নৌ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু
লতিফ রানা
প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২২, ০৫:৫৬ পিএম
# সেতু নিচের তিনটি পয়েন্টের দুইটিই অকেজো
# বিষয়টি সম্পর্কে আমার বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নেই : জেলা প্রশাসক
# কেন্দ্রীয় মিটিংয়ে উপস্থাপন করব : উপ-পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ
# চ্যানেল বাড়ানো গেলে দুর্ঘটনার অনেকটাই কমে যাবে: নৌ ওসি
# নকশা আগে বিষয়টি ভাবা দরকার ছিল: আমির হোসেন স্মিথ
শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের প্রাণ। নারায়ণগঞ্জের সুনাম, খ্যাতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রশ্নে সবার আগে যে নামটি উঠে আসে তা হলো শীতলক্ষ্যা নদী। এমনকি নারায়ণগঞ্জের জন্মও এই শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে। এক সময় দেশ জুড়ে যার সুনাম ছিল শান্ত নদী হিসেবে। সেই শান্ত ও বহুগুণের অধিকারী এই শীতলক্ষ্যা হঠাৎ করেই যেন একটু বেশি অশান্ত হয়ে পড়েছে, একের পর কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ।
বিশেষ করে খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে নদীর দক্ষিণ সীমান্তে সংঘটিত বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা প্রাণ হানির ঘটনাসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দুর্ঘটনাগুলো নির্মণাধীন ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু সংলগ্ন এলাকায় হওয়ায় এবং সেতুর মাঝখানে খুটি তৈরির পর পর একাধারে কয়েকটি দুর্ঘটনা হওয়াতে এই সেতুকে জড়াচ্ছেন অনেকে।
এর আগে গত বছরের ৪ এপ্রিল সাবিত আল হাসান নামের একটি লঞ্চ ডুবির ঘটনায় ৩৪ জন প্রাণ হারালে বিষয়টি তদন্তকালে এই সেতুর নকশা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। তবে সে নকশার কোন অংশ পরিবর্তন বা মেরামত না করেই শেষ হচ্ছে সেতুর নির্মাণ কাজ। এর আগে এ বিষয় কথা বললে নৌ পুলিশের পরিদর্শক মনিরুজ্জামান বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীটি খুবই সরু।
সেই অনুযায়ী এখানে নৌ যান চলাচল অনেক বেশি। এখানে যদি নৌ যান চলাচলের জন্য চ্যানেল বাড়ানো যায় তবে নদী পথের এসব দুর্ঘটনার অনেকটাই কমে যাবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যে ৪টি খুটির উপর মূল সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে তার ২টি খুটি নদীর মাঝখানে এবং বাকি দুটি নদীর দুই পারে অবস্থিত। এই চারটি খুটির মাধ্যমে নদীটিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এর ফলে শুস্ক মৌসুমে নদীর মাঝখানের যে দুটি খুটি আছে শুধুমাত্র সে দুটি খুটির মাঝখানের পয়েন্ট দিয়েই লঞ্চ, বাল্কহেডসহ বড় বড় জাহাজগুলো চলাচল করতে পারে।
বাকি যে দুটি পয়েন্ট আছে তার মধ্য দিয়ে এসব যান চলাচলের কোন সুযোগ থাকে না। ফলে এই সেতুর কাছাকাছি আসার পর প্রত্যেকটি নৌযানের মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগে কে আগে এই পয়েন্টে প্রবেশ করতে পারে। যার কারণে এই অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। সেতুটির দক্ষিণাংশে মোহনা থাকায় সেখানে নদীর প্রশস্ত বেশি কিন্তু সেতুর উত্তরাংশে নদীর প্রশস্ত খুবই কম।
সেতু সংলগ্ন এলাকায় নদীর প্রশস্ত প্রায় ২২০ মিটার মাত্র। দুইটি খুটির বেজ আবার প্রায় ১৮ মিটার করে ৩৬ মিটার জায়গা দখল করে নিয়েছে। যার ফলে মাঝখানের পয়েন্টে ফাঁকা জায়গা আছে প্রায় ৭০ মিটারের মতো।
এর দুই পাশে যে দুটি পয়েন্ট আছে শুস্ক মৌসুমে সেখান দিয়ে ক্ষুদ্র যান ছাড়া বড় যান এমনকি লঞ্চ চলাচলের জন্যও উপযুক্ত না। ফলে এখানে সামনে কোন লঞ্চ বা ছোট যান থাকলেও পেছন থেকে বড় লাইটার জাহাজ, কার্গো বা বাল্ক হেডগুলো স্পীড বাড়িয়ে চেষ্টা করে সেই পয়েন্টে আগে পৌছতে ফলে বিপদে পড়ে ছোট জাহাজ, প্রাণ হারায় নিরীহ জনগণ।
বিভিন্ন ঘাটের মাঝিসহ যাত্রীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, উত্তর দিক থেকে আসা যানগুলোর বেশিরভাগই খালি থাকে বলে সামনের অংশ অনেক উচু থাকে। যার ফলে কাছাকাছি চলে আসার পর সামনের যানগুলো আর দেখা যায় না। এ ছাড়াও তারা সামনে বিশেষ মনযোগের সাথে খেয়ালও রাখে না। তার উপর যখনি নবীগঞ্জ ঘাট এলাকার কাছাকাছি আসে তখন থেকেই তাদের মধ্যে একটি ধারণা চলে আসে কে কার আগে সামনের সেতুর মাঝখান পয়েন্টের প্রবেশ করবে ফলে এর মধ্যে কয়েকবারই ফেরির সাথে বাল্ক হেডের ধাক্কা লাগে।
কিছুদিন আগে জাহাজের ধাক্কায় একই সাথে দুটি নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটে এবং একজন কলেজ ছাত্রীর মৃত্যু হয়। একই কারণে গত বছরের লঞ্চ ডুবিতে ৩৪ জন নিহত এবং এবার লঞ্জ ডুবিতে সর্বশেষ ১১জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
নারায়ণগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএ এর উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বাবু লাল বৈদ্য বলেন, ‘আগামী ২৮ মার্চ ঢাকা বিআইডব্লিউটিএ’র হেড অফিসে আমাদের একটি মিটিং আছে। সেই মিটিংয়ে আমরা সেতুর দুই পাশের দুটি পয়েন্টের ড্রেজারিংয়ের বিষয় আলাপ আলোচনা করব, এই বিষয়টি উপস্থাপন করব।’
এবিষয়ে জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘এই বিষয়টি সম্পর্কে আমার যেহেতু বৈজ্ঞানিক কোন জ্ঞান নেই, তাই আমি এই বিষয়ে কোন মতামত বা পরামর্শ দিতে পারবো না। বিষয়টি বিআই ডব্লিউটিএ বলতে পারবে।’
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন স্মিথ জানান, ‘সেতু করার আগে সেতুর যে নকশা আছে সেই নকশা করার সময় সেতুর নিচ দিয়ে নৌযান চলাচল করার সুব্যবস্থা আছে কি না সেটি আগে নির্ণয় করার প্রয়োজন ছিল। মদনগঞ্জের কয়লা ঘাট এলাকায় যে ৩য় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে সেটির ক্ষেত্রে এসব নিয়ম কানুন মানা হয়নি।
এর ফলে সেতুর কাছাকাছি জায়গায় বড় বড় দুটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে সরকারকে আবারও নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ থেকে এর আগে জরিপ চালানো হয়েছে। গতবছর সাবিত আলা হাসান লঞ্চ দুর্ঘটনার পর নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল এর নকশায় ত্রুটি আছে।
সেই ত্রুটি মেরামত না করে সেটি রেখেই নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এর আগে এক প্রেস কনফারেন্সে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, কয়লা ঘাটে যে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে সেতুটির নকশায় ত্রুটিপূর্ণ। সে কারণেই সাবিত আল হাসান লঞ্চটির দুর্ঘটনা ঘটেছে। এবারের যে দুর্ঘটনা সেটিও একই কারণে হয়েছে।’


