# নৌ পুলিশকে কখনও দেখভালের দায়িত্ব পালন করতে দেখিনি : দিপু
# চাঁদা আদায়ে যতটা তৎপর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ততটা তৎপর না : সবুজ
# খনন করে দু একটা চ্যানেল বাড়ানো গেলে সমস্যা কমে যেত : নৌ ওসি
# নৌযানগুলো নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে : নৌ-পুলিশ সুপার
দেশের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম নদী শীতলক্ষ্যা এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের অবহেলা ও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব এবং মুনাফা লোভী কিছু বালু ব্যবসায়ীদের মাত্রাহীন লোভের কারণে এখানে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। যারফলে হরহামেশাই প্রাণ হারাতে হচ্ছে এখানকার নিরীহ যাত্রীদের। আর এসব দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একসাথে উভয়দিক থেকে ১৫ থেকে ২০টি বাল্কহেড নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করা এবং কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগিতায় নেমে গতির বাহাদুরি দেখানো।
অথচ এখান দিয়ে চলাচল করা এসব নৌযানগুলো জানে যে, শহরের অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা নারায়ণগঞ্জ বন্দর খেয়া ঘাট। তার উপর এখানে বাংলাদেশের অন্যতম নদীবন্দর বা লঞ্চ ঘাটের অবস্থান। তাই লঞ্চঘাটের সাথে সাথে নদী পারাপারের প্রধান ঘাট হওয়ায় এই জায়গাটি সবসময়ই ব্যস্ত থাকে। একই সাথে তুলনামূলকভাবে শীতলক্ষ্যা নদীটি সরু।
তাই শুষ্ক মৌসুমে এখানে পানি কম থাকায় নদীটি খুবই সরু হয়ে পড়ে। বাল্কহেডগুলো সামনে এতগুলো নৌকা দেখার পর এবং আগে থেকে এই এলাকাটি সম্পর্কে জানার পরও তাদের বাহাদুরি দেখানোর জন্য কোন প্রকার গতি না কমিয়ে চলাচল করতে শুরু করে। এর ফলে এ ধরণের দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। এমনকি সেন্ট্রাল ঘাটের কাছাকাছি হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ ফেরি ঘাটের ফেরি চলাচলের সময়ও বাল্কহেডগুলো কোন প্রকার ছাড় দিতে নারাজ।
দূর থেকে তারা ফেরিটিকে নদীর মাঝামাঝি দেখার পরও কোন প্রকার গতি না কমিয়ে চলাচল করে। ফলে প্রায় সময়ই ফেরিটিকে দীর্ঘ সময় যানবাহনসহ নদীর মাঝখানে আটকে থাকতে হয়।
এই বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিডিয়ার লাইভ প্রচারও করা হয়েছে। এরকম অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে গত গত বছরের ৪ এপ্রিল ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় প্রাণ দিয়েছে ৩৪জন নিরীহ যাত্রী। তবে সব কিছু মিলিয়ে প্রশাসনের তৎপরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে নৌযানগুলোকে নিয়ে আসতে হবে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায়। তা নাহলে সামনে আরও বড় ধরণের দুর্ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
২৪ মে সেন্ট্রাল খেয়াঘাটে একটি ডিঙ্গি নৌকার সাথে বাল্কহেডের সংঘর্ষ হয়। তখন রহমত-১ নামের বাল্কহেডটি আটকিয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া হয়। ৩ নভেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে বাল্ক হেডের ধাক্কায় যাত্রীসহ নৌকাডুবির ঘটনায় এক গৃহবধূ ও এক কিশোরী নিখোঁজ হয়। ২৩ ডিসেম্বর সকালে সোনাকান্দার কয়লাঘাট এলাকায় অয়েল ট্যাংকারের ধাক্কায় একটি বাল্কহেড ডুবে যায়।
গত ১৪ আগস্ট মেরাজ নামক এক বাল্কহেড হাজীগঞ্জ ঘাটের ফেরিকে ধাক্কা দিয়ে অনেক দুর পর্যন্ত নিয়ে যায়। এতে করে ফেরির যাত্রীরা বড় ধরণের কোন দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেও ফেরিটির ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপরও বেশ কয়েকবার বাল্কহেডের ধাক্কায় হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ এলাকার এই ফেরিটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
এবিষয়ে কথা বলার সময় বন্দর ঘাটের আব্দুর রউফ নামের এক যাত্রী জানান, তিনি নিয়মিত এই ঘাট দিয়ে চলাচল করেন। এখানে বালুবাহী বাল্কহেডগুলো যেভাবে একাধিক সারি করে একের পর এক আসতে থাকে। তখন সামনে যে একটি ব্যস্ততম ঘাট আছে, নদীর মাঝখানে অনেক নৌকা চলাচল করছে, তা দেখেও তারা কোন গতি না কমিয়ে বীরদর্পে চালিয়ে যায়।
আর এ কারণেই এধরণের দূর্ঘটনাগুলো ঘটছে। এমনও সময় দেখা যায় একেবারে নৌকার উপর তুলে দিচ্ছে কিন্তু তাদের চলাচলের গতি বিন্দু মাত্র কমাচ্ছে না। তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, এখান দিয়ে চলাচলের সময় প্রায় দেখি নৌ পুলিশ একটি ট্রলার যোগে বালুভর্তি বাল্কহেডের সামনে যাচ্ছে সেখান থেকে টাকা নিয়ে ছুটছে আরেকটির পিছনে।
অর্থাৎ তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় নদীতে যত বেশি বাল্কহেড থাকবে তাদের পকেট ততই ভারি হবে। তাই তাদের গতি, কিংবা চলচলের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নৌ পুলিশদের কোন প্রকার মাথা ব্যথা নাই।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদ আলম দিপু বলেন, প্রথমত যেসব নৌযান চলাচল করে এগুলোর কতগুলি বৈধ আছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সেসব নৌ-যানগুলো মাল নিয়ে চলাচল করে তখন তা যেন একেবারে ডুবো ডুবো অবস্থায় আসে। যখন নৌকা গুলো নদী পারাপার হয় তখন সেসব নৌযানগুলোকে বেরিকেড (বাধা দেওয়া) দেওয়ার টেকনিক্যালি কোন ব্যবস্থা নাই।
এখানে তারা কোন ট্রাফিক সিস্টেম মানে বলে মনে হয় না। আমরা জানি সন্ধ্যার পর বাল্কহেডগুলো চলাচল নিষেধ, তারপরও কিন্তু আমরা তাদের চলাচল দেখতে পাই। যেহেতু নারায়ণগঞ্জ বন্দরে প্রচুর মানুষ চলাচল করে, তাদের জন্য প্রচুর খেয়া নৌকা চলাচল করে এবং নদী পারাপার হয়। আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় বলার চেষ্টা করেছি।
আমরা এসব বিষয় নিয়ে নদীতে নৌকাবন্ধন কর্মসুচিও করেছি। যারা অবৈধভাবে ব্যবসা করে এমন ধরণের লোকতো আছেই, কিন্তু তা দেখভাল করার জন্যও কর্তৃপক্ষ আছে। এখানে নৌ পুুলিশ কি করছে? আমি কখনও নদী পার হওয়ার সময় এসব দেখভাল করার জন্য কোন নৌ পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে দেখিনি। আমরা থানায় গেলেও সেখানে কর্মকর্তাদের পাই না।
তারা কোথায় দায়িত্বপালন করে সেই বিষয়ও জানি না। তাদের যদি সার্চ করে বের করতে হয় তা খুবই দুঃখজনক। তারা কি কাজে সময় ব্যয় করে তা ই জানি না। এসব যানবাহন কত দ্রুত চলছে তা যাচাই (পরিমাপ) করার জন্য নৌ পুলিশের কাছে কোন যন্ত্র আছে কি না আমরা জানি না। তাদের কাছে এই যন্ত্রটা থাকার কথা।
নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ বলেন, নৌ ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বে যারা আছে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব তারা ঠিক মতো পালন করে না।
আমি কখনও তাদের এসব নৌযান নিয়ন্ত্রণ করতে দেখি না। তারা চাঁদা আদায়ে যতটা তৎপর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ততটা তৎপর না। শুধু নৌ পুলিশ না এজন্য তিনি বিআইডব্লিওটিএ এর কর্মকর্তাদেরও দায়ি করে বলেন, তাদের মধ্যে এ বিষয় নিয়ে কোন প্রকার আন্তরিকতা আমরা দেখি না। তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কোন একটা নিয়মের ভেতর আনা দরকার।
নৌ পুলিশের ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, নিখোঁজ কলেজ ছাত্রীর কোন সন্ধান মিলেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি, তবে আমি যতটুকু পেয়েছি তাহলো নৌকার মাঝি এবং বাল্কহেড চালক উভয়ের ছাড় না দেওয়ার কারণেই এখানে এ ধরণের নৌ দূর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। এখানে কে কার আগে যাবে এধরণের একটি প্রতিযোগিতা হয়।
নৌ যানের গতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যেগুলোর গতি বেশি দেখি তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংকেত দেই। তবে এখানে হাজার হাজার যানবাহন চলাচলের কারণে এবং নদীটা সরু হওয়ার কারণে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া এখানে একটি মাত্র চ্যানেল, এই চ্যানেলগুলো খনন করে যদি আরও দু একটা চ্যানেল বাড়ানো যেত তাহলে হয়তো সমস্যার সমাধান করা যেত।
এখন শুষ্ক মৌসুম হওয়ার কারণে নদী আরও সরু হয়ে গেছে। যখন পানি বেশি থাকে তখন এই সমস্যা কম হয়। নৌপুলিশের চাঁদা তোলার বিষয় যাত্রীদের করা অভিযোগের বিষয় তিনি বলেন, তারা কিভাবে বুঝল যে পুলিশ চাঁদা তুলছে।
এটা একটা কমন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন্ জায়গা থেকে চাঁদা তুলে তার একটি প্রমাণ দিক। তাছাড়া বাল্কহেড তো সন্ধা ৬টার পর থেকে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অন্য জাহাজতো আর আমি আটকাতে পারবো না। রাতের বেলা যদি কোন বাল্কহেড দেখেন তাহলে আমাকে একটু জানাবেন, দেখবেন আমি পুলিশ সদস্যসহ জাহাজের বিষয়ে কি ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করি।
নৌ পুলিশের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা বলেন, বাল্কহেডসহ বড় জাহাজদের অবশ্যই সাবধানের সহিত চলাচল করতে হবে। রাতের বেলায় বাল্কহেড চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই দিনের বেলায় তো আর তাদের চলাচলে নিষেধ করা যাবে না। এখন যেটা করতে হবে সেটা হলো সেগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, অবশ্যই তাদের একটা নির্দিষ্ট গতি সীমা আছে। যার বেশি গতিতে তারা চলাচল করতে পারবে না। এখানে ওভার স্পীড বা নির্দিষ্ট গতির বাইরে চালানো যাবে না। তিনি বলেন, খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে আমরা বেশি গতিতে চালানোর জন্য প্রায় ৮টির মতো মামলা দিয়েছি। আমরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টায় আছি।
তাছাড়া নিবন্ধনের বিষয়টা করা গেলে তাদের সংখ্যাও কমে যাবে এবং নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে আশা করি। চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, আমি এই বিষয়টি খুব শক্তভাবে বন্ধ করে দিয়েছি। তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া আছে যে, এ ধরণের কোন কিছু চলবে না।
এখনও চাঁদাবাজি চলছে এধরণের কোন প্রকার তথ্য আমার কাছে দিতে পারলে, শুধুমাত্র আমাকে লিখিত একটি অভিযোগ দিলে দেখেন আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করি কি না।
এখানে চাঁদাবাজি হোক তা আমি কখনও চাই না এবং আমি কখনও বরদাস্ত করব না। আমাকে শুধু দুএকজন স্বাক্ষ্য প্রমাণ সহ পাঠাতে পারলে ঘটনা সত্যি প্রমাণিত হলে আমি কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করব।


