বিপর্যয় ঠেকাতে শীতলক্ষ্যাকে দূষণমুক্ত করতে হবে
লতিফ রানা
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৫:৩৫ পিএম
# অসহনীয় দুর্গন্ধে অতিষ্ট হয়ে অনেকেই বসতভিটা ছেড়েছেন
# বর্জ্যরে সিংহভাগই আসে কারখানা থেকে
# পানি শুষ্ক মৌসুমে আলকাতরার রঙ ধারণ করে
বিজ্ঞান, সভ্যতা ও যান্ত্রিক উন্নতির সাথে সাথে বেড়ে চলছে শিল্পের বিকাশ। আর এসকল উন্নতি ও বিকাশ যেমন মানুষের জন্য আশির্বাদ তেমনি তার সঠিক নিয়মে করতে না পারলে অভিশাপও হয়ে দাঁড়ায়। যার অন্যতম প্রমাণ নদী দূষণ এবং নারায়ণগঞ্জবাসী এখন তা হাড়ে হাড়ে টেরও পাচ্ছে। যেই শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার কারণে নারায়ণগঞ্জ আজ সারা বিশ্বে শিল্প নগরী এবং প্রাচ্যের ড্যান্ডি খেতাবে ভূষিত হয়েছে। যেই শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ভর করে আজ নারায়ণগঞ্জের এই সম্মান।
সেই শিল্প-কারখানার অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের প্রাণ এই শীতলক্ষ্যা নদী। আমাদের লোভ, অসচেতনতা, এবং অনিচ্ছার মাশুল দিচ্ছে এই শীতলক্ষ্যা। শিল্প কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য এই নদীতে নিষ্কাশনের মাধ্যমে নদীর পানি এখন আর কল্যাণে ব্যবহার করা তো হচ্ছেই না, বরং এই শীতলক্ষ্যার পানি এখন ক্রমেই অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। ইতিহাস, ঐতিয্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বেষ্টিত নারায়ণগঞ্জকে দূষিত করছে এই শীতলক্ষ্যার পানি। যেসব বর্জ্যকে এই দূষণের জন্য দায়ী করা হয় তার তার সিংহভাগই আসে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে তরল আকারে। যা একটু স্বদিচ্ছা থাকলেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
একসময় বাপ-চাচাদের মুখে শুনতাম কেউ কোন ধরণের পীড়াগ্রস্ত (অসুস্থ) হলে তাকে বলতো ‘যা, লক্ষ্যায় (শীতলক্ষ্যা) গিয়ে ডুব দিয়ে আয়, তাহলে সব রোগবালাই দুর হয়ে যাবে।’ আর এখন এমন একটি অবস্থার তৈরি হয়েছে যে, কোন সুস্থ লোককেও যদি বলা হয় শীতলক্ষ্যায় ডুব দেওয়ার জন্য তাহলেই তার মানসিক পীড়া শুরু হয়ে যাবে। আর এর কারণ হলো শীতলক্ষ্যার করুণ অবস্থা। সেই টলমলে পানির উপর পাল তোলা নৌকার ঢেউয়ে ভেসে বেড়াতে এখন আর কাউকে তাই দেখা সম্ভব হয় না।
সাতার কেটে নদী পার হওয়া, বিশেষ করে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে নদীতে সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন আর হয় না। গ্রাম্য নারীদের ঘোমটা পড়ে পানিতে ডুব দেওয়া কিংবা কিশোর ও যুবকদের পানিতে লাফালাফি খেলার দৃশ্য আর দেখা যায় না। এই পানি খাওয়া বা পানিতে গোসল করা তো দুরের কথা এখন কেউ এই পানিতে হাত দিতে এমনকি ইচ্ছে করে পানির কাছেও যেতে চায় না।
যারা বাধ্য হয়ে নৌকা দিয়ে নদী পারাপার হন, তারাও নাকে মুখে রুমাল বা হাত চেঁপে ধরেন পানির দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য। অথচ এক সময় এই নদীর পানিই গোসল থেকে শুরু করে বাসা বাড়ির সকল ধোয়া মোছার কাজ এমনকি খাওয়ার কাজেও এই নদীর পানি ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ শীতলক্ষ্যা সংলগ্ন এলাকার মানুষের প্রায় ৯৫ ভাগ পানিই এখান থেকে ব্যবহার করা হতো। এখন কারখানার দূষিত বর্জ্যে শীতলক্ষ্যার পানি শুষ্ক মৌসুমে আলকাতরার রঙ ধারণ করে। আর কেমিক্যালের ফলে নদীতে এখন আর কোনো জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদের অস্তিত্ব নেই। অসহনীয় দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র বাসস্থান গড়ছেন।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের শহর ও শহর সংলগ্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনসহ শীতলক্ষ্যার আশে পাশের বসবাসকারীদের এক বৃহত্তর অংশই গভীর নলকুপের পানি ব্যবহার করছে। অথচ আমরা জানি এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া আমাদের সবুজ শ্যামল এই পৃথিবীতে যে পরিমান পানি আছে তার মাত্র শতকরা ২.৫ ভাগ মিঠা পানি। অর্থাৎ ব্যবহারের উপযোগী।
আর এই পানির মধ্যে রয়েছে খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানিসহ আরো বিভিন্ন মাধ্যমে। এরমধ্যে আমরা যেসব উপাদান থেকে এসব পানি সংগ্রহ করতে পারি তারও আংশিক ভাগ আমরা বাসা বাড়িতে ব্যবহারের জন্য পাই। এছাড়াও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানায় ও প্রচুর পানির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এরপর যদি এসব পানির উৎসগুলো আমরা দূষিত করে ফেলি তাহলে এমন এক সময় আসবে যখন খাবার জন্যও পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। অবশ্য তার কিছু কিছু আলামত এখনই শুরু হয়ে গেছে।
আমরা শীতলক্ষ্যা সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার মধ্যে এখনই পানির জন্য হাহাকারের চিত্র লক্ষ্য করছি। আর এ জন্য নগর মাতা খ্যাত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এর মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী ও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দোর গোড়ায় নদীর পানি দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। এখানকার সচেতন মহল দীর্ঘদিন যাবত প্রয়োজনীয় শিল্পকারখানাগুলোতে ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বসানো বাধ্যতামূলকসহ এবং তার ব্যবহারে প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারী করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
সচেতন মহলের মতে, পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় এবং পানির স্বল্পতা এ দুটি বিষয় মাথায় রেখে পানিকে পরিশোধন করার কোন বিকল্প নেই। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পানিকে দূষণমুক্ত করে সেই পানিকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলার এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সকলকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বলে তারা মনে করেন। বর্তমানে একদিকে পানির চাহিদা বাড়ছে অন্যদিকে তার সাথে পাল্লা দিয়ে এর যোগান ততই কমছে বলে জানান তারা।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজারের মতো শিল্প-কারখানা আছে যার প্রায় সাড়ে ৪ শতই গড়ে উঠেছে শীতলক্ষ্যা নদী ঘিরে। এর মধ্যে শতাধিক প্রতিষ্ঠানেই নেই কোন ইটিপি। এরা নদীর বুকে সরাসরি বর্জ্য ফেলছে। যেসব কারখানায় ইটিপি আছে বাস্তবে তারাও সবাই নিয়মিত এর ব্যবহার করছে না।
তাদের অনেকেই আবার রাতে আধারে গোপনে সরাসরি বর্জ্য নদীতে ফেলছে বলেও সচেতন মহলের কাছ থেকে এর আগে একাধিকবার অভিযোগ এসেছে। তাই শীতলক্ষ্যা নদীর পানিকে দূষণ মুক্ত করতে হলে মোবাইল কোর্টের পরিধি বাড়ানোসহ বিআইডবিউটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং শিল্প ও নৌ মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল।
এর সাথে সাথে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষকেও সচেতন হতে হবে। এখানে কল-কারখানার বর্জ্য ছাড়াও শীতলক্ষ্যা তীরের অনেক এলাকায় ডাস্টবিন না থাকায় বাসা এবং মার্কেটের ময়লার স্তুপ সড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়। সেই ময়লা বৃষ্টির পানিতে কিংবা বিভিন্ন কারণে আবার সেই শীতলক্ষ্যায় গিয়েই পড়ে।


