ত্বকী হত্যার বিচার হবেই : মেয়র আইভী
যুগের চিন্তা অনলাইন
প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২২, ০৬:০৯ পিএম
# ত্বকীর বাবা ও মাকে দেখে আমরা সাহস পাই
# ত্বকী হত্যার প্রতিবাদ করায় বোমা হামলা ঘটানো হয়েছে
নারায়গঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ত্বকী হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না, তা সারা দেশের মানুষ বুঝতে পারে। এখানে এমন প্রভাবশালী লোকজন জড়িত, রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় যাদের বেড়ে ওঠা। নিজেদের তারা এমনই মনে করে যে রাষ্ট্রকেই মানতে চায় না। রাষ্ট্র তাদের ভয় পায় কি না জানি না।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্য ও শান্তি ধ্বংস করার জন্য ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে। এ দুর্বৃত্ত শক্তি নারায়ণগঞ্জের মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখতে চায়, যা আর কখনো সম্ভব না। গতকাল তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর ২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে “সপ্তম জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা’ ২১” এর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান গতকাল বিকেলে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে তিনি এসব কথা বলেন।
আইভী আরো বলেন, ‘ত্বকী হত্যার প্রতিবাদকারীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। তারপরও আমরা পিছিয়ে যাইনি। সাহসের সাথে আমরা এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছি। ত্বকীর বাবা ও মাকে দেখে আমরা সাহস পাই। এইরকম সাহসী বাবা-মা সারা বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রয়োজন।’ আইভী বলেন, আপনারা জানেন, ত্বকীকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে। নির্মম সত্য এই যে, আজ ৯ বছর হয়ে গেছে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না।
বাংলাদেশে আবরার হত্যাকান্ডসহ আলোচিত কিছু হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচার কেন হচ্ছে তা সকলেই বুঝে এবং জানে। এইখানে প্রভাবশালী লোকজন জড়িত যারা রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠে এমন ভাব যে, রাষ্ট্রকেই তারা মানতে চায় না। রাষ্ট্র তাদেরকে ভয় পায় কিনা আমি ঠিক জানি না। তা না হলে এমন কী গোপণ রহস্য যে, এই হত্যাকান্ডের বিচার হবে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা এই হত্যাকান্ডের বিচার চাই। আমরা আশা রাখতে চাই এই কারণে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার নেত্রী। আমি তাঁর দলেরই একজন সদস্য। উনি দীর্ঘদিন ওনার বাবা-মা হত্যার বিচার চেয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিচার হয়েছে। তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর সুনজর থেকেই এই রাষ্ট্র একদিন ত্বকী হত্যার বিচার একদিন করবে।
যতদিন এই না হবে ততদিন আমরা এই বিচারের দাবি জানিয়ে যাবো। নাসিক মেয়র বলেন, ত্বকী হত্যার প্রতিবাদ করা সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান মাসুম ভাইয়ের বাড়ির সামনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০১৩ সালে ত্বকী হত্যার পরপর অনেক নির্যাতন আমাদের অনেকের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। ত্বকী বাবার বিরুদ্ধে হেন কোন অশ্লীল কথা ছিল না যা বলা হয়নি।
আমাকে এমনভাবে নারায়ণগঞ্জে অসম্মানিত ও অপমানিত করার চেষ্টা করা হয়েছে যা একজন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না কিন্তু তারা তা করেছে। পারভেজ নামে ওসমান পরিবারের এক কর্মী ত্বকী হত্যার সাথে জড়িত ছিল। সে গুম হয়েছিল। আমার মনে হয়, পারভেজকে সে-ই গুম করিয়েছে। কারণ ওই ছেলে ত্বকী হত্যা নিয়ে সবই জানতো। পারভেজকে হত্যা সে-ই করিয়েছে।
তারপর সে মামলা দিয়েছে আমার ভাইসহ সাতজনকে। বিনা কারণে জেল খাটিয়েছে। গর্বের সাথে হত্যাকারীরা বলেছিল, জেল খাটিয়ে দেখিয়ে দিলাম। আমার মায়ের নামে মামলা দিয়েছে, আমার নামে মামলা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কোন না কোনভাবে আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। তারপরও ত্বকী হত্যার প্রতিবাদকারীদের কেউ পিছিয়ে যায়নি।
কারণ আমরা সন্তানের বিচার চাই। সাহসের সাথে আমরা এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছি। ত্বকীর বাবা ও মাকে দেখে আমরা সাহস পাই। এইরকম সাহসী বাবা-মা সারা বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা সরবো না, আমরা আরও দুর্বার গতিতে রুখে দাঁড়াবো। নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যার বিচার হবেই। তিনি বলেন, আমরা যেন কোনকিছুকে ভয় না পাই।
সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ত্বকী নাই, এইটা অনেক কষ্টের। কিন্তু ত্বকী আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেছে। ত্বকী আজও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে। ত্বকী প্রতিবাদী হতে শিখিয়েছে। নারায়ণগঞ্জে হত্যাকান্ড অনেক কমেছে। আমরা জেগে ওঠায় সন্ত্রাসীরা ভয় পেয়েছে। সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জে অনেক ঝামেলার মধ্য দিয়ে সিটি কর্পোরেশন চালাতে হয়।
২০১১ সালে আমি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলাম। দল-মত নির্বিশেষে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নেওয়ার দিন আমি বলেছিলাম, ‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান, রণাঙ্গণের স্লোগান, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই স্লোগান কুক্ষিগত করেছে। সুতরাং এটি জাতীয় স্লোগান হওয়া উচিত।
কারণ এই স্লোগান সাহসীকতার প্রতীক। সেদিন আমার এই বক্তব্যে কাটপিস করে নানা জায়গায় পাঠানো হয়েছিল। দল থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়াও চলছিল। অথচ আজকে সেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আদালতের রায়ের মাধ্যমে জাতীয় স্লোগান হয়েছে। আমি মনে করি, যেটা মানুষের ন্যায্য অধিকার সেটা আসবেই। সেভাবেই ত্বকী আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। সুতরাং এই হত্যাকান্ডের বিচার হবেই হবে। এর কোন বিকল্প নাই।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক, নিহত ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি’র সভাপতিত্বে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শওকতআরা হোসেন, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব কবি হালিম আজাদ, সপ্তম জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা ’২১ এর আহ্বায়ক জাহিদুল হক দীপু ও ত্বকীকে নিয়ে রচনা লেখায় ‘ত্বকী পদক’ পাওয়া বিজয়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়োর শিক্ষার্থী ঈশিতা ফারজানা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা রওনক রেহানা।
অনুষ্ঠানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ত্বকীর অনুষ্ঠানে এলে আমাদের এক অপরাধের অনুভুতি তৈরী হয়, যে আমরা ত্বকীকে বাঁচাতে পারিনি। ত্বকী বাংলাদেশের সকল কিশোরদের প্রতীক। যে স্বপ্ন দেখে, লাইব্রেরিতে যায়, মিছিলে যায়, সমাজটাকে বদলে দিতে চায়, অন্ধকার থেকে মানুষকে আলোয়ে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তা হলো না। সর্বত্র এখন অন্ধকারে ছেয়ে আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ রাষ্ট্রে অন্ধকার না আলো জয়ী হবে। চারদিকে হতাশা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। টিসিবির গাড়ির পেছনে ছুটছে গোটা বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ এখন বাংলাদেশের প্রতীক। যেখানে মানুষের নিরাপত্তা নেই, আবার এ থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষ সংগ্রাম করছে, দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তিনি বলেন, সমাজটাকে মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে, মুক্তিযুদ্ধটা এ জন্যই হয়েছিল। যে রাষ্ট্রে আমরা বসবাস করছি তা কতটা অকার্যকর তার প্রতীক ও উদাহরণ হচ্ছে ত্বকী। এ রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে বদলানো নাগেলে ত্বকীদের নিরাপত্তা ও বিকাশ সম্ভব নয়।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ত্বকী অশেষ সম্বাবনার প্রতীক। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি একটি পরিবারের পক্ষ নিতে পারেন না, আপনি সতেরো কোটি মানুষের অভিভাবক। আপনার অবশ্যই কর্তব্য ত্বকী হত্যার বিচার করা। ক্ষমতায় থাকাই সব নয়। হাশরের ময়দানে দাঁড়াতে হবে। কী জবাব দেবেন সেখানে? এমন বাংলাদেশ আমরা চাইনি। আমরা সোচ্চার কণ্ঠে দাবি করছি ত্বকী হত্যার বিচার চাই। আগামী বছর যেন আর বলতে না হয় “ত্বকী হত্যার বিচার চাই”।
রফিউর রাব্বি বলেন, রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর ও বর্বর হতে পারে তার উদাহরণ এই ত্বকী হত্যা ও এর পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রম। ১৪৬ বার ত্বকী হত্যার তারিখ ঘুরেছে, কিন্তু তৈরী করে রাখা অভিযোগপত্র আদালদে জমা দেয়ার জন্য। কিন্তু দেয়া হয়নি। দুর্বৃত্ত রক্ষার রাজনীতি থেকে পরিত্রাণের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু আমরা তা থেকে মুক্ত হতে পারিনি।
অনুষ্ঠানে সারা দেশের বিজয়ী ৬০ জনকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ছয়টি বিভাগে শ্রেষ্ঠ ছয়জনকে “ত্বকী পদক” প্রদান করা হয়। সেরা দশজননের লেখা ও আঁকা নিয়ে প্রকাশিত হয় স্মারক “ত্বকী”।


