#আলমগীর হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ
ওমর ফারুক। বক্তাবলী ইউপির ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার তিনি। এক সময় যার দৈন্য দশা ছিলো তিনি এখন বেশ কয়েকটি ইটভাটার মালিক। গেল ইউপি নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র থেকে ৫টি ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছিলেন ওমর ফারুক ও তার লোকজন। এ ঘটনায় পুলিশের সাথে তিনিসহ আব্দুল, কাউসার, সজিব,হারুন ও ওহাব মাদবরসহ বেশ কয়েকজন গোলাগুলিও করেছেন।
ফলশ্রুতিতে ঐ কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। পরবর্তী নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরাতো যার সেই ফারুক মেম্বার সৌদি আরব থেকে এক ব্যাক্তির ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে দেশে এসে বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
গত কয়েক বছর আগে ফারুকের ইটভাটায় আলমগীরের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন দেলোয়ার নামের পুলিশের একজন সোর্স। যে ছিলো আলমগীরের বন্ধু। কথিত আছে ফারুকের নির্দেশেই দেলোয়ারকে ইটভাটার ভেতরেই ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছিল আলমগীর। জেল হাজত থেকে বের হওয়ার পর ফারুকের বডিগার্ড হিসেবেই ছিলো সে। ফারুকের আশ্রয় প্রশ্রয়েই আলমগীর বক্তাবলীর রাজাপুর ও লক্ষিনগরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার মানুষের কাছে আতংক ছিলো।
অবশেষে গত ২১ মার্চ বাড়ি থেকে ওমর ফারুকের নির্দেশে ডেকে নিয়ে তার মালিকানাধীন মারুফা ব্রিক ফিল্ডে লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত যখম করে রাজাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছিলো আলমগীরের দেহ। পরবর্তীতে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আহতাবস্থায় নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
বক্তাবলীর রাজাপুরে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ফারুক দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে ফারুক গড়ে তুলেছেন একাধিক বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যদের কারনে বক্তাবলীর কয়েকটি গ্রামের মানুষের আতংকে দিন কাটে বলেও নিশ্চিত করেছেন একাধিক সূত্র।
আলমগীর হত্যাকান্ডকে ধামাচাপা দিতে, বিশেষ পেশার পরিচয় দানকারী অনেকেই মাঠে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ইতিমধ্যে ফারুক মেম্বারের পক্ষ থেকে ১৫ লাখ টাকা তারা হাতিয়েও নিয়েছেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
বক্তাবলীর রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক। প্রায় দুই যুগ আগে জীবন জীবীকার তাগিদে সৌদী আরবে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন তিনি। সেখানে একটি মার্কেটে পেয়েছিলেন ক্লিনারের চাকুরী। এরই মধ্যে মালিকের সাথে ভালো সম্পর্কের জের ধরে ফারুক পুরো মার্কেটের দায়িত্ব পেয়ে গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে সাউদ আফ্রিকা থেকে একজন ব্যক্তি সৌদিতে ফারুক যে মার্কেটে চাকুরী করতো সেই মার্কেটে মার্কেটিং করতে এসেছিলো।
ধুরুন্দর ফারুক ঐ ব্যাক্তির সাথে এক পর্যায়ে সু সম্পর্ক গড়ে তোলে। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যে সাউদ আফ্রিকার সেই ব্যাক্তির সাথে ফারুকের সাথে দহরম মহরম সম্পর্কের জের ধরে সেই ব্যাক্তি সৌদিতে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়। ফারুক সেই ব্যাক্তিকে নানা রকম প্রলোভনও দেখিয়েঐ ব্যাক্তির টাকায় সৌদিতে ব্যবসাও শুরু করেছিলেন।
এক পর্যায়ে ঐ ব্যাক্তি সাউদ আফ্রিকায় বেড়াতে যাওয়ার পর তামিল টাইগারদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন। খুন হওয়া সেই ব্যাক্তির সৌদিতে থাকা ২৫ কোটি টাকার মালিক হয়ে যান ফারুক। এরপর সৌদি থেকে প্রায় দুই যুগ আগে পালিয়ে দেশে এসে আত্মগোপনে থাকেন তিনি।
সূত্র আরো জানায়, দেশে ফিরে এসে ফারুক ঢাকার মোতালেব প্লাজায় ৪টি ও ধানমন্ডির ক্যাপিটাল মার্কেটে ৬টি দোকান ক্রয় করে সেখানে ব্যবসা শুরু করেন। এরই মধ্যে বক্তাবলীতে ৩টি ইটভাটার মালিক বনে যান তিনি। এরপরেই ২০১৮ সালে তিনি তিনি বক্তাবলী ইউপি নির্বাচনে নির্বাচন করে মেম্বার নির্বাচিত হন। এবার নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে ফারুক নির্বাচনের কেন্দ্র থেকে ৫টি ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে।
ছিনতাই করার সময় তিনিও সাথে ছিলেন। ব্যালট বাক্সগুলো ছিনতাই করে তিনি রাজাপুর একটি তেলের পাম্পে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। পরবর্তীতে ৪ নং ওয়ার্ডের নির্বাচনে অনেকটা প্রভাব খাটিয়ে ফারুক নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
বক্তাবলী এলাকাবাসী বলেন, আলমগীর তেমন ভালো মানুষ ছিলেন না। পুলিশের সোর্সগীরি করতো আলমগীর। তবে তাকে সবসময় শেল্টার দিয়ে আসছিলো ফারুক। আলমগীর এক সময় ফারুকের বডিগার্ডও ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে ফারুকের ইটভাটার শ্রমিকদের মোবাইল ছিনতাই করতো দেলোয়ার। দেলোয়ার ছিলো আলমগীরের বন্ধু।
দেলোয়ারের অত্যাচারে ইটভাটার শ্রমিকরা ছিলো অতিষ্ঠ। আর এই কারনে ফারুক ও তার লোকজন দেলোয়ারের উপর ক্ষিপ্ত ছিলো। ফারুকের নির্দেশেই দেলোয়ারকে হত্যা করে আলমগীর। এ মামলায় আলমগীর জেল হাজতে ছিলো। জেল হাজত থেকে আলমগীরকে বের করে আনতে বাইরে থেকে ওমর ফারুক বলিষ্ট ভুমিকা রেখেছিলেন বলেও সূত্রের দাবী।
জেল হাজত থেকে বের করে আনার পর আলমগীরকে ফারুক তার ইটভাটাতেই লোড আনলোডের কাজ দেন। তবে তাকে যে বেতন দেয়ার কথা ছিলো সেই বেতনে পুষতো না আলমগীরের। এ নিয়ে ফারুকের সাথে একাধিকবার কথাকাটাকাটি হয়েছিলো আলমগীরের। নিহত হওয়ার কিছুদিন আগেও ফারুকের উপর হামলা করেছিলো আলমগীর।
এতে ফারুক গুরুতর আহতও হয়েছিলেন। এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলাও করেছিলেন ফারুক। মামলা দায়েরের পর থেকে ফারুক ও আলমগীরের মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়তে থাকে।
এরই মধ্যে দেলোয়ার হত্যাকান্ডের ঘটনার সাথে ফারুকের নাম জড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলো আলমগীর। গত ২১ মার্চ দুপুরের দিকে বাসা থেকে আলমগীরকে লোক মারফত ইট ভাটায় ডেকে নিয়েছিলেন ফারুক ও তার লোকজন। এরপরেই আলমগীরকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত যখম করে ফারুকের লোকজন। পরে আলমগীরকে রাজাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় ফেলে রেখে দেয়া হয়। পরে তার স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
আরো জাান গেছে, নিহত আলমগীর নিজেও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। মাদক ব্যবসার জন্য চালান দিতেন ফারুকের বোন জামাই আব্দুল। আব্দুল ও আলমগীর এক সাথে বসে ইয়াবা সেবন করতেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বক্তাবলী এলাকার বেশ কয়েকজন জানান, আলমগীর ছিলেন খারাপ প্রকৃতির লোক। সেজন্য তাকে এভাবে রক্তাক্ত যখম করে হত্যা করা এলাকাবাসী সমর্থণ করেনা। তারা বলেন, টাকার জোরে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনদের সাথে আঁতাত করে বক্তাবলীর ৪ নং ওয়ার্ডের জনগনকে অনেকটা জিম্মি করে রেখেছেন ফারুক ও তার লোকজন।
উল্লেখ্য,আলমগীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মাথে জড়িত মূল আসামী ফারুকসহ এজাহারভুক্ত বেশ কয়েকজন আসামীকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তারা বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।


