নারায়ণগঞ্জ জেলাটি ৫ নদীর তীর বেষ্টিত জুরে অবস্থিত। তার মাঝে প্রায় সাতশ’ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ নগরী শীতলক্ষা ও ধলেশ্বরী তীরে বেষ্টিত অবস্থিত শহরের মূল অংশ। যদিও নারায়ণগঞ্জ জেলার জন্ম ও নাম করণ হয় ৩৮ বছর যাবৎ। এর আগে প্রায় সাতশ বছর পূর্বে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজধানী সোনারগাঁকে সকলে চিনতেন।
ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, যাকে সুলতানই বাংগাল’ বলা হতো। তিনিই সর্বপ্রথম ‘বাংলা ভাষা’কে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন, ১৩৩৮ সনে। পরবর্তিতে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১৬০৮ সালে ঢাকায় রাজধানী স্থাপিত হলে বিশ্বব্যাপী এ নগরীর মর্যাদা ও গুরুত্ব বেড়ে যায়। তার পার্শবর্তি এলাকা হিসেবে নারায়ণগঞ্জের যশ খ্যাতি রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে একটি বিখ্যাত নদী বন্দর গড়ে উঠে। শত শত বছরের পুরানো এই নদী বন্দরটি একসময় দেশের প্রধান নদী বন্দর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই নারায়ণগঞ্জকে ১৮৮২ সালে মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬৮৩.১৪ বর্গ কি.মি আয়তনের এই নারায়ণগঞ্জকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে ২০১১ সালের ৫ মে নারায়ণগঞ্জ সদরকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হয়। নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরটি বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী বন্দর। এদিকে পুরনো এই শহরটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। কিন্তু এই নগরীর ক্রমবিবর্তনের চাহিদার আলোকে নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি। মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণেই নারায়ণগঞ্জ মহানগরী অপরিকল্পিত ও জনদুর্ভোগের নগরী হিসেবে রয়ে গেছে। তার মাঝে এখানে উত্তর দক্ষিন বলয়ে রানৈতিক ভাবে বিভক্ত রয়েছে।
দক্ষিন বলয়ে আছেন ওসমান অনুসারীরা আর উত্তর বলয়ে আছেন আইভী অনুসারিরা। তাদের দুই বলয়ের চাপা চাপিতে বেকায়দায় আছে নগরবাসি। নাগরিক সুবিধা খুবই অপ্রতুল ও নিম্নমানের। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সময়োপযোগী ও গতিশীল প্রশাসন এবং দক্ষ জনবল অপরিহার্য। উন্নত বিশ্বের নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নারায়ণগঞ্জ শহরকে সর্বাধুনিক নগরীতে রূপান্তরিত করাও জরুরি।
এজন্য বড় প্রয়োজন নগর প্রশাসনের ‘সদিচ্ছা’। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে অপরিকল্পিত গড়ে ওঠা শহরটি জনঘনত্বের মাত্রা ছাড়িয়েছে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে। যানজট, জলজট, মশার উপদ্রবসহ নানা সংকটে নগরবাসীর জীবন রীতিমতো বিপর্যস্ত। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও মারাত্মক নেতিবাচক। নগরীতে হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। আশঙ্কাজনক বেড়েছে রাজনৈতিক হানাহানি। আধুনিকতার নামে মাদকে ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ।
সরকার ও নগর প্রশাসন মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিতে পারছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিভেদ ও নেতিবাচক রাজনীতি পরিহার করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বাহির থেকে আসা ঘনবসতি নারায়ণগঞ্জ শহরকে সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করা খুবই প্রয়োজন। পঞ্চায়েত বা পাড়া সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।
নগরবাসী থেকে অভিযোগ উঠে, বর্ষা মওসুমে জলাবদ্ধতা নগরীর অন্যতম সমস্যা। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও রাজউকের নকশাবহির্ভূত ইমারত নির্মাণ, রাজউকের দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা ও অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার কারণেই নগরীর জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অপরিকল্পিত ও নকশাবহির্ভূত ইমারত নির্মাণ বন্ধ, নগরায়ণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। কৌশলগত গণপরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জ শহরের এখন সবেচেয়ে বড় সমস্যা যানজট সমস্যা। শহরের মধ্যে চলাচলকারী যানবাহনের কারনে এই যানজট সমস্যা তৈরী হচ্ছে। এর থেকে উত্তরনের জন্য প্রয়োজন শহরের ১ নম্বর বাস টার্মিনাল এবং রেলষ্টেন সরিয়ে নেয়া এখন সময় উপযোগি হয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। এছাড়াও বভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহরের কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তে প্রান্তে গড়েতুলতে হবে।
যানজট মুক্ত করে একটি বসবাসযোগ্য ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মহানগরী গড়ে তুলতে হলে এসব সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান লাগবে। নগর পরিকল্পনাবিদ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পাশাপাশি হাঁটা-চলার উপযোগী ফুটপাত নির্মাণ এবং মানসম্পন্ন গণপরিবহণ চলাচলের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বায়ু ও শব্দ দূষণ শহরেরঅন্যতম মৌলিক সমস্যা।
এই সমস্যাগুলো নাগরিক জীবনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনুপযোগী যানবাহনের কালো ধোঁয়া, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির অভাব, নগরীর অভ্যন্তরে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অপসারণে অব্যবস্থাপনা, সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা ও সেবার নিম্নমান থেকেও বায়ুদূষণ হয়ে থাকে।
এই বিব্রতকর অবস্থা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বায়ুদূষণ রোধে মানহীন যানবাহন প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। নগরবাসীর এ ভোগান্তি লাঘবে সকল সেবা সংস্থার সংযোগলাইন এক জায়গায় আনতে সাহসী পদক্ষেপ দরকার। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আর রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য নগর প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ও আইনের অপপ্রয়োগে সহজেই সমাজের যুবসমাজ মাদকসেবনে লিপ্ত। মাদকের এই ভয়াবহ ছোবল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন ও আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা জরুরি। ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ নানাবিধ জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে মাদকমুক্ত সুস্থ্য সমাজ গঠনে সর্বস্তরের সচেতন নগরবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে।


