Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

প্রযুক্তি আছে প্রয়োগের সুযোগ কম

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২২, ০৬:০০ পিএম

প্রযুক্তি আছে প্রয়োগের সুযোগ কম
Swapno

 

# গত একবছরে নারায়ণগঞ্জে ৬৯৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা
# নানা কারণেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বেড়ে যায় : আব্দুল্লাহ্ আল আরেফীন

 

শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী নারায়ণগঞ্জ শুধু বাংলাদেশই না, সারা বিশ্বের আলোচিত স্থান। এই শিল্প ও বাণিজ্যের মধ্যদিয়ে নারায়ণগঞ্জের জন্ম। যার ফলে এই জায়গাটি প্রাচ্যের ড্যান্ডির খ্যাতি অর্জনসহ ঐতিহাসিক ভাবে শত শত বছর ধরে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সভ্যতার আধুনিকায়ন ও শিল্পের প্রসারের সাথে সাথে বাড়ছে যান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

 

কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না তার নিরাপত্তার সুযোগ। তার উপর শিল্প কারখানার ব্যাপক বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে জনসংখ্যা ও আবাসিক স্থাপনা। একদিকে মিল-কারখানার ঘনত্ব অন্যদিকে আবাসিক ঘনত্বের ফলে এখন অনেকটাই ঘিঞ্জি এলাকাতে পরিণত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। তাই একই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে উন্নয়নের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ।

 

শুধুমাত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান ও যান্ত্রিক প্রযুক্তিই নিরাপত্তা ঝুঁকিতে নাই, নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে চলছে জনজীবনেরও। সাম্প্রতিক সময়ের নিরাপত্তা ঝুঁকির চ্যালেঞ্জগুলো রক্ষার যেই সমস্যা তার মধ্যে অন্যতম হলো অগ্নিকাণ্ড। এই অগ্নিকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে শুধু দেশের শিল্প বাণিজ্যই নয়, রক্ষা পাবে এসব কারখানায় শ্রম দেয়া এবং নারায়ণগঞ্জে বাস করা লাখ মানুষের জীবন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের চিত্রে একটি ভয়াবহতা লক্ষ করা যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠানের অগ্নিকাণ্ডে একদিকে প্রাণ হারাচ্ছে কর্মরত শ্রমিকরা, অন্যদিকে সবকিছু হারিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। তবে এসব নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানোর যে কোন সুযোগ নাই তা-ও নয়। আমরা একটু সচেতন হলেই এসব দুর্ঘটনার সিংহভাগই এড়াতে পারি।

 

এর মধ্যে বাসাবাড়ির অগ্নিকাণ্ডগুলোর বেশিরভাগই গ্যাস বিস্ফোরণে এবং কিছু কিছু ঘটেছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে। কিন্তু কলকারখানার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে, কিছুকিছু দাহ্য উপাদান ও গ্যাস বিস্ফোরণের মাধ্যমে।

 

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর তথ্য মতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৬৯৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার হিসেব মতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ বছরের গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুধু আড়াইহাজারেই ঘটেছে ১৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং বন্দরে ঘটেছে ১০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।

 

এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ইচ্ছে করলেই সময় মতো ফায়ার সার্ভিস টার্গেটে পৌছাতে পারে না এবং টার্গেটে পৌছানোর পর প্রয়োজনীয় পানির সরবারাহ না পাওয়া। শহরের বেশির ভাগ রাস্তাই সরু তাই পানির ট্যাংকসহ বড় গাড়ি সেখানে পৌছতে পারে না। কিছু কিছু সড়ক এতই সরু যে, এরমধ্যে আগ্নিনির্বাপকের ছোট গাড়ি নিয়েও প্রবেশ করা সম্ভব হয় না।

 

এরই মধ্যে মিল-কারখানার মালিকদের অবহেলাও কোন অংশে কম নয়। বিশেষ করে কমপ্লায়েন্স এর আওতার বাইরের কারখানাগুলো সামান্য কিছু খরচের ভয়ে বিরাট ক্ষতির মুখে পতিত হয়। তাছাড়া আমাদের দেশে হাইড্র্যান্ট সিস্টেম চালু হয়নি। যা আমাদের নারায়ণগঞ্জের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইড্র্যান্ট বা ফায়ারকক একটি সংযোগ পয়েন্টের ব্যবস্থা যেখান থেকে দমকলকর্মীরা অগ্নিনির্বাপনের জন্য সহজেই প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করতে পারে।

 

যে ব্যবস্থাটি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্যই খুব গুরত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জের কমপ্লায়েন্স আওতাধীন কারখানাগুলোতে এধরণের কিছুটা ব্যবস্থা থাকলেও কমপ্লায়েন্সের আওতাভূক্ত নয় এমন কারখানায় এধরণের কোন সিস্টেম থাকে না। তাছাড়া অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ্ আল আরেফীন যুগের চিন্তাকে জানান, আবাসিক ও শপিংমলসহ শহরের বিভিন্ন এলাকার জন্য হাইড্র্যান্ট সিস্টেম চালুর বিষয়ে এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর সাথে কথা হয়েছে।

 

এ ধরণের পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে তিনি সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের টিম সব সময় প্রস্তুত থাকে যেন খবর পাওয়ার ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই রওয়ানা হতে পারি। শুধু ম্যাসেজ নিতে যতটুকু সময়। কিন্তু আমরা দ্রুত রওয়ানা হতে পারলেও সময় মতো পৌছতে পারি না।

 

তার কারণ হিসেবে তিনি জানান, প্রথমত ট্র্যাফিক জ্যাম। তার উপর ট্রেনের সিগন্যাল। একবার ট্রেনের সিগন্যালে আটকালে তখন আর উপায় থাকে না। তারপর আমরা যেখানে গিয়ে পৌছব সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের গাড়ি নিয়ে প্রবেশের কোন রাস্তা নেই। রাস্তাগুলো এত সরু যে সেখানে প্রবেশ করতে পারি না। তারপর যদি প্রবেশ করতে পারি তখন দেখি সেখানে আগুন নিভানোর মতো পর্যাপ্ত পানি নাই।

 

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকাগুলোতে যখন পর্যাপ্ত পানি না থাকে আগুন নিভাতে পারি না। রাস্তা সরু থাকার কারণে আমাদের লেডার (হাইড্রেলিক মই) যুক্ত গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করার মতো জায়গা থাকে না। এই গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করতে না পারার কারণে বহতল ভবন থেকে ভুক্তভোগিদের বের করে আনতে পারি না। তাছাড়া কারখানা গুলোর ছাদের দরজা কিংবা বাইরে বের হওয়ার দরজা বন্ধ থাকে ফলে ভেতরে যারা আটকে পড়ে তারা না পারে বের হতে, না পায় নিশ্বাস নেওয়ার পরিবেশ।

 

তাই হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি থাকে না, থাকলেও তা অকেজো থাকে। অনেকে তা ব্যবহার জানেন না। সব কিছু মিলিয়ে আমাদের যতটুকু সাহায্য করার সুযোগ আছে আমরা তা প্রয়োগ করার সুযোগ পাই না। তাই এসব বিষয়ে সবারই নজর দিতে হবে।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন