# সৌদির কাজের প্রসেসিং ও করোনার কারণে বেশি সময় লেগেছে : প্রকল্প পরিচালক
# দুই পাশের সংযোগ সড়ক ও টোলপ্লাজার কাজ বাকি আছে : প্রকৌশলী শাহিন
এ বছরের জুনেই উদ্বোধন হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সেতুর প্রকল্প পরিচালক শোয়েব আহমেদ। এরই মধ্যে সেতুর ৯০ শতাংশেরও বেশি কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজ চলছে। এর আগে ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) পদ্মা সেতু ও তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প অনুমোদন দেয়।
২০১৩ সালের মধ্যে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। এর মধ্যে খরস্রোতা পদ্মার ওপর শেষ হওয়ার পথে সোয়া ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর নির্মাণকাজ। কিন্তু ছোট এই শীতলক্ষ্যা নদীর অনুকূল পরিবেশ থাকার পরও মাত্র ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় হতাশ হয়েছেন নারায়ণগঞ্জবাসি।
তখন এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এসএফডি ৩১২ কোটি টাকা ঋণ এবং সরকারের ৬৫ কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা। পরের বছর সংস্থাটির সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে সেতুর কাজ শেষ করতে না পারায় ৩৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প বিভিন্ন মেয়াদে বেড়ে এখন সাড়ে ৬শত কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বাড়তি টাকাটা বাংলদেশ সরকারের তহবিল থেকে খরচ করতে হবে।
প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করে ও বিভিন্ন নথিপত্র সূত্র জানা গেছে, প্রকল্পটির পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ দিতেই প্রায় সাত বছর (২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত) কেটে যায়। এরপর ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে সেতুটি নির্মাণের চুক্তি হয়। তখন নির্মাণ ব্যায় বাড়িয়ে ধরা হয়েছিল ৫শত ৯৯কোটি ২৭ লাখ টাকা। যা ২০২০ সালে নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল। পরে তা বাড়িয়ে ২০২২সাল পর্যন্ত করা হয়। যার সর্বশেষ হিসেব মতে নির্মাণ ব্যায় প্রায় সাড়ে ৬শত কোটি টাকা।
সেতুটিতে গাড়ি চলাচলের জন্য ৬টি লেন ছাড়াও দুই পাশে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য ফুটপাত থাকবে বলে জানাগেছে। ১২৯০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২২ মিটার প্রস্থ এই সেতুটিতে মোট ৩৮টি খুঁটি ব্যবহার করা হয়েছে। এরমধ্যে মূল সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪০০মিটার। যা চারটি শক্তিশালী খুঁটির উপর দাঁড়িয়েছে। দুই প্রান্তের ভয়াডাক্টের খুঁটির সংখ্যা ৩৪। সেতুটি নির্মাণে ৩৮টি স্পেন ব্যবহার করা হয়েছে। যেগুলো প্রকল্প এলাকায় তৈরি করে ক্রেনের মাধ্যমে বসিয়ে দেয়া হয়েছে।
এই সেতুটি ঢাকা-চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা-সিলেট এর যোগাযোগেও কোন ভূমিকা রাখতে না পারলেও আমুল পরিবর্তন ঘটবে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে উত্তর, উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বাংশের যোগাযোগে। বিশেষ করে ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, খুলনা, যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলা গুলোর সাথে বাইপাস সড়ক হয়ে উত্তরাঞ্চলের জেলা গুলোর সাথে সাথে ব্যপকহারে উন্নয়ন ঘটবে নরসিংদী, ভৈরব, হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনীসহ চট্টগ্রাম এলাকার জেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার।
অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর-মদনপুর হয়ে যেসব যানবাহনগুলো যাতায়াত করে সেসব যানবাহনের পরিবহন দুরত্ব কমে যাবে প্রায় ৯ কিলোমিটারের মতো। আর এর ফলে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি-পাগলা ও ঢাকার যাত্রাবাড়ির যানজট অনেকটাই উপশম হবে।
শহরের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত উড়াল সেতু নির্মিত হলে তা এই সেতুটির সৈয়দপুরের প্রান্ত যোগ করা হবে। তবে বন্দরবাসীদের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, ৬ লেনের এই সেতুটি শহর ও বন্দরের একপ্রান্তে হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ শহরের সাথে বন্দরবাসীর যোগাযোগে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। তবে প্রভাব পড়বে এসব এলাকার শিল্প ও বাণিজ্যে।
তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ কাজের নিয়োজিত প্রকৌশলী শাহিন আলম জানান, সেতু নির্মাণের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু দুই পাশের সংযোগ সড়ক ও টোলপ্লাজার কাজ বাকি আছে। এই প্রকল্পটির সর্বশেষ নির্মাণ ব্যায় গিয়ে ৬৪৯ কোটিতে গিয়ে পৌছেছে। প্রকল্পের ব্যায়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ টাকা সৌদিয়ান সংস্থাটি দিচ্ছে। বাকি টাকার জোগান দিতে হবে বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে।
সেতুটি নির্মাণে এখানে প্রায় চায়না ও বাংলাদেশের প্রায় একশত বিশ জনের মত শ্রমিক করেছে। তিনি জানান, সৌদি থেকে টাকা ছাড়তে দেরিসহ চায়নার সাথে কমিউনিকেশন করতে বেশ সময় নষ্ট হয়ে যায়। তারপর আবার করোনা মহামারির কারণে চীন থেকে টিম আসতে দেরি হলে আরও সময় নষ্ট হয়ে যায়। যারফলে ২০২০ সালে সেতুটির কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক শোয়েব আহমেদ জানান, আমাদের কাজ প্রায় শেষের পথে। এখন শুধু সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কের কাজ বাকি আছে। সেখানে বালু ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজও দ্রুত শেষ করা হবে। শতকরা প্রায় ৮৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা আশা করি এ বছরে জুন মাসেই এই সেতুর উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, সৌদির উন্নয়ন তহবিল তো আমাদের দেশে এধরণের কাজ আগে করেনি। তাই তাদের কাজের প্রসেসিং করতে একটু সময় লেগেছে। এতে করে প্রায় ১ বছরের মতো নষ্ট হয়েছে। তাছাড়া আমাদের এই পজেক্টটির কাজ করছে চাইনিজরা। সেতুর মাঝ অংশটির কাজ করার জন্য ২০২০ এর জানুয়ারিতে চায়নার একটি বিশেষ টিম আসার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৯ এর ডিসেম্বরে চায়নায় করোনা হানা দেওয়ার কারণে প্রায় নয় মাস তারা আসতে পারেনি। তাই এখানে একটি ভাল সময় নষ্ট হয়।


