২৬ শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা করেন। ইংরেজি বা ইউরোপীয় তারিখ, সময় গণনার হিসেব মতে ২৫ তারিখ মধ্যরাত ২৬ তারিখ হিসেবে গণ্য। তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ শে মার্চ। ২৫ শে মার্চ নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত গণহত্যার পরপরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বস্তুত একটি জাতির স্বাধীনতার পেছনে বৃহৎ কল্যাণমুখী আকাঙ্ক্ষা থাকে। মানবতা, মানুষের অধিকার, সবকিছুই সমুন্নত রাখার ব্যবস্থা অগ্রাধিকারে থাকে। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা বিবৃতিতেই বাঙালি জাতির সামগ্রিক মুক্তির এবং কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর স্বপ্ন ছিল, চেষ্টা ছিল সোনার বাংলা রূপে দেশ গড়ে তোলার।
ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশের জনগণ, সরকারি কর্মচারী, আমলা, রাজনৈতিক কর্মী, সবাই দেশ গঠনে তাঁর মতো করেই ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তাঁর নির্মম হত্যার পরে অর্জিত স্বাধীনতার গতিপথ পাল্টে যায়। পাল্টে যাওয়ার কারণে সেই একাত্তরের ধারণায় তৈরি হয় বিভ্রান্তি। একজন মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি দেশের মানুষের ধ্যান-ধারণা বদলে দেবার চেষ্টা করে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা নানা কারণে অথবা কোন কারন ছাড়াই দলবাজিতে অংশগ্রহণ করে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে।
দীর্ঘদিন পরে তারা ক্ষমতাচ্যুত হলে স্বাধীনতার মূল চালিকাশক্তির ধারাবাহিকতা আবার শুরু হয়। আমলাদের কাজকর্মের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু খুব সচেতন ছিলেন। তিনি চেষ্টা করেছেন লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনার। আজকের বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সেই প্রচেষ্টা এগোতে ব্যর্থ । আমলা সমাজ কর্তব্য পরায়নের বদলে ক্রমশই কর্তৃত্বপরায়ন হয়ে উঠেছে।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে আমলাদের যে ভূমিকা থাকার কথা ছিল, তা দেখা যায় না। যেমন আমলারা তাদের সুবিধা অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ করছে। বাস্তবায়নে অযথা সময়ক্ষেপন করছে। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে, বাড়ছে জনগণের ভোগান্তি। ভুলে ভরা, দায়সারাগোছের নকশা দিয়ে কাজ হচ্ছে। কোনও দায়বদ্ধতা নেই। রাজনীতি কর্তৃত্ববাদী হওয়ার পেছনে আছে নানা রকম কারণ।
আমলাদের আছে এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ও উদ্দেশ্য। সমাজে আজ তোষামোদের সংস্কৃতির ছড়াছড়ি। তোষণবাদী কখনোই মেরুদন্ড সোজা রেখে জনস্বার্থে জনগণের সুবিধার জন্য কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তোষণের একমাত্র উদ্দেশ্য ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করা। বর্তমানে আমলা গোষ্ঠী এতই শক্তিশালী হয়েছে যে, নিজেরাই নিজেদেরকে আইনি, বেআইনি, বৈধ, অবৈধ উপায়ে ক্ষমতাবান বানাচ্ছে।
যোগ্য ব্যক্তির উন্নতির পথে বাধা , ক্যাডার বিভাজন, আর্থিক সুবিধা বিভাজন করে এক বিভেদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। তাদের আচরণ দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না স্বাধীনতার অর্থ তাদের কাছে খুবই সংকুচিত। নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধিই তাদের কাছে স্বাধীনতা। তোষণ ও তুষ্টি বাদী ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে না আসলে রাজনীতি জনকল্যাণমুখী হতে পারে না।
স্বাধীনতার মূল্যবোধ আমলা ব্যবসায়ী সমাজের কারসাজিতে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জনতার কণ্ঠস্বর আজ আর উচ্চকিত নয়। আমলা ব্যবসায়ী যৌথ ভাবে বলা যায় রাজনৈতিক মাঠ দখল করেছে। প্রকৃত রাজনীতিবিদ গুরুত্বহীন চরিত্রে পরিণত । এইভাবে স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণ কখনোই পাবে না।
আমলাদের সামগ্রিক আচরণ বিবেচনা করলে তাদের মধ্যে এক ধরনের জমিদারি মানসিকতা দেখা যায়। কাজে, কথায়, ব্যবহারে, অফিস-আদালতের পরিবেশে তাদেরকে আজ নব্য জমিদার শ্রেণী বললে অত্যুক্তি হবে না। শান শওকত, আর্থিক সুবিধা তারা নানা কৌশলে বৃদ্ধি করছে। কিন্তু জনগণের নাভিশ্বাস তাদের নজরে পড়ছে না।
প্রাত্যহিক জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে ঠুনকো অজুহাতে যে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। যদি তাই হত তাহলে টিসিবির লাইন এত দীর্ঘ হত না। সবকিছুর দাম বাড়িয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমিয়ে আনার মানসিকতা কোনও ভাবেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীনতার সুফল সোনার বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে।
নিজের সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যবাদী আমলাদের দিয়ে সোনার বাংলা গঠিত হবে না। শিক্ষাব্যবস্থা আজ বিসিএস মুখী। প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা হারিয়ে যেতে বসেছে। দায়িত্ব নিয়ে কেউ কাজ করে না সবাই উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর জন্য দিনরাত ব্যস্ত। তোষামোদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দায়িত্ব না নিয়ে যেকোন বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা।
একজন মুখ খুললেই তারা শতমুখে শত কথা বলা শুরু করে। সবকিছু দেখে সাধারণ মানুষ আজ প্রতিক্রিয়াহীন। সেই ৫২,৬৮,৬৯,৭১এর মতো সাধারণ মানুষ নিজ অধিকার, দাবীর আওয়াজ তোলে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনা। এই অচলায়তন ভেঙ্গে ফেলেই জাতির মুক্তি অর্জন, স্বাধীনতার প্রকৃত সূফল অর্জন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সফল হবে।
দেশের সুনাম বাইরের দেশগুলোতে অনেক আছে কিন্তু পাশাপাশি অনেক বদনামও। সেই বদনাম ঘোচাতে দরকার নতুন মন মানসিকতার আমলা। দেশ গঠনে আমলাদের কল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নাই। স্বাধীনতা দিবসে সকলের মনে দেশপ্রেমের সুচেতনা জাগ্রত হোক। করীম রেজা, সাবেক অধ্যক্ষ, শধৎরসৎবুধ৯@মসধরষ.পড়স


