মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য রোজার ফজিলত ও গুরুত্ব অনেক। ইসলাম ধর্ম যে পাঁচটি মূল ভিত্তির (স্তম্ভ) উপর দাঁড়িয়ে অর্থাৎ কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত এই পাঁচটির মধ্যকার একটি হলো রোজা। প্রতিবছর আরবী হিসেবে নির্দিষ্ট একটি মাসকে রোজার জন্য নির্ধারণ করা হয়, যা রমজান মাস হিসেবে পরিচিত।
মুমিনদের জীবনে এই ১ মাসের জন্য ত্যাগ, তিতিক্ষা, ক্ষয়, অবক্ষয় ও আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে এই মাহে রমজানের আগমন ঘটে। এই রমজান মাসের আগমণ ঘটে আত্মশুদ্ধি, সংযম, সাধনা, সাম্য, সহানুভূতি ও আল্লাহ ভীতির উদাত্ত আহবান নিয়ে। মুসলিম ধর্মীয় মতে এই রজমজান মুসলিমদের জন্য অফুরন্ত রহমত, মাগফিরাত ও দোযখ থেকে মুক্তির পয়গাম নিয়ে আসে
মুমিনরা শুধু এক অদৃশ্য শক্তির ভয়ে এ সময় অন্য সব পাপ কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে সৎ ও ন্যায় পথে নিজেকে পরিবেশিত করে। এ সময় মানুষ প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করার সাথে সাথে ক্ষুধা-তৃষ্ণাসহ শত কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর বিধিনিষেধ মেনে চলার মাধ্যমে এবং তারই নির্দেশে কাম-ক্রোধের বেলায় সংযম অবলম্বন করে যাবতীয় অশ্লীল ও অসামাজিক কাজ থেকে বিরত থাকবে।
একই সাথে এবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি অবাধ ভালবাসা ও প্রেম তৈরি করবে। যার মাধ্যমে মুমিনগণ ইহজীবনে শান্তি, কল্যাণ এবং পারলৌকিক জীবনে নাজাত লাভ করার তৌফিক লাভে করবে। পবিত্র কুরআন মাজিদের ভাষায় ‘রামাদান’ যার অর্থ হলো দাহ, উত্তাপ, দহন, সূর্যের প্রখর তাপে উত্তপ্ত মাটি ইত্যাদি।
স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-‘সিয়াম হলো আমার জন্য এবং এর ফলাফল আমি নির্ণয় করব’। রমজান মাস এতই পবিত্র যে, যে ব্যক্তি রমযানে একটি ফরজ কাজ করবে সে অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজ কাজের ছওয়াব পাবে।
ইসলাম ধর্মানুসারে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ২য় হিজরিতে তার প্রিয় উম্মতের ওপর রোজা ফরজ করা হয়। তবে এই রোজা যে শুধু ইসলাম ধর্ম প্রচারের পরই শুরু হয় তা নয়। পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের ওপরও রোজার বিধান ছিল। হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত নূহ (আ.) পর্যন্ত প্রত্যেক উম্মতের ওপরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে রোজা পালনের হুকুম ছিল।
মূসা (আ.)এর তুর পাহাড়ে অবস্থানের স্মৃতিচারণে তাদের জন্য ৪০ দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। ইহুদিরা প্রতি সপ্তাহে শনিবার আর মহররম মাসের ১০ তারিখে রোজা পালন করত। খ্রিষ্টানদেরও ৫০ দিন রোজা পালনের রেওয়াজ ছিল।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও একাদশী উপবাস পালন করে থাকেন। ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী অনুযায়ী এই রোজাকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। রোজা রাখার কারণে ধনীরাও দরিদ্যদের কষ্টের কথা জানতে ও উপলব্ধি করতে পারে। রোজা সম্পর্কে আল্লাহ এরশাদ করেছেন-‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।’
ইসলাম ধর্ম মতে রোজা হলো দেহের যাকাত স্বরূপ। রাসূল (স:) বলেন, ‘প্রত্যেক জিনিসের যাকাত দিতে হয়। রোজা হলো দেহের যাকাত’। সুস্থ সবল দেহের অধিকারী প্রত্যেক বয়ঃপ্রাপ্ত নর-নারীর উপর রোজা ফরজ। তবে গর্ভবতী নারী, পীড়িত, মুসাফির, সন্তানের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সিয়াম ভঙ্গের অনুমতি আছে। তাদেরকেও পরবর্তীতে এ ভাংতি রোজা আদায় করতে হবে।
মাহে রমজান মাসকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথম দশদিন রহমত, দ্বিতীয় দশদিন মাগফেরাত ও শেষের দশদিন (কিংবা নয় দিন) দোযখ হতে মুক্তির দিন বলে হাদীসে উল্লেখ আছে। রোজা মানুষকে ধৈর্য্যরে শিক্ষা প্রদান করে। রমযানে মুমিনরা সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও অন্যান্য পাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। আবার খোদার সন্তুষ্টিতে এশা ও তারাবীহ নামাজের জন্য নিজেকে সঁপে দেয়।
এরপর কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার সেহরীর জন্য উঠে। এভাবে মুমিনরা সব অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে খোদার হুকুম অনুযায়ী চলার ট্রেনিং নেয় এবং বাকী এগার মাস এ ট্রেনিং থেকে তারা অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার শক্তি পায়। রাসূল (স.) বলেন, ‘‘এটা ছবরের মাস এবং ছবরের প্রতিদান জান্নাত।
সেহরি খাওয়া সুন্নাত। যদি কোনো ব্যক্তি সেহরি খাওয়া ছাড়াই রোজার নিয়ত করে নেয়, তথাপিও তার রোজা হয়ে যাবে। তবে সেহরির সওয়াবটা সে পাবে না। সেহরি দেরিতে করা মুস্তাহাব। তবে সন্দেহ সৃষ্টি হয় এত দেরি করা কাম্য নয়। অন্যদিকে ইফতারের সময় হয়ে গেলে দ্রুত ইফতার করা সুন্নাত। অনর্থক দেরি করা ঠিক নয়। কাঁচা বা শুকনা খেজুর দ্বারা ইফতার করা উত্তম। যদি সম্ভব না হয় তাহলে পানি দ্বারা ইফতার করা ভালো।
অনেকেই জানতে চাইতে পারেন, রোজা অবস্থায় করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ করা যাবে কি না। এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, করোনাভাইরাসের টিকা মাংসপেশিতে গ্রহণ করা হয় যা সরাসরি খাদ্যনালি ও পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না, সেহেতু রমজান মাসে রোজাদার দিনের বেলায় শরীরে করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ করলে রোজা ভঙ্গ হবে না।


