Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

লবণের ভেতর বিষ

Icon

যুগের চিন্তা অনলাইন

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২২, ০৪:৪৭ পিএম

লবণের ভেতর বিষ
Swapno

# চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছেন ভোক্তারা
# নিতাইগঞ্জে লবণ মালিকের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে
# সিন্ডিকেট বলতে কিছু নাই, প্যাকেটে দাম বেশী আছে: পরিতোষ সাহা
# এসকল অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই জোরালো অভিযান: এডিএম

 

নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ সারাদেশে লবণের যে কয়টি বৃহৎ পাইকারী মোকাম রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম। এই মোকাম থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লবণ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে ২০টির মতো লবন কারখানা ও লবন ব্যবসায়ী বা আড়তদার রয়েছেন ৩০ জনের মতো। নিতাইগঞ্জে লবণ মালিকের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।

 

এই সিন্ডিকেটের শিল্প লবণকে খাবার লবণ মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশ থেকে আমদানি করা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা শিল্প লবণ যাচ্ছে ভোক্তাদের পেটে। মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর হলেও নারায়ণগঞ্জের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দেখতে একই রকম ও তুলনামূলক কম দাম হওয়ায় শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে ভোজ্য লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) হিসেবে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এরা লবণের নামে ভোক্তাদের বিষ খাওয়াচ্ছে। এতে করে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছেন ভোক্তারা।


এদিকে শিল্প লবণ মানবদেহের কিডনি ও লিভার ড্যামেজ এবং ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাসহ নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে শিল্প লবণকে মাদকের চেয়েও ক্ষতিকর বিষ বলে মন্তব্য করেছেন প্রকৃত লবণ ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ভেজালকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে দেশের লবণ শিল্প যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সারা দেশের জনস্বাস্থ্য রয়েছে চরম হুমকির মুখে।


জানা গেছে, সাধারণত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশিং পাউডার হিসেবে ব্যবহারের জন্য আমদানি করা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা শিল্প লবণ। কিন্তু আসন্ন রমজান উপলক্ষে লবণের বাড়তি চাহিদার সুযোগকে পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় নারায়ণগঞ্জের ১৫ জন লবণ কারখানা মালিকের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট শিল্প লবণকে খাবার লবণ হিসেবে বাজারজাতকরণের কাজে মাঠে নেমেছে।

 

শিল্প খাতের ধবধবে সাদা দানাদার লবণে আয়োডিন মিশ্রিত করে বাজারজাত করছে এই সিন্ডিকেটে। শুধু ছোটখাটো লবণ মিল কিংবা আড়তদারই নয়, বড় কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লোকজনও এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। কারণ ভেজাল এই লবণের বড় একটি চালান বাজারজাত করতে পারলেই রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক কেজি ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বিক্রি করে অসাধু এই চক্র প্রতি কেজিতে হাতিয়ে নিচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকা।


সম্প্রতি দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোজ্য লবণ আমিদানি-নিষিদ্ধ হওয়ায় শিল্প লবণের আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

 

চাহিদার দ্বিগুণের বেশি আমদানি হওয়া শিল্প লবণ খোলাবাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারদর অপেক্ষা স্থানীয় বাজারে অপরিশোধিত লবণের মূল্য বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে অপরিশোধিত লবণের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য উৎসাহিত হচ্ছে। স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীগণ সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশিয়ে বাজারজাত করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।


ট্যারিফ কমিশন বলছে, কস্টিক সোডার কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম সালফেট দেখতে খাওয়ার লবণের মতোই। অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে তার সঙ্গে সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার ও গার্মেন্ট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম ক্লোরাইড মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লবণ মিল মালিক ও আড়তদাররা জানান, বাংলাদেশ লবন মিল মালিক সমিতির বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট এসকল বেজাল কর্মকান্ডে সাথে জড়িত। তারা চট্টগ্রামের আমদানীকারকদের কাছ থেকে শিল্প লবন এনে নিজেদের কারখানায় কিংবা গোডাউনে মজুদ রেখে সেগুলো ছোট মিল মালিকদের কাছে সরবরাহ করে।

 

ওই সকল প্রতিষ্ঠানে আমদানীকৃত ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট বা শিল্প লবনকে রাতের আধাঁরে ছোট আকারের প্যাকেটে ভরে ফেলা হয়। কখনো বিএসটিআই কিংবা জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত অভিযানে আসলে তারা যাতে পরীক্ষা করে কিছু ধরতে না পারে সেজন্য আয়োডিন মিশ্রিত সাধারণ লবনের সঙ্গেও এই শিল্প লবন মিশ্রন করা হয়। লোকচক্ষু ও প্রশাসনকে ফাঁকি দিতে গভীর রাত থেকে ভোর অবধি চলে ভেজালের এই কার্যক্রম। এছাড়া বিসিকের একজন কর্মকর্তাও ওই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তাকে প্রায়শই ওইসকল কারখানায় ও আড়তে যাতায়াত করতে দেখা যায়।


এবিষয়ে বাংলাদেশ লবন মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহা যুগের চিন্তাকে সিন্ডিকেট বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্কীকার করে বলেন, সিন্ডিকেট বলতে কিছু নাই। তবে লবণের প্যাকেটের গায়েঁ দাম কিছুটা বেশী আছে বলে আমি স্বীকার করছি। তবে বিসিক চাইলে সেটা কমাতে পারে। আমি চাই বিসিক সেটা করুক। এখানে সিন্ডিকেটের কিছুই না। তিনি আরও বলেন, আইনে আছে লবণে আয়োডিন ব্যবহার করতেই হবে। যদি তা না করে তাহলে জেল জরিমানা হতে পারে। সবাই আয়োডিন ব্যবহার করেই লবণ বাজারে ছাড়ে।


এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) শামীম বেপারী যুগের চিন্তাকে বলেন, আমাদের বাজার মনিটরিং টিম সার্বক্ষনিক বাজার মনিটরিং করছে।  কোনো লবণ মিলস মালিক যদি এধরনের কাজের সাথে লিপ্ত থাকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসকল অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই জোরালো অভিযান পরিচালনা করা হবে।
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন