Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

আজ ২৫শে মার্চ কালরাত্রি

Icon

করীম রেজা

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২২, ০৬:০৯ পিএম

আজ ২৫শে মার্চ কালরাত্রি
Swapno

আজ ২৫ শে মার্চ, ফিরে এলো সেই রাতের ভয়াল স্মৃতি। ১৯৭১ সনে পাকিস্তানিরা এক নজিরবিহীন বাস্তবতা হাজির করে বিশ্ব সভ্যতায়। লাঞ্ছিত মানবতা, নিষ্ঠুর বর্বরতা, ধর্মের নামে গণহত্যা শুরু  করে পাকিস্তানিরা ৭১ সনের এই রাতে।  নারী-শিশু, বৃদ্ধ, রিক্সাওয়ালা, ছাত্র, ফেরিওয়ালা, পুলিশ, বিডিআর, সাধারণ মানুষ কেউ বাদ যায়নি পাকিস্তানিদের হত্যার উৎসব থেকে।

 

এমনকি প্রাণহীন ইট লোহার কাঠামো শহীদ মিনারও ট্যাংক দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। আক্রমনের আগ থেকে ইয়াহিয়া, ভুট্টো,  মুজিব আলোচনা চলছিল। এখন পরিস্কার যে, মূলত সেই আলোচনা ছিল লোক দেখানো প্রহসন মাত্র। আলোচনার কয়েকদিন আগে থেকেই পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের বিমানে করে গভীর রাতে সিভিল পোশাকে সেনাবাহিনী আনা হচ্ছিল তেজগাঁ বিমান বন্দরে।

 

অন্যদিকে এম ভি সোয়াত ও অন্যান্য  জাহাজে করে চিটাগাং বন্দর এর মাধ্যমে আনা হচ্ছিল অস্ত্র। সে অস্ত্র খালাস করতে বন্দরের বাঙালি শ্রমিক অস্বীকার করেছিল, বাধা দিয়েছিল। ২৫ তারিখ গভীর রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামের নীলনকশায় মানুষ হত্যার উৎসব শুরু করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তার আগে গোপনে বিদায় নিয়েছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, টিক্কা খানকে গণহত্যা শুরুর নির্দেশ দিয়ে।

 

অন্যদিকে ভুট্টো রয়ে গেল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। নিজের চোখে বাঙালি নিধন চাক্ষুষ করার ইচ্ছায়। যে সমস্ত বিদেশী সাংবাদিক মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনার সংবাদ সংগ্রহের জন্য সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিল তাদের সবাইকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে জোরপূর্বক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন বিদেশী সাংবাদিক আত্মগোপন করে থেকে গিয়েছিলেন ।

 

তিনি সেই নৃশংস রাতের বর্ণনা  বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন ঢাকা থেকে ফিরে গিয়ে। মার্চের ২৫ তারিখের আগে থেকেই সাধারণ মানুষের মনে  প্রবল উত্তেজনা ও আগ্রহ। কিন্তু ২৫শে মার্চের বিকেল গড়াতেই ঢাকা শহরে তথা সারা দেশের মানুষের মনে উদ্বেগ, আতঙ্ক। চারদিকে থমথমে অবস্থা।একটা কিছু বিপদের আশঙ্কা । কেমন বিপদ তা ধারণা করা ছিল কঠিন।

 

রাত বারোটায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একযোগে আক্রমণ করেছিল  রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা বিডিআর হেডকোয়ার্টার, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের  স্টাফ কোয়ার্টার, কর্মচারীদের কোয়ার্টার, জগন্নাথ হল এবং এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। তাদের  আক্রমণের লক্ষ্য থেকে বাদ যায়নি রিক্সার পাদানিতে ঘুমিয়ে থাকা রিক্সাওয়ালা, ঠেলা গাড়ির নিচে ঘুমিয়ে থাকা চালক, রাস্তার ভিখিরি।

 

কেউ পাকিস্তানিদের গুলির আঘাত থেকে বাঁচেনি। জগন্নাথ  হলের ছাত্রদের নির্মমভাবে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। হলের মাঠেই গর্তে তাদের মাটি চাপা দেয়।  উল্টোদিকের বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার দালান থেকে একজন ভিডিও ক্যামেরায় রেকর্ড করেছিলেন।  কিন্তু নৃশংসতার ভয়াবহতা  ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখেও বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেননি।

 

সূর্যসেন হলের এক ছাত্রকে গুলিতে  আহত করে, পা ধরে টেনে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিতে থাকে। ওই অবস্থায় প্রতি ধাপে তার মাথা বারি  খেতে খেতে একসময় ফেটে যায়। মস্তক ছিটিয়ে পড়তে থাকে সিঁড়িতে। সেই নৃশংস স্মৃতি বাঙালি  জাতি কোনদিন ভুলতে পারবে না। ২৫শে মার্চ ফিরে এলেই বাঙালির হৃদয় পোড়ে, চেতনার দীপ জ্বলে।

 

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উঁচু পর্যায়ের অফিসার অনেকেই এই আগ্রাসনের স্মৃতি নিয়ে পরবর্তীকালে বই  লিখেছেন। সে সব বইতে নিজেদের নির্দোষিতা প্রমানের আড়ালেও বর্ণনা দিতে গিয়ে রেখে ঢেকে যা  বলেছেন,  নিষ্ঠুরতা নির্মমতার মাত্রা তাতে ঢাকা পড়েনি।  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মচারীদের হত্যা  করেছে । জগন্নাথ হলের হিন্দু ছাত্রদের হত্যা করেছে।

 

ট্যাংকের গোলা মেরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার  মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। কোনরকম প্রতিরোধ যাতে করতে না পারে সেজন্য আগেই বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করা হয়েছিল। অফিসারদের ঢাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে ঢাকার বাইরে কিংবা পশ্চিম  পাকিস্তানে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। সেদিন রাতে ভুট্টো ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের জানালা দিয়ে জ্বলতে দেখা ঢাকা শহর, আর মুহুর্মুহু বন্দুক-কামানের তোপধ্বনি শুনে,

 

একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিল,  ‘পাকিস্তান রক্ষা পেল’। বাকিটুকু ইতিহাস। ইয়াহিয়া, ভুট্টোর নীলনকশায় বাঙালি নিধনযজ্ঞের শুরুতে ২ শে মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের  স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ইংরেজি তারিখ গননার সুবাদে ২৬ মার্চ তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস।

 

হত্যাযজ্ঞের মাত্রা যাতে না বাড়ে তাই তিনি স্বেচ্ছায় পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দেন। ২৫শে মার্চ  ইতিহাসের জঘন্যতম দিন, মানবরূপী পশুদের চিনে নেয়ার দিন। বাঙালির আত্মপরিচয় নতুন করে  উদ্বোধনের দিন। আত্মগৌরব সমুন্নত রাখার প্রতিজ্ঞা গ্রহণের দিন।  করীম রেজা, সাবেক অধ্যক্ষ ।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন