হিন্দু ধর্মাবলম্বীর ঐতিহাসিক পুণ্যস্নান উৎসব আগামীকাল
লতিফ রানা
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২২, ০৫:৫৪ পিএম
পর পর দুই বছর কোন প্রকার আয়োজন করা সম্ভব না হওয়ায় এবার অনেক উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বী পুণ্য স্নান খ্যাত লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব। এই স্নান উৎসব শুধু হিন্দু ধর্ম বা লাঙ্গলবন্দ এলাকারই উৎসব নয়। এই উৎসব নারায়ণগঞ্জ জেলাকে দিয়েছে সমৃদ্ধময় ইতিহাস ও উৎসবের গৌরব। রামায়ণ, মহাভারতসহ বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থ এবং সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন কাহিনীর মাধ্যমে যা জানা যায় তাহলো প্রাচীনকাল থেকেই তীর্থস্নান, তীর্থ পরিক্রমা ও তীর্থযাত্রা বা ভ্রমনসহ মহাপুরুষদের আশ্রম,
তীর্থক্ষেত্র ও দেব-মন্দির বা বিগ্রহ দর্শনের তাদের প্রচন্ড মনোযোগ। আর এ জন্য ভ্রমন এবং দূর দুরান্তে গমন তাদের ধর্মীয় কৃষ্টির একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এমনি একটি তীর্থক্ষেত্র হলো লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র স্নান। হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য অন্যতম প্রধান পুণ্যউৎসব হলো এই মহাঅষ্টমীর স্নান। যা ব্রহ্মপুত্র নদের নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকাকে কেন্দ্র করে অবস্থান। সনাতন ধর্মের অন্যতম বড় এই উৎসবটি প্রতিবছর চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে (শুক্লা তিথি) অনুষ্ঠিত হয়।
তারা মনে করেন, এই সময়টাতে বহ্মপুত্র নদে স্নান করা খুবই পূণ্যের। এ স্নানের ফলে ব্রহ্মার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, যার মাধ্যমে পাপমোচন হয়। এ বিশ্বাস নিয়ে শত শত ধরে এ স্নানে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দের মহাষ্টমী স্নানোৎসবে।
প্রতিবছর এই পুণ্য উৎসবকে কেন্দ্র করে এখানে ১০লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ব্রহ্মপুত্র নদের উপরে অবস্থিত সেতুটির দক্ষিণ পাশে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম পাশের প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গা নিয়ে অবস্থিত পুণ্য স্নানের স্থান যে ঘাটগুলোতে স্নান কার্য সম্পন্ন করা হয় তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ঘাটগুলো হলো- অন্নপূর্ণা ঘাট, রাজঘাট, শংকর (সাধুর) ঘাট, মাকরী (শান্তি) ঘাট, গান্ধীঘাট বা মহাশ্মশান ঘাট, বরদেশ্বরী ঘাট, জয়কালী ঘাট, রক্ষাকালী ঘাট, পাষাণকালী ঘাট, প্রেমতলা ঘাট, চর শ্রীরামপুর ঘাট, দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ী ঘাট ও কালীগঞ্জ ঘাট।
এখানে উল্লেখ যোগ্য মন্দির সমূহ হলো অন্নপূর্ণা মন্দির, রক্ষাকালী মন্দির, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির, আদি ব্রহ্মপুত্রের মন্দির, শ্মশানকালী মন্দির, জয়কালী মন্দির, শিব মন্দির, পাষাণকালী মন্দির, বরদেশ্বরী কালী মন্দির ও দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির। এছাড়াও এখানে মহাত্মা ললিত সাধুর আশ্রম, বেণীমাধম ব্রহ্মচারী আশ্রম, শংকর সাধুর আশ্রম,
শান্তি আশ্রম, বৃন্দাবন সাধুর সমাধি মন্দির ও আশ্রম, দ্বিগি¦জয় সাধুর আশ্রম ও পরেশ সাধুর আশ্রম উল্লেখ যোগ্য। আশ্রয়স্থল হিসেবে তিলক যাত্রী নিবাস, কাল-ভৈরবের বাড়ী ও চৌধুরী কালীবাড়ী (মঠ) উল্লেখ যোগ্য। তবে তীর্থস্থান হিসেবে এখানকার উৎপত্তি ও গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক কাহিনীর প্রচলন থাকলেও শতবর্ষ যাবত যেই কাহিনীটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গুরুত্ব সহকারে বিশ্বাস করে তা তুলে ধরা হলো।
ত্রেতাযুগের প্রথম দিকে ভোজকোট নামক নগরীর অধিপতি চন্দ্রবংশীয় রাজর্ষি গাধির সুন্দরী কন্যা সত্যবতীর বিবাহ হয় ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণকুমার রিচিকের সাথে। সত্যবতীর গর্ভে জমদগ্নি নামে এক মুনির জন্ম হয়। জমদগ্নি বিবাহ করেন প্রসেনজিৎ রাজার কণ্যা রেণুকাকে। রেণুকার গর্ভে জমদগ্নির পাঁচটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। কনিষ্ঠ সন্তান পরশুরাম ছিলেন বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার।
একদিন জমদগ্নির পাঁচপুত্র ফল সংগ্রহের জন্য বনে গেলে তাদের মাতা রেণুকা স্নানপূর্বক পানীয় জল আনার জন্য গঙ্গায় যান। তিনি যখন নদীর ঘাটে জল আনতে যান তখন শতবাহু নামে এক রাজা তাঁর শত-স্ত্রী (একশত স্ত্রী)’র সঙ্গে গঙ্গা নদীতে জলকেলি করছিলেন। রাজা তাঁর শতবাহুতে নদীর জল আকর্ষণ করলে অবলীলাক্রমে স্ত্রীগণ তাঁর বাহুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করেন।
হঠাৎ রাজা সমস্ত জল একবারে ছেড়ে দেন। স্ত্রীগণ তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে থাকলে রাজা পূনর্বার জল আকর্ষণ করেন। রেণুকা দেবী নদীর ঘাটে গিয়ে শতবাহু রাজার কৌতুকপূর্ণ নয়নাভিরাম জলকেলি দেখে মনের মধ্যে এক বিচিত্র পুলক অনুভব করেন। কিছুক্ষণ এ দৃশ্য দেখার পর জল নিয়ে ঘরে ফিরলে ঋষি জমদগ্নি স্ত্রীর বিলম্ব ও শরীর রোমাঞ্চিত হবার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু রেণুকা দেবী নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি যোগবলে স্ত্রীর সকল ঘটনা জানতে পারেন।
ঋষি তার স্ত্রীর এই মানসিক অবস্থা জানতে পেরে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ তিনি রূঢ়স্বরে তার পুত্রদেরকে ডেকে তাদের মাতাকে হত্যার নির্দেশ দেন। তার জ্যেষ্ঠ চার পুত্র তাদের মাতাকে হত্যা করতে অস্বীকার করেন। ঋষি তখন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে চার পুত্রকেই পশু-পক্ষীর মত জড় ও হীনবুদ্ধিসম্পন্ন নিকৃষ্ট জীবন প্রাপ্তির অভিশাপ দেন।
সবশেষে তিনি তাঁর পঞ্চম পুত্র পরশুরামকে মাতৃ হত্যার আদেশ দেন। পরশুরাম কম্পিত হৃদয়ে শঙ্কিত চিত্তে পিতার নির্দেশ পালন করেন। নির্দেশ পালন করার আশীর্বাদ হিসেবে ঋষি তার পরশুরামকে বর চাইতে বললেন।
মাতৃ হত্যার অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে পরশুরাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে চারটি বর চাইলেন- ১. তপঃপ্রভাবে আমাদের মা যেন আবার জীবিত হয়ে আমাদের সাথে বসবাস করেন। ২. হত্যার ঘটনা যেন মায়ের স্মরণে না থাকে। ৩. জ্যেষ্ঠভ্রাতাগণ যেন মনুষ্যবৎ পূর্বাবস্থা ফিরে পান। ৪. এই হতাকান্ডে তাঁর যেন পাপস্পর্শ না হয়।
কিন্তু তার কুঠারের আঘাতে যখন তার মাতার দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় সেই মুহুর্তেই পরশুরাম মাতৃহত্যা ও নারী হত্যাজনিত পাপে আক্রান্ত হন। পরশুরাম হতবাক হয়ে দেখেন, তার হাতের কুঠার হাতেই লেগে আছে। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পিতৃদেবকে জিজ্ঞেস করেন, পিতা! আমিতো আজ্ঞাবহ মাত্র, তবে কেন কুঠার আমার হাতে লেগে আছে? পিতা বললেন, ‘তুমি মাতৃহত্যা আর নারীহত্যা দ্বিবিধ পাপেই আক্রান্ত হয়েছো।
পাপ ছোট বা বড় যা-ই হোক না কেন, কৃতকর্মীকে তা’স্পর্শ করবেই। ঋষি তার পুত্রকে আশ্বস্ত করে ধৈর্য্য ধারণের উপদেশ দেন এবং উদ্বিগ্ন না হয়ে অবিলম্বে সর্বতীর্থ পরিভ্রমণের উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘যে তীর্থ গমনে বা স্নানে তোমার হাতের কুঠার স্খলিত হবে, জানবে যে ঐ পুণ্যস্থানই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র। পিতার আদেশ প্রাপ্ত হয়ে পরশুরাম পৃথিবী ভ্রমনে বের হয়ে নানা তীর্থ পরিভ্রমন করতে লাগলেন।
অবশেষে একদিন হিমালয় পর্বতের উত্তর-পূর্ব কোণে, মানস সরোবরের সন্নিকটে এক বৃহৎ কুপের সম্মুখে উপনীত হলেন এবং পরমেশ্বরকে স্মরণ করে পরশুরাম ব্রহ্মকুন্ডে অবগাহন করলেন। অবগাহন করার সাথে সাথে তার হাতে লেগে থাকা কুঠারখানা স্খলিত হয়ে তিনি মহাপাপ থেকে মুক্তি লাভ করলেন। আর যে সময় এই ঘটনাটি ঘটে তখনকার তিথিটা ছিল চৈত্রের অষ্টমী।
পরশুরাম মনে মনে স্থির করলেন, এমন সুমহান পুণ্যজল, যা আমাকে মহাপাপ থেকে মুক্ত করেছে, তা সর্বসাধারণের নিত্য সহজলভ্য করার জন্য এই জলের ধারা পৃথিবীতে প্রবাহিত করব। ত্রেতাযুগে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থানুযায়ী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে কোন না কোন আশ্রম নিবাসী থাকতে হতো। এসব আশ্রমে (গোত্রে) মুনি ঋষিগণ লেখাপড়া থেকে আরম্ভ করে গৃহকর্ম,
কৃষিকার্য, রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি, যুদ্ধনীতি, অর্থনীতি ও গার্হস্থ্য নীতি প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। পরশুরাম তার পিতার আশ্রম থেকে হাতে কুঠার এবং হাল নিয়ে পিতৃ আজ্ঞায় বের হন। কুঠার হস্তচালিত হলে হাল দিয়ে কঠিন পাথরের বক্ষ বিদীর্ণ করে ব্রহ্মপুত্রের জলধারাকে হিমালয়ের পাদদেশে সমভূমিতে আনতে সক্ষম হন।
তারপর উক্ত কর্ষণের লাঙ্গল দিয়ে মাটি চষে নিয়ে ক্রমাগত চলতে চলতে ব্রহ্মপুত্রের জলধারাকে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ নামক এলাকায় নিয়ে আসেন। সুদূর হিমালয় থেকে একাধারে হাল চালনায় ক্লান্ত হয়ে পরশুরাম বিশ্রাম করার জন্য এখানে এসে লাঙ্গল বদ্ধ রাখেন। তখন থেকেই এই স্থানের নাম হয় ‘লাঙ্গলবন্দ’। তখন থেকেই জায়গাটি পুণ্যস্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।


