# প্রায়শই ঘটছে দুর্ঘটনা, হচ্ছে জানমালের ক্ষতি
# কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের কোন উদ্যোগ নেই
একের পর এক শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘটছে নৌকা ডুবির ঘটনা। ঘটনার পর পরই গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। বাল্ক হেড চলাচলে বিধি নিষেধও জারি করা হয়েছে অরেনক আগে।কিন্তু এর বাস্তবায়ন আলোর মুখ কখনোই দেখেনি। শীতলক্ষা নদীতে বাল্কহেডগুলো চলাচলে নিয়ন্ত্রণে বিধি নিষেধ থাকলেও কেউ এর তোয়াক্কাও করে না।
বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে লোক দেখানো তদন্ত কমিটি করা হলেও এর বাস্তবায়নে নদী কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন অনেকে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীতেও বাল্কহেড ও যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোও তাদের খেয়াল খুশিমতো চলাচল করছে বলেও অভিযোগ বিস্তর। ফলে বাড়ছে একের পর এক নৌ দূর্ঘটনা। বাল্কহেড চলাচলে বিধি নিষেধ পালনে নৌ পুলিশের তৎপরতা থাকার কথা থাকলেও অদৃশ্য কারনে দ্রুত গতি সম্পন্ন নৌযানের ব্যাপারে উদাসীন থাকছেন বছরের পর বছর ধরে।
গতকালও শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি দ্রুতগতি সম্পন্ন বাল্কহেড যাত্রী বোঝাই দুটি নৌকাকে ধাক্কা দেয়। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ হানির আশংকা করছে অনেকে। তবে সর্বশেষ কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীতে একের পর এক দানবীয় বাল্কহেড ও লঞ্চের বেপরোয়া গতির কারনে অনেক মায়ের কোল খালি হচ্ছে। মূলত শীতলক্ষ্যা নদীতে রূপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গীর,পিতলগঞ্জ ও হাটাব ত্রিশকাহনিয়া এলাকায় বিভিন্ন আবাসন কোম্পানী রয়েছে।
ঐ সমস্ত আবাসন কোম্পানীর সাথে নৌ পুলিশের রয়েছে রহরম মহরম সম্পর্ক থাকার কারনে সন্ধ্যার পরেও, ৫’শ থেকে এক হাজার টাকা উৎকোচের বিনিময়ে বালুবাহী বাল্কহেডগুলো চলাচল করে। একইভাবে বালু নদীর ইছাপুরা, ছনি, কায়েতপাড়া ও ডেমরা এলাকারও কিছু বাল্কহেড শীতলক্ষ্যায় চলাচল করে উৎকোচের বিনিময়েই। এমন দাবী একাধিক সূত্রের।
২০০১৮ সালে ২৪ নভেম্বর রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় একটি নৌকার মধ্যে থাকা ঢাকার ধোলাইপাড় এলাকার লতিফ খান,শরীফ আহমেদ, তুষার আহমেদ, বাবু মিয়া ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাস্টমস কর্মকর্তা জাসিম নিহত হন। জানা গেছে, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর ডেমরা ঘাট থেকে ১৪ যুবক একটি নৌকা ভাড়া করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভ্রমণ করছিলেন।
রাত ৯টার দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর তারাব পৌরসভার দক্ষিণ রূপসী এলাকায় একটি বালুবাহী বাল্কহেড নৌকাটিকে ধাক্কা দিলে যাত্রীবাহী নৌকাটি নদীতে তলিয়ে যায়। এ সময় নৌকায় থাকা মাঝিসহ ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন সাঁতার কেটে নদীর তীরে উঠতে পারলেও বাকিরা পানিতে তলিয়ে যায়।
২০২১ সালের ৪ নভেম্বর দুপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর তারাবঘাটে বালুবাহী একটি বাল্কহেড একটি নৌকাকে ধাক্কা দিলে সৃষ্টি ও জোবেদা বেগম নামের দুইজন নারীর মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই ঘাতক বাল্কহেডটি পালিয়ে যায়।
২৩ ডিসেম্বর শীতলক্ষ্যার সোনাকান্দা কয়লাঘাট এলাকায় একটি অয়েল ট্যাংকারের ধাক্কায় এমডি মাটি নামের একটি দ্রুতগামী বালুবাহী বাল্কহেড ডুবির ঘটনা ঘটে। এমডি মাটি নামের একটি বালুবাহী বাল্কহেড ঘটনার দিন সকালে চাঁদপুর থেকে রূপগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। অন্যদিকে গোদনাইল থেকে এমটি শরিজা আলম-২ নামের একটি ওয়েল ট্যাংকার চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এ সময়ে তার ধাক্কায় এমডি মাটি নামের বাল্কহেডটি ডুবে যায়।
২০২১ সালের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে শীতলক্ষ্যার মদনগঞ্জ এলাকায় একটি কার্গো জাহাজ ‘সাবিত আল আসাদ' নামের একটি লঞ্চকে ধাক্কা দেয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চটির সঙ্গে,মদনগঞ্জ এলাকায় নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাছাকাছি এলাকায় এসকে-৩ নামের একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় ২৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিলো। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুছ ছাত্তার শেখ। এরই মধ্যে অনেক দূর্ঘটনা ঘটে গেছে শীতলক্ষ্যায়। যার বেশির ভাগই বালুবাহী বাল্কহেডের কারনে সংঘঠিত হয়েছে।
সর্বশেষ গতকাল বিকেলে সাড়ে ৫টায় শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দর সেন্ট্রাল খেয়াঘাটে বাল্কহেডের ধাক্কায় যাত্রীবাহী নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। বন্দর ঘাট থেকে দুটি নৌকা নারায়ণগঞ্জের পাড়ে আসছিল। এসময় শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝখানে এক সঙ্গে দুটি নৌকাকে ধাক্কা দেয় বাল্কহেডটি। এতে নৌকা ডুবে যায়। নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,সেই বেপরোয়া গতির বাল্কহেডটিসহ ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চালক ও লস্করও রয়েছে।
সূত্রের দাবী, শীতলক্ষ্যা ও এর আশপাশের নদীগুলোতে যে সমস্ত বাল্কহেড চলাচল করে সেই সমস্ত নাবিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। অপরদিকে নৌ পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়েই শীতলক্ষ্যায় সন্ধ্যার পরে কার্গো ও বাল্কহেড চলাচল করছে প্রতিনিয়ত।
এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আইন মানছে না কেউ। অভিযোগ রয়েছে মাত্র ৫০/১০০ টাকার বিনিময়ে নৌ পুলিশ বাল্কহেড ও কার্গো চলাচল করতে দিচ্ছে। ফলে একের পর এক ঘটছে দূর্ঘটনা। দূর্ঘটনার ঘটার পর পরই জেলা প্রশাসন থেকে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পরেই কার্গো ও বাল্কহেডের নাবিকরা পুরনো রুপেই চালিয়ে যায় তাদের কার্যক্রম।
সূত্র আরো জানায়,শীতলক্ষ্যায় নৌ ফাঁড়ির সদস্যরা রাতের বেলায় নির্ধারিত চাঁদা আদায় করে বাল্কহেড চলাচল অব্যাহত রেখেছেন। অভিযোগ রয়েছে পুলিশ বাঁধা দিলেই ৩শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পুলিশের হাতের গুঁজে দেয়।
আর এতেই সন্ধ্যার পর থেকে সারারাত শীতলক্ষ্যা নদীতে বাল্কহেড চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে বলেও অভিযোগ। এদিকে এ নদীতে চলাচলরত সাধারন নৌযানের মালিক পক্ষের দাবি প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে উভয় নদীতে বেপরোয়া বালিবাহী বাল্কহেডগুলো চলছে।
সূত্র জানায়, বালু নদীটি রাজধানীর ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনবার্সন এলাকা থেকে শুরু হয়ে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন ও রূপগঞ্জ সদর এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীতে মিলেছে।
নদীটির প্রসস্থতা কম থাকার পরও পূর্বাচল উপশহর ও এর আশপাশ এলাকায় আবাসন কোম্পানীর বালি বহনের কাজে এসব মালবাহী বাল্ডহেড ব্যবহার হচ্ছে। ফলে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়াও এসব নৌযান চলাচল অব্যাহত থাকায় প্রশাসন নির্বিকার।


