বন্ধের সিদ্ধান্তের পরও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিষিদ্ধ অটো
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২২, ০৫:৩৩ পিএম
# মাসে কয়েক কোটি চাঁদাই সচল রেখেছে এসব অবৈধ যান
পবিত্র রমজানে মানুষকে যানজটের ভোগান্তি থেকে রেহাই দেয়ার উদ্দেশ্যে শহরে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত অটো ইজিবাইক, অটো রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের পরও অজ্ঞাত কারণে এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব নিষিদ্ধ যান। এদিকে আজ থেকে শুরু হওয়া রমজানে প্রশাসনের এই কথা না রাখাই কাল হয়ে দাঁড়াবে রোজারত অসংখ্য যাত্রীর।
তাছাড়া শহরবাসীও পোহাবে নৈমত্তিক যানজটে।নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি খন্দকার শাহ আলম যুগের চিন্তাকে জানিয়েছেন, ২৬ শে মার্চের আগেই এক সপ্তাহের মধ্যে শহরে পুরোপুরি ব্যাটারিচালিত অটো ইজিবাইক, অটো রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। স্বাধীনতা দিবসের আগে কিছুটা ছাড় দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু রমজান শুরু হয়ে গেছে। এখনো কার্যকরী সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হচ্ছেনা তা বোধগম্য নয়।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত অটো ইজিবাইক, অটো রিকশা থেকে শুধু নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে ১২ স্পটে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। যা মাসে দাঁড়ায় ৩ কোটি টাকা।
প্রশাসেনর পুলিশ, ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীসহ পেশাদার চাঁদাবাজদের আসকারায় এই অর্থ তোলা হয়। নিষিদ্ধ এই যানবাহনে সয়লাব হয়ে পড়েছে শহরের রাস্তা-ঘাটসহ অলি-গলি। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এসকল যানবাহন বন্ধ করার কোন উদ্যোগ নেই। বরং যতই দিন যাচ্ছে হরহামেশা বেড়েই চলছে। আর এজন্য নগরবাসীকে দুর্ঘটনা, যানজটসহ বিভিন্ন ভোগান্তি পোহাতে হয়। এর নেপথ্যে রয়েছে বড় রকমের চাঁদাবাজির ঘটনা।
যুগের চিন্তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকার তথ্য। নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রায় ১২ স্পটে থেকে কয়েক হাজার অটো রিকশা, অটো ইজিবাইক, সিএনজি যানবাহনের স্ট্যাণ্ড থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে একটি চক্র এই চাঁদা তোলেন। যে যেভাবেই পারছেন সেভাবেই হাতিয়ে নিচ্ছে ব্যাটাি চালিত অবৈধ যানের চাঁদার টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শহরের সবচেয়ে বেশি চাঁদা তোলা হয় চাষাঢ়া গোল চত্বর থেকে। এই মোড়েই রয়েছে ৬ টি অবৈধ স্ট্যান্ড। চাষাঢ়া মোড় সোনালী ব্যাংক শাখা, সুগন্ধ্যা বেকারি, শান্তনা মাকের্ট, রাইফেল ক্লাবের মোড়, সরকারি মহিলা কলেজ সংলগ্ন এবং কলেজ রোডের সামনে থেকে চাঁদা তোলেন নুরু মিয়া ও তার ছেলে সুজন হোসেন।
প্রভাবশালী এমপির অনুগত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আশ্রয়ে তারা এখান থেকে চাঁদা তোলে। এর একটা সিংহভাগ প্রভাবশালী পরিবারের অনুগত নেতারাও ভাগ পান বলে জানা যায়। এখানকার মোড় থেকে সিএনজি, অটো রিকশা, অটো ইজিবাইক, সিএনজিসহ হাজার খানেক যানবাহন থেকে প্রতিদিন ২ লাখ টাকা চাদাঁ উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে
এই একটি স্পট থেকে মাসে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আসে। জেলার শহরে প্রবেশ করতে হলে চাষাঢ়ার এই কয়েকটি স্ট্যান্ড হয়ে চলাচল করতে হয়। প্রভাবশালী নেতাদের শেল্টারে এখানে ১০ জনের একটি চক্র চাঁদা তোেেলন। যা নিয়ে পরিবহন চালকরাও বিপাকে আছেন। এজন্য মানুষকে বেশি ভাড়া আদায় করে চলাচল করতে হয়।
অন্যদিকে পঞ্চবটি স্ট্যান্ড থেকে হুমায়নসহ ৫ জনের একটি চক্র দৈনিক প্রায় লাখ খানেক টাকা তুলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই স্ট্যান্ড শহরের বিসিকের সাথে একটি জনবহুল স্ট্যান্ড। এখানে প্রায় ৫শ’ থেকে ৭ শ’ যানচলাচল করে। এই স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন হুমায়ুন নামের এক ব্যক্তি ১ লাখ টাকার উপরে চাদা তোলেন। যার ভাগ বিভিন্ন নেতা জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে থানা পুলিশরাও পান বলে জানান কয়েকজন চালক। এই স্ট্যান্ড থেকে মাসে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে ক্ষমতাসিন দলের জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায়।
শহরের ব্যস্ততম খানপুর মোড়ে পুলিশের নামে চাঁদা তুলে অটো ইজিবাইক চালকদের শহরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় বলে জানা যায়। এই টাকা তুলে ওই খানপুর বা মেট্রো হল মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ পরিবহন চালকদের ডেকে নিয়ে ড্রাইভারদের থেকে টাকা নিয়ে তাদের শহরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এখানেও প্রতিদিন প্রায় ৫০ টাকা করে নেয় বলে চালকরা জানান।
যা গড়ে হাজার খানেক চালকদের থেকে দৈনিক ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেন বলে অভিযোগ উঠে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরে বেশির ভাগ জায়গায় মোট অঙ্কের চাঁদার বিনিময়ে অবৈধ এ যান চলাচলের মৌখিক বৈধতা দেয়া হচ্ছে।
নগরীর জিমখানা সিএনজি স্ট্যান্ড বিএনপির হাসান নামের এক নেতা নাসিক থেকে টেন্ডার নিলেও এখানে ৫ জনের একটি চক্র অবৈধভাবে অটো রিকশা, অটো ইজিবাইক চালকদের থেকে লাবলু, আকাশ নামের ব্যক্তি দৈনিক পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলেন। এখানে প্রায় ৫শ অবৈধ ইজিবাইক চলাচল করে। তাদের থেকে প্রতিদিন ১শ’ থেকে ১৫০ টাকা নেয় একটি সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ গোষ্ঠি। এখানে মাসে চাঁদা উঠে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
শহরের নগর ভবনের পাশেই নিতাইগঞ্জ স্ট্যান্ড প্রায় ২০০ অটো চালকদের থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এছাড়াও প্রতি চালক মাসে ৫০০ টাকা করে শরীফ নামের এক চাদাঁবাজকে দিতে হয়।
মাসে এখান থেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা তুলেন বলেন জানান একাধিক ব্যক্তি। এছাড়া নগরীর গলাচিপা থেকে টিটু নামের লাইনম্যান অটো স্ট্যান্ড থেকে টাকা নেন। তিনিও এক জনপ্রতিনিধির শেল্টারে টাকা তুলেন বলে জানান চালকরা। তার পিছনে কয়েকজন প্রভাবশালীর ছায়া রয়েছে।
শহরের একদিকে চাঁদা তুলার হিড়িক পরেছে আরেক দিকে নগরবাসীর ভোগান্তি বেড়েছে। সেই সাথে যানজটের কারণে পুরো শহর এক হ-য-ব-র-ল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের তেমন উদ্যোগ না থাকায় নগরবাসী কোন স্বস্তি পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।


