Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

টানবাজারে বন্ড সুতার রমরমা ব্যবসা

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২২, ০৬:৩১ পিএম

টানবাজারে বন্ড সুতার রমরমা ব্যবসা
Swapno

# নানা মহলকে মোটা অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ
# সরব চোরাই সুতার কয়েক সিন্ডিকেট
# আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নাই: ওসি শাহ্জামান

 

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত বাণিজ্যনগরী নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুতা ব্যবসার জন্য সারাদেশে পরিচিত ছিল। সোনালী আশখ্যাত পাটের পরেই নারায়ণগঞ্জ বিখ্যাত ছিল সুতার বাজারকে ঘিরে। যে কারণে নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সুতা ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের নিট গার্মেন্ট ও হোসিয়ারী শিল্পকে ঘিরেও দেশের অন্যান্য জেলার সুতা ব্যবসায়ীরাও ছিল নারায়ণগঞ্জমুখী।

 

অত্র এলাকায় অন্তত কয়েক হাজার সুতা ব্যবসায়ী রয়েছে। তবে বর্তমানে অস্তিত্ব সঙ্কটে ধুকছে বেশীরভাগ সুতা ব্যবসায়ী। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সুতা বিকিকিনি হয় এই ছোট্ট টানবাজর এলাকাতেই। তবে বহুদিন ধরেই কথিত ছিলো এখানে সূতা ব্যবসার আড়ালে বিশাল বড় একটি চোরাই সুতা কারবারিদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।

 

তারা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বন্ড সুবিধায় আনা সুতার রমরমা ব্যবসা করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছও হয়ে গেছেন। প্রশাসন থেকে শুরু করে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলকে মোটা অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ করেই টানবাজারে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই সুতার ব্যবসা চালাচ্ছে একটি সিন্ডিকেট চক্র।


সূত্র জানায়, পোশাক শিল্পের উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য এদেশের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত ভাবে সুতা আমদানির সুবিধা দিয়েছে সরকার। বন্ড সুবিধায় বিদেশ থেকে আনা শত শত টন সুতা খোলা বাজরে বিক্রি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজারে। গার্মেন্টস শিল্পের জন্য বিশেষ সুবিধায় আনা কোটি কোটি টাকার সুতা খোলামেলা ভাবে বিক্রি হলেও যেন দেখার কেউ নেই।

 

যদিও নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা ও টানবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পাশেই কোটি কোটি টাকার সুতা খোলামেলা ভাবে বিক্রি হচ্ছে। পুুলিশের নাকের ডগায় প্রশাসন থেকে শুরু করে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলকে মোটা অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ করেই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব চোরাই সুতা ব্যবসা চালাচ্ছে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র। তবে কোন প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানিকৃত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করার অনুমতি নেই। কিন্তু একটি অসাধু মহল বিদেশ থেকে আনা এসব সুতার বড় একটি অংশ কালোবাজারির মাধ্যমে টানবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এসকল ব্যবসা করছেন তারা।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টানবাজারে বিদেশী চোরাই সুতার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র। টানবাজারের বিভিন্ন দোকানে অবৈধভাবে সুতা বিক্রি হচ্ছে। তবে কবে থেকে এই সুতা বিক্রি শুরু হয়েছে তার সঠিক সন-তারিখ বলতে পারেন না কেউ, তবে দীর্ঘ ধরে গোপনে বিক্রি হলেও এখন প্রকাশ্যে এই সুতা বিক্রি হতে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই।

 

শুধু তাই নয়, গোডাউন থেকে বাজারের প্রায় দোকানে পাইকারি সাপ্লাই দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সূতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, স্থানীয় প্রশাসনকে মোটা অংকের মাসোহারা দিয়ে এই অসাধু চক্র দীর্ঘ বছরের পর বছর ধরেই এ ব্যবসা করে আসছেন। বেশ কয়েক বার টানবাজরে অভিযান চালানো হয়েছে।

 

এবং কোটি কোটি টাকার মূল্যের চোরাই সূতা উদ্ধারও করেছিলেন শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস বন্ড কমিশন। সেই সময়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেন এবং মামলাও দায়ের করেছিলেন। কিন্তু এখন আবার প্রকাশ্যে এই সুতা বিক্রি হচ্ছে। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস বন্ড কমিশন বা প্রশাসনের কোনো নজরধারী নেই।

 

বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার কীভাবে হচ্ছে তার ব্যাখ্যায় নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন উদ্যোক্তা জানান, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধায় সূতা আমদানি করছেন অসাধু কিছু ব্যবসায়ী। সেটা স্থানীয় বাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে সংশ্নিষ্ট বন্ড লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারক এবং শুল্ক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে।


জানাগেছে, গত ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস অ্যান্ড কমিশনারেট নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার এলাকায় এবং নিকটস্থ মাঠে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ৯ হাজার ৪৪ কেজি বন্ডেড সুতা উদ্ধার করা হয়। যার বাজার মূল্য এক কোটি টাকা। এরপর ১৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের সুতারপাড়া, বংশাল রোড এলাকার সাদ ট্রেডার্স এবং আজাদ ট্রেডার্সের গুদামে অভিযানেও ২৫ হাজার ৮৩৬ কেজি অবৈধ বন্ডেড সুতা আটক করা হয়। যার বাজার মূল্য ৩ কোটি টাকা।

 

পরে বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ২০ জন চোরাই সুতা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পৃথক দুটি মামলা করেছে কাস্টমস অ্যান্ড কমিশনারেট। ঔই সময়ে কাস্টমস অ্যান্ড কমিশনারেট এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান মো. নাহিদুল হাসান বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় মামলা দুটি দায়ের করেন। পুলিশ মামলায় মামুন নামের একজনকে আটকও কারা হয়েছিলো।


আসামিরা হলেন হাজি বিল্লাল (বিসমি অ্যান্ড ট্রেডিং), ব্যবসায়ী হাজি ইসমাইল (জেমি এন্টারপ্রাইজ), ফরহাদ (টানবাজারের ব্যবসায়ী), সুব্রত রায় (এস এস থ্রেড এক্সেসরিজ), বিপুল মন্ডল (শুভা এন্টারপ্রাইজ), পুলক চৌধুরী (মেসার্স পুলক চৌধুরী), মো. সেলিম রেজা (এইচ এস থ্রেডিং), মো. গোলাম কিবরিয়া মামুন (তোতা ইয়ার্ন থ্রেডিং), আব্দুল মান্নান মিয়া (জামান ইয়ার্ন থ্রেডিং) ও খান নজরুল ইসলাম (শিমুলিয়া থ্রেড ইন্টারন্যাশনাল)।

 

অপর মামলার আসামিরা হলেন- মো. জহির হোসেন (মেসার্স সাদ ট্রেডার্স), মো. আওলাদ হোসেন (মেসার্স আজাদ ট্রেডার্স), হাজি ইসমাইল (জেমি এন্টারপ্রাইজ), ফরহাদ (টানবাজারের ব্যবসায়ী), মো. আমিনউদ্দিন (সুতাঘর), গোবিন্দ্র চন্দ্র সাহা (রিতা ট্রেডার্স), মো. আইয়ুব আলী, মো. সেলিম (যাকি এন্টারপ্রাইজ), সমির সাহা (এনবি ট্রেডিং), রুহুল আমিন (আমিন ব্রাদার্স)।

 

গত ৮ ডিসেম্বর শহরের বাণিজ্যিক এলাকা টানবাজারে হাজি বিল্লাল হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিসমি ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের গুদামে এ অভিযান চালিয়ে একই অভিযোগে এক কোটি টাকা মূল্যের ১০ টন বন্ডেড সুতা জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস বন্ড কমিশন। গাজীপুরের জেলার টঙ্গী উপজেলার ভাদাম এলাকায় অবস্থিত রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান সুপ্রভো কম্পোজিট নিট কারখানার নামে কাপড় তৈরির জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব বন্ডেড সুতা আমদানি করা হলেও গোপনে উচ্চমূল্যে এসব সুতা অবৈধভাবে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে বিসমি ইয়ার্ন ট্রেডিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়।

 

মূলত ওই ঘটনার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের চোরাই সুতা ক্রয়-বিক্রয়কারী ব্যবসায়ীদের নজরদারি শুরু করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস বন্ড কমিশন।


এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহ্জামান জানান, এবিষয়ে আমাদের কাছে সুনিদিষ্ট  কোনো অভিযোগ নাই। অভিযোগ পেলেই আমরা এসকল অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওযা হবে। তিনি আরও বলেন, এই বিষয়ে আমরা চাইলে সরাসরি কোনো অভিযান চালাতে পারি না।

 

যদি  শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কাস্টমস বন্ড কমিশন আমাদের কাছে এবিষয়ে সহযোগিতা চায় তাহলে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করবো বলে তিনি বলেন।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন