হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দার মোগলদের নিদর্শন
# এগুলো রক্ষায় কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি : রুমন রেজা
# সংরক্ষণের অভাবে এই জায়গাগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে : শরীফ উদ্দিন সবুজ
ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের বদৌলতে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর কথা প্রায় সবারই জানা হয়ে গেছে। যাকে অনেকে শয়তানের ত্রিভূজও বলে থাকে। এটি মূলত আটলান্টিক মহাসাগরের ত্রিভূজ আকৃতির একটি জায়গা। ত্রিভূজ আকারের যেই জায়গাটিকে ঘিরে আকাশ ও পানি পথের যাত্রিদের এক ধরণের ভীতির সৃষ্টি হয়ে ছিল। যদিও আধুনিক যুগের অনেকে সেই বিষয়টাকে অতিরঞ্জিত বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।
তবে সারা বিশে^ এখনও এই ত্রিভূজাকার জায়গার প্রতি ভীতিমূলক প্রতিক্রিয়া আছেন। তেমনি আমাদের এই বাংলাদেশের নৌপথেও একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য অনেকটা এমনই একটি এলাকা তৈরি করা হয়। যাকে বলা হয় ‘ট্রায়াঙ্গল ওয়াটার ফোর্ট’ বা ত্রিভূজাকৃতির জলদুর্গ। তবে এই ত্রিভূজ জলদুর্গ মানুষের দ্বারা নির্মিত এবং এটা শুধু মাত্র সন্দেহজনক ডাকাত বা জলদস্যুদের ভীতির জন্য।
এই ত্রিভূজ জলদুর্গগুলো মূলত ঢাকায় মোগল রাজধানী স্থাপনের পর নদীপথে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়। নদীপথে যাতায়াত করা শত্রুর ওপর নজর রাখতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীর কোল ঘেঁষে এগুলো স্থাপন করা হয় বলেই এই দুর্গকে জলদুর্গ বলে। এই ত্রিভূজ জলদুর্গের একটি নারায়ণগঞ্জের অদুরে মুন্সীগঞ্জ শহরের কাছে ইছামতি নদীর তীরে ইদ্রাকপুর অঞ্চলে।
অন্য দুটি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার কোল ঘেষে অবস্থিত। যা আজও নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস ও পুরাকীর্তির ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে অলংকার হিসেবে অবস্থান করছে শহর সংলগ্ন হাজীগঞ্জ ও বন্দরের সোনাকান্দায়। এগুলো মূলত জলদস্যুদের নৌকা যেন কামানের গোলায় ভীত হয়ে ফিরে যায় বা এখান থেকে সহজেই দস্যুদের নৌকায় আঘাত করা যায় সেভাবে তৈরি করা হয়।
ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, মোঘল শাসনামলের ১৬০০ থেকে ১৭০০ এর মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে যখন ঢাকাকে রাজধানী করার পর ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকাকে রক্ষা করার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন মোগল সুবেদারগণ। সে সময় পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের ক্রমাগত আক্রমণে এখানকার লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
এরা সমুদ্র তীরাঞ্চল থেকে ছিপ নৌকা নিয়ে মেঘনা নদী হয়ে ধলেশ্বরীর মোহনায় এসে একদিকে বুড়িগঙ্গায় করে অন্যদিকে ডানে ঘুরে শীতলক্ষ্যায় প্রবেশ করে উত্তরে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সময়ের ডেমরার কাছে চলে এসে আরও অগ্রসর হয়ে ঢাকায় আক্রমণ ও লুঠতরাজ চালাতো। তাই সুবাদার মীর জুমলা (মতান্তরও আছে) একটি পরিকল্পনা নিয়ে প্রকৌশলীদের সাথে পরামর্শ করে ঢাকাকে জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্ত রাখতে তিনধাপে প্রতিরক্ষা দুর্গ তৈরি করতে সিদ্ধান্ত নেন।
নদীর তীরে গড়ে তোলা এই প্রতিরক্ষা দুর্গ-ই জলদুর্গ নামে পরিচিত হয়। ইটের তৈরি বেশ প্রশস্ত দেয়ালের এই দুর্গ গুলোর প্রবেশ মুখে রয়েছে বিশাল তোরণ।
মোগল ত্রয়ী জলদুর্গের মধ্যে তৈরি দ্বিতীয় দুর্গটি হলো সোনাকান্দার দুর্গ। দুর্গটির পরিমাপ ৫৮ বাই ৮৬.৫৬ মিটার। দুর্গের উত্তর দিকে প্রবেশ তোরণ। এ ছাড়া দুর্গের চারকোণে রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকার বুরুজ। তিনটি দুর্গের মধ্যে সোনাকান্দা দুর্গটি আকারে বড়।
দুর্গের পশ্চিম দেয়ালের কাছাকাছি রয়েছে সিঁড়িযুক্ত খিলান পথসহ উঁচু বেদী। যেখানে পশ্চিমে নদীর দিকে মুখ করে কামান বসানো হতো। মোগল ত্রয়ী জলদুর্গের শেষটি হাজীগঞ্জ দুর্গ। অর্থপৎ তিন স্তর নিরাপত্তার এটি ছিল শেষ ধাপ। এটি নারায়ণগঞ্জ শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে। এই দুর্গের উত্তর দিকেও প্রবেশ তোরণ। তোরণের ভেতর ও বাইরের দিকে ক্রম উচ্চতা বিশিষ্ট সিঁড়ি পথ রয়েছে।
দুর্গটির দক্ষিণ বাহুর দিকে একটি বৃত্তাকার বুরুজ রয়েছে। এই বুরুজের সামনে স্থায়ীভাবে সাতটি ধাপ বিশিষ্ট উঁচু বেদী রয়েছে— বেদীর ওপর নদীর দিকে মুখ করে কামান বসানো থাকত। হাজীগঞ্জ দুর্গের বেষ্টনী প্রচীর ও প্রতিরক্ষা বুরুজে অনেক মার্লন নকশাযুক্ত ফোকর ছিল। এখানে বন্দুক রেখে গুলি ছোঁড়া হতো।
জলদুর্গগুলো শুধু ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবেই নয়, মোঘলদের বৈশিষ্ট ধারণ করে নারায়ণগঞ্জের অলংকার হিসেবে এখানকার ভাবমুুর্তিকে আরও উজ্জ্বল ও গৌরবান্বিত করেছে। তাই এগুলো রক্ষায় সরকার ও প্রশাসনসহ আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ কলেজ এর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রুমন রেজা বলেন, ‘নারায়ণঞ্জে পর্যটনের একটা সম্ভাবনা রয়েছে। এই স্থাপনাগুলোতে কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাই। জায়গাটি অপরাধীদের দখলে চলে যাওয়ায় এখানে বাইরের মানুষ আড্ডা দেয়। পর্যটকদের যাওয়ার মতো পরিবেশ ও নিরাপত্তা নাই। আমাদের ঐতিয্য রক্ষায় এগুলো সংরক্ষণ করা উচিৎ।
শীতলক্ষ্যার পশ্চিম ও পূর্ব পারে এই দুইটি দুর্গ সংরক্ষণের আমাদের অনেক দিনের দাবি, কিন্তু কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই দুইটি জায়গাকে কেন্দ্র করে এর আশেপাশের এলাকাগুলো নিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হোক। যেন, ভ্রমন পিপাসুদের পর্যটকদের দৃষ্টি পড়ে। তাহলে দেশী-বিদেশী অনেকে পর্যটকদের জন্যই নারায়ণগঞ্জে একটি পর্যটন এলাকার সম্ভাবনা আছে।’
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘পৃথিবীতে যতগুলো দুর্গ আছে সেগুলোর মধ্যে এগুলোর মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার আছে। আর ব্যাপারটা হলো এগুলো হলো জলদুর্গ। অর্থাৎ জল পদ পাহারা দেওয়ার জন্য এই দুর্গগুলো তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এগুলো এখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় আছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাইতেছি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এগুলোকে সংরক্ষণ করতে পারতেছে না।
তাই আমি মনে করি এগুলো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর আওতায় নিয়ে নেওয়া উচিৎ। ঢাকায় বসে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এটা তদারকি করতে পারছে না। উল্টো এখানকার বেশ কিছু জায়গা বেদখলে চলে যাচ্ছে। নাসিকের আওতায় আসলে এগুলো পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সহজ হবে এবং এখান থেকে একটা আয়েরও সম্ভাবনা হবে। দুর্গগুলোর পারে যেহেতু নদী আছে, কিছু দর্শনীয় জায়গা আছে তাই এগুলোকে কেন্দ্র করে সরকারের সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে তাই পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এগুলো বিশাল ভূমিকা রাখতে পারবে। অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে এই জায়গাগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে।’


