# পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অসহিষ্ণুতা প্রকট আকার ধারণ করেছে
# তুচ্ছ কারণেও ঘটছে বড় সহিসংতা, বেড়েছে প্রাণহানি
মায়ের গর্ভে ছিলো ৮ মাসের সন্তান। যে শিশুটি এখনো পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেনি। সুন্দর পৃথিবীতে তারও বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু না। নৃশংসভাবে মা রাবেয়াকে খুন হতে হয়। আর এ কারনে মায়ের গর্ভের অনাগত সন্তানকে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে। গত সোমবার দিবাগত রাতের কোন এক সময় তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়,কিছুদিন আগে ফতুল্লার শাসনগাঁও এলাকায় স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হতে হয় গৃহবধূ মমতাজ বেগমকে। স্বামীকে জমি লিখে না দেয়ার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে নিহতের ভাই তার মামলায় উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ডাল পট্রি এলাকায় মঙ্গলবার দিনে দুপুরে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকার জন্য মা ও মেয়েকে খুন করা হয়।
এসময় ঋতু ৭ মাসের অন্তঃস্বত্বা ছিলো। অপরদিকে গত ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে ফতুল্লার মুসলিমনগরে বড় ভাই ছোট ভাই বলাকে কেন্দ্র করে খুন হয় রবিন নামের এক যুবক। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও। এসমস্ত ঘটনায় জেলা জুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। মানুষের মধ্যে থেকে দয়া,মায়া কমে মানুষ এখন আগ্রাসী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়ে উঠেছ। সচেতন মহল মনে করেন, মানুষ হতাশা ও লোভের বশবর্তী হয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে আত্মহত্যার প্রবনতাও বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে।
হঠাৎ করেই নারায়ণগঞ্জে বেড়েছে হত্যাকাণ্ড। ঘটছে লোমহর্ষক ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও। তবে হত্যাকাণ্ডগুলোর রহস্য উদঘাটনে গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্তরা কেউ হতাশা আবার কেউ লোভের বশবর্তী হয়ে আবার কেউবা পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়ে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার শহরের ডালপট্টির একটি ফ্ল্যাটে নৃশংসভাবে খুন করা হয় মা ও মেয়েকে।
জোবায়ের ওরফে জুবায়েদ নামের এক যুবক ওই ফ্ল্যাটে জোর করে প্রবেশ করে ঐ হত্যাকান্ডটি সংঘঠিত করেন। জুবায়েরের সাথে নিহতদের কোনো সম্পর্ক বা পূর্ব পরিচিতও ছিলেন না। হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন মা রুমা চক্রবর্তী (৪৬) এবং মেয়ে ঋতু চক্রবর্তী (২২)। ঋতু চক্রবর্তী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন
নিহত রুমার স্বামীর রামপ্রসাদের দাবী,তিনি বা তার পরিবারের সাথে ঘাতক জুবায়েরের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। তার ঘরে ঘরে মা,মেয়ে ও ছেলের বউ ছিল। দুপুরে তিনি যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন সে বাড়ির সামনে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বাড়ির সামনে যান। এসময় বাড়ির গেটের তালা লাগিয়ে দিয়েছিলো ঘাতক নিজেই।
এরপর তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করেন। প্রথমবার তার স্ত্রী ফোন ধরেনি। পরে এক পুরুষ তার স্ত্রীর ফোনটি ধরে। এরপর স্বর্ণালংকার ও টাকাপয়সা কোথায় কী আছে ঐ ব্যাক্তি মোবাইলে জানতে চান। তবে এর আগেই তার স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যা করেছিলো খুনি। কৌশলে রুম থেকে পালিয়ে বেঁেচ গেছে তার পুত্র বধু শীলা। তাকেও হত্যা করার জন্য খুনি ঘর থেকে সিড়ি পর্যন্ত নেমেছিলো। মা, মেয়ে এবং অনাগত একটি শিশুসহ ৩টি তাজা প্রাণ ঝড়ে গেছে ঘাতকের নির্মম হত্যাকান্ডে।
অপরদিকে ফতুল্লায় ৪ সন্তানের জননী ৭মাসের গর্ভবতী রাবেয়া তার নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হয়েছে সোমবার ভোর রাতে। এ ঘটনায় পুলিশ নিহতের স্বামী অপু ও মান্নান নামের একজনবে আটক করে রিমান্ডে এনেছে। তবে হত্যাকান্ডের মূল রহস্য এখনো উদাঘাটিত হয়নি।
গত ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে ফতুল্লার শাসনগাঁও এলাকায় স্ত্রী মমতাজ বেগমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে স্বামী আতাউর। দীর্ঘ ১৫/১৬ বছরের সাংসারিক জীবনে স্ত্রী মমতাজ স্বামীর সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য স্বামীকে ব্যববসা করার জন্য বিসিকের পাশে দুটি জুতার দোকান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আতাউর তার স্ত্রীর কাছে আরো টাকা চেয়েছিলেন।
এক পর্যায়ে স্ত্রীর নামের জমি তার নামে লিখে দিতে চাপ প্রয়োগ করা শুরু করে। কিন্তু মমতাজ তার স্বামীকে জমি লিখে দিতে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। আর এটিই হয়েছিলো তার জন্য কাল। ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে স্ত্রী মমতাজকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সেই লাশ সেপটি ট্যাংকের ভিতরে ফেলে দিতে চেয়েছিলো পাষন্ড স্বামী। সকালে বাড়ির ভাড়টিয়ারা মমতাজের দেহটি সেপটি ট্যাংকের ভিতরে অর্ধেক ঢুকানো অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ আতাউরকে আটক করে।
২১ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যার দিকে ফতুল্লার মুসলিমনগরে রবিন নামের ১৭ বছরের একজন কিশোরকে বড় ভাই ছোট বলাকে কেন্দ্র করে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। তবে এর আগে রবিনকে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। আধিপত্য বিস্তার করাকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে বলেও দাবী করেছেন নিহতের পরিবার। নিহত রবিন ফতুল্লা থানার মুসলিমনগর এলাকার ঈমান হোসেনের ছেলে। এ ঘটনায় দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ভোর ছয়টার দিকে পোস্ট অফিস রোডস্থ এশিয়ান কক্স টায়ার মিলসের ৫ নং গেইটের সামনের রাস্তায় হাজী জালাল আহম্মেদ স্পিনিং মিলের শ্রমিক মুন্নাকে (১৬) ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত জখম করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা।
এ ঘটনার সাথে জড়িত নাহিদুল ইসলাম ওরফে কামরুল হাসানকে পুলিশ গ্রেফতার করেছেন। পরে তাকে উদ্ধার করে শহরের জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মুন্না কে মৃত ঘোষণা করে। এ ঘটনায় নিহতের মা শাহিদা বেগম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। তবে কি কারনে এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তা এখনো জানা যায়নি।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরদিন বিকেল পর্যন্ত ফতুল্লায় ৪টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শাসনগাঁস্থ তাজুল ইসলামের ভাড়াটিয়া বাসা থেকে নিজ ঘরের আড়ার সাথে নিহত ফিরোজের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপরদিকে রাত সাড়ে বারোটায় সংবাদ পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ শাসনগাঁ হাসান মাতাব্বুরের ভাড়াটিয়া বাসা থেকে গার্মেন্টস শ্রমিক আঞ্জুমানের (১৯) এর গলায় ফাঁস লাগানো ঝুলন্ত মৃত দেহ উদ্ধার করে।
এছাড়াও একই দিন রাত এগারোটার দিকে পুলিশ কাশিপুর বাংলা বাজার এলাকা থেকে লুৎফর রহমানের ভাড়াটিয়া বাসা থেকে রাসেল ঢালী (৩৪) ও ভুইগড় গিরিধারা আলামীন টাওয়ারের অস্টম তলার নিজ কক্ষ থেকে মেহেরাজ ইসলাম শাওন (১৭) নামক এক মাদ্রাসা ছাত্রের গলায় ফাঁস লাগানো ঝুলন্ত মৃত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
২০২১ সালের ২৬ মে ফতুল্লার পূর্ব লামাপাড়া এলাকায় স্ত্রী তানজিদা আক্তার পপিকে হাত পা বেঁধে জবাই করে হত্যা করে স্বামী হীরা চৌধূরী। স্ত্রীর অপরাধ ছিলো স্বামীকে সময় না দেয়া। নিহত পপির পরিবারের দাবীছিলো,তেরো বৎসর পূর্বে উভয় পরিবারের পারিবারিক সম্মতিক্রমে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে শ্বশুড় বাড়ীর লোকজন নানা অজুহাতে বিভিন্ন সময় টাকা দাবী করে আসছিলো।
মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে সব সময় চাহিদা পুরনের চেস্টা করতো। জমি বিক্রি করেও মেয়ের সুখের জন্য চাহিদা পুরন করেছেন বলে জানান তিনি। সর্বশেষ হত্যাকান্ডের আগের দিন দুপুরেও তার মেয়র শ্বশুড় বাড়ীতে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এরপরেও স্বামীর হাত থেকে বাঁতে পারেনি পপি। এ ঘটনায় পুলিশ হীরাকে আটক করেছিলো।
উদ্ধার করেছিলো হত্যাকাপন্ডে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রও। নিহত গৃহবধূ তানজিদা আক্তার পপি ফতুল্লার বক্তাবলীর রাজাপুরের মৃত আলী আশরাফের মেয়ে। তাদের ঘরে তুষাত (১০)ও তোয়াফ (৬) নামে দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে।
চাষাঢ়ার রেল স্টেশন এলাকায় একটি ক্লাব রয়েছে। ক্লাবটি পরিচালনা করতেন মানিক ও শামীম নামের দুইজন ব্যাক্তি। অপরদিকে সেই ক্লাবে আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিলো ইসদাইর বুড়ির দোকান এলাকার জুয়েল ও সোহাগ গ্রুপ। ২৯ জুন রাতে রাতে উভয় পক্ষের লোকজন একে অন্যের উপর হামলা চালায়। এতে রাজমিস্ত্রী রুবেল (৩২) নামে এক যুবক নিহত হয়। আহত হয়েছিলো বেশ কয়েকজন।
অপরদিকে উল্লেখিথ ঘটনার মাত্র ৬ ঘন্টার ব্যবধানে ভোরবেলা ইসদাইরস্থ ওসমানী স্টেডিয়ামের পাশে শুকতারা ক্লাব গলির সামনের রাস্তায় যাত্রীবেশে দুর্বৃত্তরা একজন ইজি বাইক চালককে করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয়। নিহত চালক রাজা মিয়া (৫৫) মাসদাইর কাজীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। আবুল হাজীর বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করতেন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় চিরকুট লিখে গলায় ফাঁস লাগিয়ে সুবর্না নামের একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী সকালে মোগড়াপাড়া ইউনিয়নের ভাটিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। কাইকারটেক উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহতের স্বজনরা জানায়, একই গ্রামের আবুল কালামের ছেলে ইমন দীর্ঘ ৫ বছর যাবত সম্পর্ক স্থাপন করে। এ বিষয়ে সুবর্ণার পরিবার ইমনকে বিয়ের চাপ সৃষ্টি করলে সে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় আজ সকালে বিষপান করে সুবর্ণা আত্মহত্যা করে। বিষপানের আগে তার মৃত্যুর জন্য ইমনকে দায়ী করে ৪ পাতায় একটি চিরকুট লিখে যায়।
বিশ্লেষকদের দাবী, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই পরকীয়া সম্পর্কিত। এছাড়াও আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে । ভারতীয় টিভির সিরিয়াল দেখে দেখে যুবকরা এলাকায় এলাকায় গড়ে তুলেছেন কিশোর গ্যাং। অনেকে গ্যাং স্টার হতে গিয়ে করছেন খুন।
তবে স্বামীর হাতে স্ত্রী যেভাবে হত্যা হচ্ছে এগুলো রোধ করতে হলে,বাড়ির মানুষদেরকেই ঘরের অন্য সদস্যদের আচার আচরণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরী মনে করছেন অনেকে।
অপরদিকে মোটিভেশনের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা থেকেও মুক্তি পেতে পারে সমাজ ও পরিবার। এছাড়াও অপরাধ প্রবণ এলাকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরো জোড়ালো টহলে অপরাধ প্রবনথা বাড়বে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।


