# নৌ-দুর্ঘটনায় বছরজুড়েই বহু মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ হচ্ছেন
# নৌ-দুর্ঘটনা রোধে আমরা সবাই সম্মিলিত ভাবে কাজ করছি: ডিসি
# লঞ্চের বিরুদ্ধেও আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে : বাবু লাল বৈদ্য
# সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককেই এর দায়বার নিতে হবে: নৌ ওসি
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌপথে একের পর এক ঘটছে লঞ্চ দুর্ঘটনা। নৌ-দুর্ঘটনায় প্রতি বছরই অনেক মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ হচ্ছেন। দুর্ঘটনার পর লোক দেখানো তদন্ত কমিটি, মামলা আর রুট পারমিট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলেও পরে আর আলোর মুখ দেখে না। ফের আবারও ওই লঞ্চ চলে, আর চালায় সেই অভিযুক্ত মাস্টাররা-ই। একের পর এক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটতে থাকায় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে,
কেন শীতলক্ষ্যায় এত নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। যদিও নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ-দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু শীতলক্ষ্যায় ঘটছে একের পর এক লঞ্চ দুর্ঘটনা, অথচ এর দায় নেয় না কেউ।
অভিযোগ রয়েছে, নদীপথে দুর্ঘটনার পর রুট পারমিট বাতিল, তদন্ত কমিটি গঠন ও মামলা দায়ের বিআইডব্লিউটিএ এর রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। তবে দুর্ঘটনা বন্ধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি এ সংস্থাটি। ফলে নৌপথে এখন প্রাণ হারানোর পাশাপাশি অঙ্গহানি হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
আর লঞ্চের বেপরোয়া গতির কারণেই গেল কয়েক বছরে এধরণের একাধিক নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ লঞ্চের যন্ত্রাংশই যেমন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে তেমনি তাদের নেই দক্ষ স্টাফ। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভে বিভাগের তদারকি প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্ঘটনায় শত শত প্রাণহানি হলেও লঞ্চডুবি রোধে নেয়া হয় না কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। ফিটনেস না থাকা, ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করাসহ কোনো ঘটনাতেই বিচার না হওয়ায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে। লঞ্চডুবির পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তবে এসব কমিটির সুপারিশ কখনো বাস্তবায়িত হয় না।
অথচ নৌ দুর্ঘটনা রোধে আইন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। রয়েছে কঠোর নজরদারির নির্দেশনা। এই অবস্থায় সবার সমন্বিত উদ্যোগ না থাকলে নৌপথে প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব নয়।
গত রোববার নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ রূপসী-৯ এর ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমএল আফসার উদ্দিন ডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।
এ ঘটনায় কার্গো জাহাজটির মাস্টারসহ (চালক) ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। কার্গো জাহাজ এবং ধাক্কায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের দুই চালকই বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শামীম বেপারী।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে বড় নৌ দুর্ঘটনাটি হয়েছিল ২০২১ সালে ৪ এপ্রিল এসকেএল-৩ মালবাহী জাহাজ শীতলক্ষ্যা ব্রিজের নিকট সাবিত আল-হাসান নামে যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ওই দুর্ঘটনায় ৩৪ জন লাশ হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সদরের কয়লাঘাট ও বন্দরের মদনগঞ্জ।
নিহত ৩১ জনের প্রতি পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দিয়ে কেটে পড়ে এসকেএল-৩ জাহাজের মালিকপক্ষ। তিনটি পরিবার সেই টাকা গ্রহণ না করে মামলা চালিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল গণমাধ্যমের কাছে। কিন্তু তত দিনে হারিয়ে গেছে সেই শোক। নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ রুটে এখনো নিয়মিত চলাচল করে যাচ্ছে ছোট ছোট লঞ্চ।
ঘটনার পর একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং সেসব কমিটি স্ব স্ব দপ্তরে প্রতিবেদনও জমা দেয়। সেখানে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হলেও তা আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। আর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও মামলার ফলাফল কী হয়েছে তা সাধারণ মানুষের কাছে অজানাই রয়ে গেছে। শুধু লঞ্চ নয়, প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দরের বাসিন্দাদের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌকা ও ট্রলার।
যাত্রী পারাপার করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। কখনো বাল্কহেড বা জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা, আবার কখনো উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলা। এভাবে প্রায়ই নৌ দুর্ঘটনা ঘটে শীতলক্ষ্যার বুকে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের তরফ থেকে স্থায়ী কোনো সমাধান আসেনি।
বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, লঞ্চ ও নৌযান গুলোর বেপরোয়া গতিতে চালানো, অদক্ষ জনবল এবং লঞ্চ ও নৌযান মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফালোভ নদীপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
মালিক পক্ষের প্রভাব প্রতিপত্তির কাছে বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারাও নতজানু। দুর্ঘটনায় নিরীহ যাত্রীদের প্রাণহানি, অঙ্গহানির ঘটনা ঘটলেও এর দায় নিচ্ছে না কেউ। বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাগণ একে অপরের দিকে দায় চাপাচ্ছেন।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ যুগের চিন্তাকে বলেন, শত শত বছরের নদী এই শীতলক্ষ্যা। ক্রমেই শীতলক্ষ্যা নদীর আকার ছোট হয়ে গেছে। এই নদী দিয়ে প্রচুর নৌযান চলাচল করে। ফলে শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রতিদিনই ছোট, বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে প্রতিবেদন দিচ্ছি । তবে ছোট-বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটুক আমরা তা প্রত্যাশা করি না। নৌ দুর্ঘটনা রোধে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করছি।
এবিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য যুগের চিন্তাকে বলেন, শীতলক্ষ্যা নদী দখল ও নদীর দুই পাশে অপিরকল্পিতভাবে নির্মিত বিভিন্ন শিল্প কারখানার কারণে নদীগুলো সংকুচিত হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার নৌযান চলাচল করে থাকে। বেপরোয়া গতিতে মাঝে মাঝে কিছু নৌযান চলাচল করে আর ফলে দূর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে।
আমরা একলা নৌযান গুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি এবং ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। তিনি আরও বলেন, নৌপথে কোন দূর্ঘটনা ঘটলে মামলা করার অধিকার শুধুমাত্র বিআইডব্লিউটিএর রয়েছে। আমরা বিআইডব্লিউটিএর পক্ষে থাকে সেই জাহাজ রূপসী- ৯ এর বিরুদ্ধে মামলা করেছি। কার্গো জাহাজ এবং ধাক্কায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের দুই চালকই বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছিলেন বলে
জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শামীম বেপারী তাহলে লঞ্চের বিরুদ্ধে কেনো আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এব্যাপারে তদন্ত করছি। লঞ্চেরও বেপরোয়া গতি ছিল। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদনের মিটিং এবিষয়টি উপস্থাপন করবো। লঞ্চের বিরুদ্ধেও আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান যুগের চিন্তাকে বলেন, দুর্ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট চালক, মাস্টার ও সুকানীর উপরই এর দায়ভার পরে। আর নৌযান গুলো ফিটনেসসহ যাবতীয় কাগজপত্র ও নদীর নাব্যতা ঠিক রয়েছে কিনা তা দেখবে বিআইডব্লিউটিএ। শুধু না নদীপথে ট্রাফিকিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও কিন্তুবিআইডব্লিউটিএ।
আর আমরা দেখবে আইনশৃংখলা বিষয়টি। নৌপথে দূর্ঘটনা রোধে নৌযান চালক, মাস্টার ও সুকানীকে আরও বেশী সর্তক থাকতে হবে। তাঁরা সতর্ক হলে নৌ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকেই এর দায়বার নিতে হবে। নারায়ণগঞ্জ মালিক সূত্রে জানাগেছে,গত ২০২২ সালের ২০শে মার্চ নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে কয়লা ঘাট এলাকায় মালবাহী জাহাজ এম.ভি. রূপসী-৯ পিছন থেকে যাত্রী বাহী এম.এল. আফসার উদ্দিন লঞ্চকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়।
২০১১ সালে মদিনা আলো এক্সপ্রেস লঞ্চকে নারায়ণগঞ্জ কয়লাঘাট এলাকায় মিনি ট্যাংকার ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। ২০১৩ সালে এম.এল. সারস লঞ্চকে চর কিশোরগঞ্জ এলাকায় বালুর বাল্কহেড ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। লঞ্চকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। এম.ভি. শরিয়তপুর লঞ্চকে ৬ থেকে ৭বছর পূর্বে মালবাহী কোস্টার ষাটনল ঘাটের পশ্চিম পাড়ে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। প্রায় ২০ বছর পূর্বে এম.এল, ডায়না, আজমেরী, সাখাওয়াত লঞ্চকে কার্গো জাহাজ ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়।


