# ধর্ষণের ঘটনা বাড়ায় উদ্বেগ
# ধর্ষণের ঘটনা বাড়ার মূলে মাদক: খন্দকার শাহ্ আলম
# পারিবারিক ও অবৈধ সম্পর্কের কারণেই এগুলো হচ্ছে: এডি.এসপি
নারায়ণগঞ্জে দিন দিন বেড়েই চলেছে ধর্ষণ। ধর্ষণ যেনো থামছেই না। সম্প্রতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সামাজিক অপরাধ ধর্ষণ। ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত অনেকে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হলেও এসব দেখেও টনক নড়ছে না অপরাধীদের।
পথে-ঘাটে, যানবাহনে এমনকি সুরক্ষিত বাসাবাড়িতে ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী-শিশুরা। শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রতীক একজন শিক্ষকের কাছেও ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কোথাও আর নিরাপদ থাকতে পারছে না নারী-শিশুরা। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছেই। সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে ধর্ষণের ঘটনা।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি না হওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, মামলা নিয়ে প্রভাবশালীদের নানা হয়রানি ও তদন্তে গাফলতিসহ বিভিন্ন কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। ধর্ষণ এখন সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাধি রোধ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন কৌশলে পুলিশ,রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটছে।
লোকলজ্জার ভয়, মামলা করতে গিয়ে হয়রানি, প্রভাবশালী মহলের হুমকি এবং কঠোর শাস্তি না হওয়ার কারণে আসামিরা নানা কৌশলে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারা মনে করেন সমাজে সংস্কৃতি চর্চা না থাকায় এবং সুস্থ সামাজিকীকরণের চরম অভাবেই এমন অপরাধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ জাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে খুব স্বল্পসময়ে তথা দ্রুত বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা গেলেও অপরাধ কমে আসবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রবণতা বাড়াতে হবে।
জানা গেছে, গত ২০মার্চ বন্দরে গার্মেন্টসকর্মী এক যুবতীকে বিয়ের প্রলোভনে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ অভিযুক্ত সহকর্মী সাকিলকে গেপ্তার করে। মামলা নং ২৯(৩)২২ইং। অভিযুক্ত সাকিল বন্দর উপজেলা দশদোনা গ্রামের শাহজাহান মিয়ার ছেলে। গত ২১ মার্চ ফতুল্লায় এক গার্মেন্টস কর্মীকে রাত ভর আটকে রেখে গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ পুলিশ অভিযুক্ত তিন ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে।
গত ২০মার্চ রাত ১২টায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় লিংক রোডের নির্মিতব্য ড্রেন থেকে অজ্ঞাত নারীর বিকৃত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ১৯মার্চ বন্দরে রাতে নানার বাড়িতে বেড়া গিয়ে ১৫বছরের এক কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। সকালে ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে লম্পট আলমগীর ও তার সহযোগী রকিকে আসামী করে বন্দর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এ মামলা দায়ের করেন তিনি।
মামলা নং ২৯(৩)২২। গত ১৮মার্চ ফতুল্লায় রাতে তরুণীকে ধর্ষণের চেস্টার অভিযোগে তিন লম্পটকে গ্রেফতার করেছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলো ফতুল্লা থানার দেওভোগ মাদ্রাসার খোকা মিয়ার ভাড়াটিয়া পারভেজ মিয়ার পুত্র তুহিন (২০), একই এলাকার আনিসুল রহমান হিরার ভাড়াটিয়া মৃত কফিল উদ্দিনের পুত্র রুবেল (২১) ও পারভেজ মিয়ার ভাড়াটিয়া ইউসুফ মিয়ার পুত্র ফারুক মিয়া(৩২)।
গত ১৪মার্চ রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের পূর্বগ্রাম এলাকায় শহিদুল ইসলাম (৪৩) নামের এক যুবক হত্যার ঘটনায় স্ত্রী কামরুন্নাহার (৩৫) ও শ্বশুর আব্দুল কাদিরকে (৬০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রূপগঞ্জের চনপাড়া পূনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা মৃত কুব্বত আলীর ছেলে শহিদুল ইসলামের সঙ্গে পূর্বগ্রামের আব্দুল কাদিরের মেয়ে কামরুন্নাহারের বিয়ে হয়ে।
গত ১৫মার্চ বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রুপগঞ্জের (১৮) বছরের এক তরুনী গার্মেন্ট কর্মীকে মোবাইল ফোনে ডেকে এনে গণধর্ষণ করে নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৩মার্চ ফতুল্লায় অনার্স পড়ুয়া এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানীর অভিযোগে শোভন (১৮) নামক এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃত শোভন ফতুল্লা থানার শিয়াচর তক্কার মাঠস্থ ইসকস্ট গার্মেন্টস সংলগ্ন আঃ মতিন মিয়ার পুত্র। গত ১০মার্চ বন্দরে খালার বাড়িতে বেড়াতে এসে কিশোরগঞ্জের (১৯) বছরের এক যুবতী গনধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনার ৩ দিন পর ১০ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধর্ষিতা নিজেই বাদী হয়ে একজনের নাম উল্লেখ্য করে ও ৫ জনকে অজ্ঞাত নামা আসামী করে বন্দর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং ১৪(৩)২২।
গত ৩মার্চ প্রাইভেট পড়তে গিয়ে শিক্ষিকার স্বামী কর্তৃক বন্দরে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষনের ব্যার্থ চেষ্টা চালানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বন্দর উপজেলার বালিয়াগাও এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটে। গত ২মার্চ বন্দরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক গার্মেন্টস কর্মীকে দিনের পর ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে লম্পট রকি (৩০)'র বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত রকি থানার এনায়েত নগর এলাকার শাহ আলম মিয়ার ছেলে। মামলা নং ১(৩)২২। ফতুল্লায় অন্তঃসত্ত্বা নারীকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় নিহতের মা রেহেনা বেগম বাদী হয়ে নিহতের স্বামী সোহেল আহম্মেদ অপু (৩৮) সহ অজ্ঞাত নামা আরো ২/৩ জনকে আসামী করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
নিহত রাবেয়া বেগম (৩৫) ভোলা জেলার দক্ষিন আইচা থানার তাল্লুক কান্দা গ্রামের তোফাজ্জল সিকদারের মেয়ে। সে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ফতুল্লার হরিহর পাড়া শান্তিনগরস্থ সেলিম মিয়ার বাড়ীর ভাউাটিয়া বাসায় বসবাস করেন।
এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে কর্মরত এক কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছে এক নারী (২৩)। অভিযুক্ত কারারক্ষী জামালপুর জেলার সদর থানার ঝাউলা গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর পুত্র কাজিমউদ্দিন (৪৮)। সে নারায়নগঞ্জ জেলার কারারক্ষী বলে জানা যায়।
এবিষয়ে নারায়ণঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দার শাহ্ আলম যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণ বেড়েছে এর পিছনে মূলেই হচ্ছে মাদক। যখনই একটা মানুষ নেশাগ্রস্থ হকেয় যায় তখন সে আত্নীয়- স্বজন, মা বোন কিছুই চিনে না। মাদকাশক্তের কাছে কেউ নিরাপদ না। এঘটনা গুলোকে কেন্দ্র করে তার কি হতে পারে জেল এবং মৃত্যুদন্ড এমনকি ফাঁসিও হতে পারে এই গুলো তার মাথায় খেলে না।
কারণ সে তো নেশাগ্রস্থ। গোটা নারায়ণগঞ্জেই মাদকের সয়লাব হয়ে গেছে। মাদক গোটা সমাজটাকে শেষ করে দিচ্ছি। এলাকায় এলাকায় পাড়ায় পাড়ায় মাদক বিক্রি হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জকে মাদক মুক্ত করতে পারলে খুন, রাহাজানী, ছিনতাই ও ধর্ষণ কিছুই কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, মাদকের যারা মূলহোতা যারা এই জেলায় বিপুল পরিমাণে মাদক আনে বিক্রি করছে তাদেরকে মাদকের চালানসহ মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করতে হবে।
যদি এই মাদক বিক্রি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সমাজ থেকে এসকল অপরাধ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। এসকল কিছুর পিছনের কারনই হলো মাদক। আর মাদক নিরাময় করার একমাত্র রাস্তাই হচ্ছে পুলিশ প্রশাসন যদি শক্ত হয় তাহলেই মাদক নিরাময় সম্ভব হবে। এছাড়া মাদক নিরাময় করা সম্ভব নয়।’
এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. আমির খসরু যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘পারিবারিক ও অবৈধভাবে সম্পর্কের কারনেই এগুলো হচ্ছে। প্রথমে দেখা যায় সর্ম্পক করে এরপর বিয়ে না করলেই ধষর্ণের অভিযোগ করে থানায় মামলা করে। আমরা ধর্ষণের প্রতিটি অভিযোগ নিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান করছি। আদালত থেকে জামিন নিয়ে আসামিরা বের হয়ে যায়।
সকল রোধে সবাইকে সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে। তিনি আরও বলেন, মাদক ,সন্ত্রাস ও ধর্ষণ রোধে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ প্রশাসনও কিন্তু কাজ করছে। নারায়ণগঞ্জে মাদকের যে বড় আড্ডা ছিল সেই চাঁনমারী বস্তি কিন্তু আমরা উচ্ছেদ করে দিয়েছি। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। প্রতিদিনই আমরা কিন্তু মাদক উদ্ধার করছি। আর মাদক, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।’


