এনায়েতনগর সালেহার বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২২, ০৫:২১ পিএম
# মাদরাসা থেকে আলিম পাশ
# মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা কমিশন বাণিজ্য
টেবিলের সামনেই রাখা চিকিৎসা সামগ্রী। কথা বলে বা দেখে কোন ভাবেই বোঝার উপায় নেই তিনি একজন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভিজিটর। মনে হবে তিনি কোন মেডিকেল থেকে পাশ করা একজন এমবিবিএস ডাক্তার। কিন্তু তিনি কোন এমবিবিএস ডাক্তার বা মেডিকেল অফিসার নন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সালেহা আক্তার নামে এক নারী এনায়েত নগর ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ফ্যামিলি ওয়েল ফেয়ার ভিজিটর হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, আশপাশের ক্লিনিক থেকে কমিশনের বিনিময়ে রোগিদের অতিরিক্ত পরীক্ষা করানোর বিনিময়ে বিশাল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। একই সাথে রোগীদের অযথা ঔষধ দিয়ে থাকেন নিজের নামে পেডে। ঔষধ কোম্পানি থেকেও মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার কমিশন পেয়ে থাকেন বলে জানান স্থানীয়রা।
এনায়েত নগর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের সামনেই বিভিন্ন ক্লিনিকের দালাল এবং ঔষধ কোম্পানির লোকজনে ভরপুর হয়ে আছে। ভিতর থেকে কোন রোগি বের হয়ে আসলেই তার থেকে পেড নিয়ে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ছবি তুলার জন্য হুমরি খেয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি দেখে অনেক রোগীরা পর্যন্ত বিব্রতবোধ করেন।
অভিযোগ করে একাধিক রোগী জানান, এনায়েত নগর ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দীর্ঘ যাবৎ সালেহা আক্তার ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর হিসেবে একা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এখানে সরকারি নিয়োগ প্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও তা ৪ থেকে ৫ বছর যাবৎ নেই। আর এই সুযোগ কাজিয়ে লাগিয়ে এখানকার দায়িত্বরত ব্যক্তি সালেহা অসাধু উপায়ে রোগী দেখার নাম করে পরীক্ষা নিরিক্ষা করার কথা বলে এবং ঔষধ কোম্পানি থেকে কমিশন বাণিজ্য করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সেই সাথে গর্ভবতী মায়েদের সিজার করার জন্য কমিশন ভিত্তিতে মোস্তাফিজ ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার সহ আশ পাশের ক্লিনিকে রোগী পাঠান। তার কাছে গর্ভবতি রোগীরা আসলেও তাদেরকে তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা দেন। একই সাথে এনায়েত নগর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র তার নিজের নামে লেখা পেইডে এক গাদা ঔষধ লিখে দেন। অথচ তিনি কোন ডাক্তার বা মেডিকেল অফিসার নন।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, এই সালেহা দাউদকান্দি সোনাকান্দা মাদরাসা থেকে আলিম পাশ করেছে। তার কোন ডাক্তারি গ্রাজুয়েশন নেই। তিনি থাকেন মাসদাইর গাইবান্দা বাজার এলাকায়। তার সাথে যোগসাজস করে পঞ্চবটি এলাকার মোস্তাফিজ ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের দালাল শামীম রোগিদের পরীক্ষা করার জন্য ওই ক্লিনিকে নিয়ে যান।
ঘনিষ্ঠ একটি সুত্র জানান, তিনি সেবার স্থানকে কসাইখানা বানিয়ে নিয়েছেন। তার এখানে রোগীরা আসলেই তাদেরকে সরকারি ঔষধ না দিয়ে তার তার নাম লেখা পেইডে বিভিন্ন ঔষধ লিখে দেন। যা অনেকের ক্রয় ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। মোস্তাফিজ সেন্টার থেকে তিনি মাসিক কমিশন পান বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। যা মিনি মাম ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পান।
পঞ্চবটির এলাকার এক দোকানদার বলেন, এই নারী এখানে বসে নিজের নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত করে অর্থলোভী চিকিৎসক সেজে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরির সঙ্গে গোপন চুক্তিতে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর কমিশন গ্রহণ করছে। কমিশনের লোভে তিনি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষাও করাচ্ছেন। এমনকি তার পছন্দের প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে আনতে বাধ্য করেন তিনি।
এসময় হারুন নামের এক ব্যক্তি জানান, চিকিৎসা পেশাটা এখন একটু একটু কেউ বুঝতে পারলেই নিজেকে ডাক্তার ভাবেন যার প্রমান এনায়েত নগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত ব্যক্তি সালেহা। ডাক্তাররা লেবাস ধরে বাণিজ্যিকীকরণে মেতে উঠেছেন তিনি। তার এখানে বেশিরভাগ বিভিন্ন গার্মেন্টসে কর্মরত গর্ভবতী মহিলারা আসেন।
তাদের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি বিভিন্ন টেস্ট দিয়ে থাকেন। অথচ তিনি কোন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও নন। আমরা বিস্মিত তিনি কি করে এই ভাবে মানুষকে একধরনের ধোকা দিয়ে পরীক্ষার নামে কমিশন বাণিজ্য করে যাচ্ছেন। সেই সাথে গর্ভবতী নারীদের ডেলিভারির জন্য সিজারের পরামর্শ দেন। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষই বা কি ব্যবস্থা গ্রহণ আমাদের বোধগম্য নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী জানান, চিকিৎসক হওয়া মানে কাড়িকাড়ি টাকা আর পার্সেন্টেজ। ঘরে বসেই বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে সুবিধা পাওয়া। চিকিৎসা এখন আর সেবা নয়, রূপ নিয়েছে ব্যবসায়। এই সালেহার তার টেস্ট বানিজ্যের অন্যতম হাতিয়ার দালাল শামীম।
এই বিষয়ে এনায়েত নগর ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর সালেহা আক্তার তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু তার সামনেই ঔষধ কোম্পানির লোকজন এবং মোস্তাফিজ ডায়াগনিষ্টিক সেন্টারের দালাল শামীকে বসে থাকতে দেখা যায়। সাংবাদিক এসেছে বুঝতে পেরে তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে চলে যান।
পরীক্ষার বিষয়ে তিনি জানান, এখানে গর্ভবতি নারীরা আসলে তাদের গর্ভের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিয়ে থাকি। এখানে কতদিন যাবৎ মেডিকেল অফিসার নেই তা জানতে চাইলে তার সঠিক উত্তর দিতে পারেন নাই। তিনি কোন পরীক্ষা নিরিক্ষা দিতে পারেন কি না তা জানতে চাইলে তার সঠিক উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলেন।
পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রের জেলা উপ-পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, একজন মানুষ হিসেবে ভূল ত্রুটি থাকতে পারে। আপনারা তাকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারেন তার বিষয়ে এই অভিযোগ আছে। তার পরেও আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব।
নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট শামীম বেপারী বলেন, আমরা তার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।


