নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ, বিপাকে যাত্রীরা
মামুনুর রহমান
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২২, ০৫:১৩ পিএম
# টার্মিনালের গেটের সামনে বসে আছেন বৃদ্ধা আমেনা বেগম
# শিশু মিমের নানু বাড়ি যাওয়া হলেও না
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া পপুলার ডায়গোনিস্ট সেন্টারে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন ৭৫বয়সি বৃদ্ধা আমেনা বেগম। তার গ্রামের বাড়ি গজারিয়ার ষাটনলে। গত রবিবার সকালে তিনি পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাক্তার দেখাতে আসেন নারায়ণগঞ্জে। ফিরে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু ডাক্তার দেখাতে দেরি হওয়াতেই আর তিনি ফেরেননি।
রাতে এক আত্মীয়র বাসায় রাতি যাপন করে সকালে আবার বাড়ি ফেরার উদ্যেশ্যে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালে এসে হাজির হন। সাথে ছিলেন তার মেয়ে কুলসুম আক্তার। এসে দেখে টিকিট কাউন্টার খোলা অথচ টিকেট বিক্রি করছে না টিকেট ম্যান। টিকেট ম্যান জানান লঞ্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। আপনারা অন্য কোনোভাবে বাড়িতে ফিরে যান।
এদিকে লঞ্চ বন্ধ থাকায় টার্মিনালের সামনে পরিবহন গাড়ি গুলোর চালক ও হেলপার ডাকছে ভবেরচর ভবেরচর ১০০টাকা ১০০ টাকা। কিন্তু বৃদ্ধা আমেনার কাছে নেই সেই পরিমাণ টাকা যে তিনি বাসে করে বাড়ি ফিরবেন।
যা টাকা নিয়ে এসেছে তা ডাক্তার দেখিয়ে শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এখন কিভাবে ফিরবেন তাই নিয়ে তিনি চিন্তায় বসে পড়লেন টার্মিনালের গেটের সামনে। আর চিন্তিত অবস্থা মুখটা যেন তার মলিন হয়ে গেছে বৃদ্ধা আমেনা বেগমের। তার সাথে কথা বলে এমনটাই জানাযায়।
ঠিক একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরেক ৭৫ বয়সি বৃদ্ধা নুরজাহান। তার বাড়ি সুরেশ্বর। তিনি গত তিনদিন আগে নারায়ণগঞ্জের জালকুড়িতে আসেন ভাইয়ের মেয়ের বিয়েতে। ধুমধাম করে ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে উদযাপন করে আজই বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। সকাল সকাল বাড়ি ফেরার উদ্যেশ্যে লঞ্চ টার্মিনালে এসে হাজির হন তিনি। সাথে ছিলেন ভাগ্নি পারভীন আক্তার ও দুই নাতি।
কিন্তু এসে দেখেন লঞ্চ টার্মিনাল টিকেট কাউন্টার খোলা কিন্তু লঞ্চ চলাচল বন্ধ। তারা জানতেন যে দুর্ঘটনা ঘটেছে কিন্তু লঞ্চ যে বন্ধ তা তারা জানতেন না। এখন কীভাবে তিনি বাড়ি ফিরবেন তাই নিয়েই চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। অবশেষে বাস করেই সড়ক পথেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি।
অন্যদিকে দীর্ঘ বছর পরে বাপের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে লঞ্চ টার্মিনালে আসেন আরেক নারী আমেনা আক্তার। সাথে তার দশ বছরের মেয়ে মিম। সকলেই মেয়ে মিমকে নিয়ে আমেনা আক্তার বাপের বাড়ি চাঁদপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে লঞ্চ টার্মিনালে আসেন।
টার্মিনালে এসে থেকে লঞ্চ অনির্দিষ্টকালের বন্ধ। দীর্ঘদিন পরে বাপের বাড়িতে যাবেন লঞ্চ বন্ধ কথা শুনে যেন মুখটা মলিন হয়ে গেলেন আমেনা আক্তারেরও। আর মেয়ে মিম বারবার আমাকে বলছেন মা নানু বাড়ি যাব না মা নানু বাড়ি যাব না। ফলে শিশু মিমের নানু বাড়ি যাওয়া হলেও না । অবশেষে লঞ্চ বন্ধ থাকায় মেয়েকে নিয়ে আবারো শহরের বটতলার বাড়ীতেই ফিরে যান আমেনা আক্তার।
এদিকে লঞ্চ দূর্ঘনার কারনে বিআইডব্লিটিএ অনির্দিষ্টকালের জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে সকল লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ করে দেন। তবে লঞ্চ অনির্দিষ্টকালের বন্ধ থাকলে অনেক যাত্রীরা তা জানেন না। ফলে যারা প্রতিনিয়ত এখান দিয়ে নৌপথে চলাচল করেন এমন হাজার যাত্রী এসে আবারও ফিরে যাচ্ছেন। টার্মিনালের টিকিট কাউন্টার খোলা ছিল কিন্তু টিকিট বিক্রি বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালের শুল্ক প্রহরীর দায়িত্বে থাকা লিয়াকত হোসেন জানান অনির্দিষ্টকালের জন্য লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কখন তা আবারও চলবে তা আমাদের জানা নেই এগুলো উপরের সিদ্ধান্ত। উপর থেকে আবারো সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমরা কিছু বলতে পারব না।
কিন্তু আমাদের তো ডিউটি আমাদেরকে তো করতেই হবে। আর বন্ধ করতেও বলেনি তাই আমরা এখন খুলে বসে আছি কিন্তু আমরা টিকেট বিক্রি করছি না। সাময়িকভাবে অনির্দিষ্টকালের লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের আমরা বিকল্পভাবে বাড়ি ফেরার জন্য বলছি।
এদিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল থেকে সকল লঞ্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করেন বিআইডব্লিটিএ। নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধের নির্দেশনা দেওয়ার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতি নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার নেতারা। সোমবার (২১ মার্চ) দুপুরে লঞ্চ টার্মিনালে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের জেলা শাখার সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল। এবং এই দূর্ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। অনির্দিষ্টকালের লঞ্চ চলাচলের সিদ্ধান্তের প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।
প্রসঙ্গত, গত রোববার (২০মার্চ) দুপুর ২টা ২০মিনিটের দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট অংশে রুপসী-৯ নামে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় মুন্সিগঞ্জ গামী লঞ্চ আশরাফ উদ্দিন ডুবে যায়। পরে বিকেলে ঘাতক কার্গো জাহাজ রুপসী-৯ কে মেঘণাঘাট থেকে জাহাজের মাষ্টারসহ ৭জনকে আটক করে নৌ পুলিশ।
পরে সেমাবার সকালে নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিটিএ বাদী হয়ে বন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় আসামিদের বিকেলে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠালে আদালত তিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছের। পরে সোমবার (২১মার্চ) ভোরে লঞ্চটি উদ্ধার করেছে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়।


