#কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র
একটা সময় দেশের মানুষের রান্নার জন্য লাকড়ির চুলা (উনুন) কিংবা কেরোসিনচালিত স্টোভের প্রচুর ব্যবহার ছিল। তখন মাটির কাদা দিয়ে চুলা তৈরি করে সেই চুলায় কাঠের লাকড়ি, ধানের তুষ, শুকনো খরকুটা ও শুকনো বাঁশসহ বিভিন্ন জ্বালানী ব্যবহার করে মাটির চুলোয় রান্না করতো। তবে সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে এই রান্নার পদ্ধতিতে লাগে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া।
তাকে কেন্দ্র করেই ১৯৬৪ সালের ২০ নভেম্বর কোম্পানী আইনের আওতায় যৌথ তহবিল কোম্পানী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। যে প্রতিষ্ঠানটি রান্নার কাজের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করার কাজে ন্যাস্ত ছিল। প্রথম অবস্থায় এই সুযোগটি পায় শুধু রাজধানী ঢাকাবাসী।
এই পদ্ধতিটি চালু হওয়ার পর যখন মানুষের কায়িক শ্রম ও সময়ের দিক দিয়ে লাভবান হয় তখন থেকেই তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে নারায়ণগঞ্জ, গাজিপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ১৯৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবারহের মাধ্যমে তিতাস গ্যাসের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় এবং পেট্রোবাংলার অধীনে বৃহত্তর ঢাকা,
বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তবে তিতাসের গ্রাহকরা এখন আর সেই স্বস্তি নেই। কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় কিছু পঞ্চায়েত প্রধান, রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটিকে। বছর বছর গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হচ্ছে ঠিকই কিন্তু গ্রাহক সেবার মান যাচ্ছে রসাতলে।
এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িতরা প্রকৃত বিল গোপন করা, অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং ও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনেই বেশি সময় ব্যয় করে বলে বিভিন্নভাবে অভিযোগ উঠে। এদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই তল্লাশী শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে সরকারের বৈধ সংযোগ বন্ধ ঘোষণার পর থেকেই যেন এসব দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে উপার্জনের রাস্তা আরও প্রশস্ত হয়।
বিপরীতে বিপুল পরিমান গ্যাস অবৈধ ব্যবহারের কারণে একদিকে গ্যাসের মজুদের উপর সরবরাহ ব্যবস্থার উপর চাপ পড়ছে। অন্যদিকে অর্থিকভাবে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারালেও পকেট ভারি হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হচ্ছে এই সব দুর্নীতিবাজরা।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর একবার আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে পরে ২০১২ সালে আবার চালু করে। কিন্তু ২০১৩ সালের শুরুতেই তা পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপর থেকেই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে সরকারকে ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র।
যে সংযোগের জন্য একসময় হাত খরচাসহ সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ হতো সেখানে অবৈধ প্রতি সংযোগের জন্য নেওয়া হয় ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব টাকা ভাগ বাটোয়ার হতে শুরু করে সিন্ডিকেটের স্থানীয় নেতা বা প্রভাবশালী, মিস্ত্রী, ঠিকাদার এবং প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মাঝে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও বন্দরের একাধিক গ্রাহকের সাথে আলাপ কালে তারা জানান, বৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়েছে প্রায় ৮ থেকে ৯ বছর যাবত। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে এসব এলাকায় প্রচুর নতুন বাড়ি ঘর তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব বাড়ি ঘরের মানুষ কি গ্যাস সংযোগ ছাড়াই আছে? মোটেও না। নতুন এসব বাড়ি ঘরের শতকরা হিসেবে ১০ পার্সেন্টও পাওয়া যাবে না যারা সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করে।
তাহলে বাকিরা চলছে কিভাবে? তিতাসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। কারণ এসবের সাথে তাদের বড় অংকের একটা অর্থিক সুবিধার বিষয় জড়িত। এদের মধ্যে অনেকেই আবার অভিযোগ করেন, অবৈধ গ্রাহকরা সিন্ডিকেটকে এককালীন টাকা দেওয়ার মাধ্যমে সংযোগ নিলেও বছরের বিভিন্ন সময় তাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা সংকেতের জন্য আলাদাভাবে টাকা নেওয়া হয়।
যারা এই টাকা না দিবে তাদের এখানে হঠাৎ করেই তিতাসের লোকজন এসে হানা দেয়, বড় অংকের টাকা জড়িমানা করে। তখন তার সাথের বাড়ি কিংবা আশেপাশের কোন ঘরে তাকায়ও না। তারা যে বাড়িগুলোকে টার্গেট করে শুধু সেই বাড়িতেই হানা দেয়। এ সময় কেউ যদি বলে ঐ বাড়িতেও অবৈধ সংযোগ আছে তাতেও তারা ভ্রক্ষেপ করে না।
এরই মধ্যে সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে অভিযোগ পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এরপরেই আবার দেখা যায় সেসব জায়গায় আবারও নতুন করে সংযোগ দেওয়া হয়ে যায়।
এসব বিষয়ে বলার মতো যেন কেউ নেই। এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এর নারায়ণগঞ্জের বালুর মাঠ কার্যালয়ে গিয়ে সেখানকার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাম উদ্দিন শেখ এর সাথে আলোচনা করতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন না বলে জানান।
কোন কথা থাকলে তার অধীনস্ত কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করতে বলেন। সেখানকার জোনাল ব্যবস্থাপকের একজন সেদিন অফিসে আসেননি অন্যজন তিনদিনের ছুটিতে বলে জানান। কিন্তু কেউই সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করতে রাজি হননি।


