Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

ত্বকী হত্যার ৯ বছর, বিচার নেই

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২২, ০৯:০২ পিএম

ত্বকী হত্যার ৯ বছর, বিচার নেই
Swapno

# বাবার প্রতি ক্ষুব্দ হয়ে তাকে শায়েস্তা করতে ছেলেকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়

 

হত্যার কারণ স্পষ্ট, আসামিও চিহ্নিত। অভিযোগপত্রও প্রায় তৈরি। অল্প সময়ের মধ্যে আদালতে তা জমা পড়লেই শুরু হবে বিচারকার্য। তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) দেওয়া এমন আশ্বাসের বাণীতে আশ্বস্ত হয়েছিল ত্বকীর পরিবার ও শুভাকাঙ্খীরা। সে গুড়ে বালি। দীর্ঘ ৯ বছরে সেই অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেনি র‌্যাব, শুরু হয়নি বিচারও।

 

২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে শহরের শায়েস্তা খাঁ সড়কের বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। ওইদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন ত্বকীর বাবা। দুইদিন পর ৮ মার্চ সকালে শহরের পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যার শাখা খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। সেদিন রাতেই অজ্ঞাত আসামি করে সদর থানায় মামলা করা হয়।

 

পরে ১৮ মার্চ সাংসদ শামীম ওসমান, তাঁর ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙারু পারভেজ, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাতকে দায়ী করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে একটি অবগতিপত্র দেন রফিউর রাব্বি।

 

এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতারও করে র‌্যাব। এদের মধ্যে ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।


নিহত ত্বকী নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠক শিল্পী রফিউর রাব্বির বড় ছেলে। বাবা রফিউর রাব্বিকে শায়েস্তা করতেই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের এক বছরের মাথায় এমনটাই জানিয়েছিল তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব। সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে এবং বর্তমান সাংসদ আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের পরিকল্পনা, নির্দেশ ও সক্রিয় অংশগ্রহণে এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে বলেও জানায় র‌্যাব।


একটি খসড়া অভিযোগপত্র তৈরি করে তদন্তকারী সংস্থাটি। সেখানে হত্যার কারণ ও জড়িতদের বিষয় সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন রফিউর রাব্বি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন একেএম শামীম ওসমান।

 

এছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনের মালিকেরা ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। রফিউর রাব্বি এই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এসব কারণেই বাবার প্রতি ক্ষুব্দ হয়ে তাকে শায়েস্তা করতে ছেলেকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ত্বকী হত্যাকান্ডের প্রথম বর্ষপূর্তিতে র‌্যাবের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমে এসব তথ্য তুলে ধরেন।


ওই সময় র‌্যাব আরও জানায়, আজমেরী ওসমানের নির্দেশে এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সহযোগীদের নিয়ে ত্বকীকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ ফেলা হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। অচিরেই এই হত্যাকান্ডের অভিযোগপত্র দাখিল করার থাকলেও দীর্ঘ ৮ বছরেও তা সম্ভব হয়নি। এদিকে গ্রেফতার আসামিরাও জামিনে বেরিয়ে এসে এখন পলাতক। সর্বশেষ এই মামলায় কারাগারে থাকা সুলতান শওকত ভ্রমরও জামিন পেয়েছে।

 

সম্প্রতি ত্বকী হত্যাকান্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা নারায়ণগঞ্জের একটি পত্রিকা অফিসে হামলাও চালিয়েছে আজমেরী ওসমানের অনুসারীরা। ত্বকী হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ বলেন, মামলাটি এখন চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৪৩ তারিখ গেছে। একাধিকবার এই মামলার অভিযোগপত্র দ্রুত দাখিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

 

আদালতও এই বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থাকে একাধিকবার তাগিদ দিয়েছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা তা আমলে নেয়নি। এই মামলার পরবর্তী তারিখ রয়েছে ১৭ এপ্রিল। শুরুতে এই মামলা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা তদন্ত করলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব-১১। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বদলিজনিত কারণে বেশ কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন।

 

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউর রহমান বলেন, মামলা তদন্তাধীন অবস্থায় আছে। তবে কবে নাগাদ অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে সেই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।


ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি বলেন, ‘আর কী তদন্ত হবে? র‌্যাব তো তদন্ত শেষ করে সংবাদ সম্মেলনে কারা, কীভাবে ত্বকীকে হত্যা করেছে তা সবই জানিয়েছে। তারপর আর অভিযোগপত্র আদালতে দেয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবার এই হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত বলেই এর বিচার হচ্ছে না। সংসদে ওসমান পরিবারের পাশে থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের পর থেকেই সব বন্ধ।

 

এই বিচার শুরু করতে তাঁর নির্দেশ লাগবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ত্বকী হত্যার বিচার হবেই। এই সরকার থাকতে হোক কিংবা পরেই হোক। দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে।’ ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে দীর্ঘ ৯ বছর যাবৎ শহরে আলোকশিখা প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি পালন করছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। প্রতি মাসের ৮ তারিখ এই কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচি থেকে ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।


ত্বকী হত্যার ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় পাঁচদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। ৬ মার্চ সকাল সাড়ে আটটায় নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় সিরাজ শাহর আস্তানায় ত্বকীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও মিলাদ মাহফিল। পরদিন ৭ মার্চ বিকেল তিনটায় শহরের শেখ রাসেল পার্কে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিশু সমাবেশ, আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।

 

৮ মার্চ বিকাল সাড়ে পাঁচটায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাঁচ নম্বর ঘাটে (যেখানে ত্বকীর লাশ পাওয়া যায়) নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে ‘আলোর-ভাসান’র আয়োজন করা হয়েছে।

 

এরপর ১১ মার্চ বিকেল তিনটায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আয়োজনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ১৮ মার্চ বিকেল ৩টায় জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ৭ম জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন