লোকই এ পেশা ছেড়ে দেয়। যে ২৫ শতাংশ লোক এবার ফুলের চাষ করছে তারাও করোনার কারণে এবারও ক্ষতির সম্মুখীন। তার উপর এক মাস আগে হওয়া বৃষ্টির কারণে তাদের গাছপালা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবার উৎপাদনেও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তারা। এই করোনা ভাইরাস থাকা অবস্থায় আমার মনে হয় তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনটি ধাক্কায় তারা এমনিতেই বড় অসহায় হয়ে পড়েছে। এ সময়ের ফুলটা তারা মূলত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এই তিনটি দিবস উপলক্ষে তারা চাষ করে থাকে। 

 

তাদেরকে যে আমরা সাহায্য করব এখানে স্বল্প টাকা দিয়েতো তারা ব্যবসার ক্ষতি পোষাতে পারবে না। তিন বারের ধাক্কা সামলাতে না পেরে কেউ অটো চালাচ্ছে কেউ রিকশা চালাচ্ছে অর্থাৎ তারা তাদের পেশা পরিবর্তন করছে। তবে করোনার সমস্যা ঠিক হওয়ার পর আমরা সবাই বসে সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে তাদের কি ধরণের সহযোগিতা করা যায় সে বিষয়টা দেখব। তিনি বলেন, এবারের প্রবল বৃষ্টিতে শুধু ফুল চাষীরাই না, বিভিন্ন  সবজি চাষীরাও প্রবল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাই আমি উপজেলা চেয়ারম্যান এমএ রশীদ ও বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে বসে এমনকি এমপি সেলিম ওসমান সাহেবের সাথে পরামর্শ করে বড় ধরণের সহযোগিতা করার জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিব। কৃষি চাষের জন্য পর্যালোচনাসহ কৃষকদের উদ্ভুদ্ব করার জন্য এবং কোথায় কি সমস্যা আছে এসব নিয়ে আমরা গত কয়েকদিন আগে বসেছিলাম।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন