একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে শান্ত খ্যাত শীতলক্ষ্যা নদীতে। লাশের মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। তারপরও টনক নড়ছে না কারও। তাইতো প্রশ্ন জেগেছে, আর কত লাশ পড়লে সেসব ক্ষমতাবানদের টনক নড়বে! কান্নাতো আর কম দেখা হলো না, সন্তানের জন্য মা-বাবার আহাজারী, স্বামীর জন্য স্ত্রী’র এবং স্ত্রী’র জন্য স্বামীর আহাজারী, ভাইয়ের জন্য বোনের এবং বোনের জন্য ভাইয়ের আহাজারী,
পিতা-মাতার জন্য সন্তানের আহাজারী, এত চিৎকার আর্তনাদ দেখেও কি তাদের বিবেক দংশণ হয় না? তাদের মনে হয় না এবার থামার প্রয়োজন। নয়তো এসব আর্তনাদ প্রকাশ করা নিরীহ সাধারণ আম-জনতা একবার প্রতিবাদী হয়ে উঠলে এসব বিকৃত মনের মানুষকে অস্তিত্ব সংকটে ভূগতে হবে। প্রতিবার দুর্ঘটনার সাথে সাথে আমাদের প্রশাসন কিছুটা তৎপরতা দেখালেও মাস না ঘুরতেই তা বেমালুম ভুলে যায় তারা।
এমনকি দুর্ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারা অদৃশ্য শক্তি বলে হয়তো পার পেয়ে যাচ্ছে, নয়তো প্রকৃত দোষীরা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। মাঝখান দিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে গো-বেচারা যাত্রীরা। বিভিন্ন সময় এসকল বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করলে, সূধী সমাজ কোন প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সেই একই জায়গায় থেকে গেল।
লোকবল সংকটের অযুহাতে তারা প্রতিনিয়তই বিষয়টিকে এড়িয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় মাঝি ও নদী পথের যাত্রীদের অভিযোগ তাদের যে লোকবল আছে তারাও যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতো তাহলেও এত লাশ গুনতে হতো না।
শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের প্রাণ। নারায়ণগঞ্জের খ্যাতির পিছনেও এই নদী ব্যাপক অবদান আছে। কিন্তু এই নদীটির কোন বিষয়েই মনে প্রাণে এগিয়ে আসছে না কেউ। নদীটি ব্যস্ততা অনুযায়ী অর্থাৎ নৌযান চলাচলের পরিমান অনুযায়ী এর প্রস্থতা খুবই কম। তারপরও শিল্প ও বাণিজ্যের কথা মাথায় রেখে এই নদী দিয়ে প্রচুর পরিমানে নৌ যান চলাচল করতে হয়।
তার উপর মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে এখন উৎপাত বেড়েছে বাল্কহেড নামক বালুবাহী জাহাজের। এর ফলে এই নদীটি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, একটি নিয়ম শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই বিষয়টিতে যেন প্রশাসন খুবই উদাসীন ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা নৌ যানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার কোন কার্যকর পদক্ষেপই নিচ্ছে না।
নৌ ট্রফিক পুলিশের বিরুদ্ধে এর পূর্বে একাধিক পত্রপত্রিকায় সংবাদ এসেছে যে, তারা ট্রলারে করে নৌ-যান নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে জাহাজ থেকে চাঁদা উঠার কাজে ব্যস্ত সময় পার করে বেশি।
গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রায় একই এলাকায় অর্থাৎ কয়লার ঘাট এলাকায় একটি লঞ্চ ডুবি ঘটনায় ৩৪জনের প্রাণ হানি ঘটে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বন্দর খেয়া ঘাট এলাকায় একটি কার্গোর ধাক্কায় একই সাথে দুইটি নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় একটি কলেজ ছাত্রীর নিহতের হয়। গত বছর বাল্ক হেডের ধাক্কায় নবীগঞ্জ-হাজীগঞ্জ ঘাটের ফেরিটিকে ধাক্কা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়।
এতে সেই ফেরিটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সব চেয়ে বড় যে বিষয় তা হলো, প্রত্যেকটি ঘটনায়ই ধাক্কা প্রদানকারী জাহাজটি খুব দ্রুত গতিতে চলে এবং অনেক দূর পর্যন্ত ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যায়। এখানে লঞ্চ থেকে যদি ধাক্কা প্রদানকারী ঘাতক জাহাজের গতি কম হয় তাহলে লঞ্চটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা খুব কম থাকে এবং ইচ্ছে করলেই দিক পরিবর্তন করে রক্ষা পেতে পারে।
কিন্তু প্রত্যেকটির ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বুঝা যায় যে এখানে অনেক দূর পর্যন্ত ঠেলে নেয়ার পরও ধাক্কা প্রদানকারী জাহাজের গতি কমেনি। কারণ ধাক্কা প্রদাকারি জাহাজের গতি কমলে কখনও সামনের লঞ্চ তলিয়ে যাওয়ার কিংবা ভারসাম্য হারানোর শঙ্কা খুব কম থাকে। অথচ প্রশাসন থেকে বারবার বলা হচ্ছে জাহাজের গতি বেশি হয় না।
অন্যদিকে হঠাৎ করেই কিন্তু সামনের লঞ্চটি আকাশ থেকে সামনে পড়ে না। ঘাতক জাহাজটি কিন্তু অনেক দূর থেকেই সামনে কি আছে দেখার কথা। তাছাড়া নবীগঞ্জ থেকে ধলেশ^রীর মোহনা পর্যন্ত যে জায়গাটুকু আছে এই এলাকাটি শীতলক্ষ্যা নদীর সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা এবং গত এক বছরে এই এলাকায়ই বেশি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। তাই এতটুকু জায়গায় বড় জাহাজগুলোকে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
এসব খালি জাহাজের সামনের অংশ খুব উচু থাকে তাই এই অংশে চলার সময় প্রথমত ধীর গতিতে চলতে হবে, দ্বিতীয়ত এই এলাকা দিয়ে চলার সময় সামনের অংশে জাহাজের স্টাফ রাখতে হবে নজরদারির জন্য।
কিন্তু এ ধরণের কোন সতর্কতাই এসব জাহাজের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। অন্যদিকে এগুলো নজরদারির দায়িত্বে যারা আছেন সারাদিন নদীতে থেকেও তাদের কখনও এ ধরণের কোন ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। অথচ এই দায়িত্ব তাদের প্রতিদিন করার কথা। কোন কারণে যদি একবার এধরণের দায়িত্ব পালনের ঘটনা ঘটে তাহলে তা প্রচারের মাধ্যমে সারা জীবনের পূজি হিসেবে ব্যবহার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যা বড়ই দু:খজনক।


