# তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত ১২ মে’র সংবাদে প্রমাণ মেলে
# একই দিন দৈনিক আজাদেও একই তথ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়
# মুনতাসীর মামুনের বইয়ের ২২৫ পৃষ্টাতেও রাজাকার গোলাম রব্বানী
# মোহাম্মদ আলী ভাই, সত্যকে বিকৃত করার ঘৃণ্য চেষ্টা করবেননা : জাহাঙ্গীর
গত ২৪ মার্চ জেলা প্রশাসনের কাছে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধকালীন কুখ্যাত শান্তিকমিটির সদস্য গোলাম রব্বানী খান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন বলে যে দাবি করেছিলেন সেটি সঠিক নয় হিসেবেই বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে বেরিয়ে আসছে।
এতোদিন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন ও রীতা ভৌমিকের বইয়ে চাষাঢ়া ইউসিতে গোলাম রব্বানী খান মুক্তিযুদ্ধকালীন শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন বলে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তৎকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতেও গোলাম রব্বানী শান্তিকমিটির সদস্য হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করেছেন তা বেরিয়ে এসেছে। তৎকালীন পাকিস্তানী দৈনিক পাকিস্তানেও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শান্তিকমিটি গঠনের সংবাদটি গুরুত্ব সহকারে ছাপানো হয়েছিল।
পাকিস্তান সরকারের অধীন থাকা ১২ মে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকাতে প্রকাশিত আরো কতিপয় স্থানে শান্তিকমিটি গঠন শিরোনামে সংবাদে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া ইউসিতে গোলাম রব্বানী খানের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদটির নারায়ণগঞ্জ অংশে বলা হয়, সম্প্রতি এখানে এক প্রতিনিধিত্বশীল সমাবেশে নারায়ণগঞ্জ শহর শান্তিকমিটি গঠন করা হয়েছে।
জনাব এ আজিজ সরদার কমিটির আহবায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। ১২৪ সদস্য বিশিষ্ট এই শান্তি কমিটি পৌর এলকাার বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটির জন্য নিম্মোক্ত ১৪ জনকে আহবায়ক নিয়োগ করেছে। ১। গোদনাইল-জনাব আলতাফ হোসেন, ২। হাজিগঞ্জ-জনাব এম এ বাসেত, ৩। খানপুর (পশ্চিম) জনাব লতিফ সরদার, ৪। খানপুর-জনাব সুলতান খান, ৫।
চাষাড়া-জনাম গোলাম রব্বানী খান, ৬। দেওভোগ-জনাব জহির হোসেন, ৭। নারায়ণগঞ্জ-জনাব এস এ হালিম, ৮। শীতলক্ষ্যা-জনাব লাল মিয়া, ১১। বন্দর-জনাব মোহাম্মদ আলী, ১২। কদম রসুল-আলহাজ্ব এ লতিফ, ১৩। নবীগঞ্জ-জনাব মহিউদ্দিন আহমদ, ১৪। ধামগড় (শিল্প এলাকা) আলহাজ্ব আবদুর রফিক। শান্তি কমিটির উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবে প্রাঙ্গণে গত রোববার যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপিত হয়েছে।
এছাড়া ১২ মে ১৯৭১ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ শহরে শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছিল। রিপোর্টে বলা আছে, সম্প্রতি এক প্রতিনিধিত্বমূলক সমাবেশে নারায়ণগঞ্জ শহর শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। জনাব এ. আজিজ সরদারকে উক্ত উপ-কমিটির আহবায়ক নির্বাচিত করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পৌর এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটির সদস্য সংখ্যা ১১৪ জন এবং ১৪ জনকে এই কমিটি সমূহের আহবায়ক নিয়োগ করা হইয়াছে। নিম্নে ১৪ জন আহবায়কের নাম দেওয়া হইল : গোদনাইল ইউসিতে-জনাব আলতাফ হোসেন, হাজীগঞ্জ ইউসিতে জনাব এমএ বাসেত, খানপুর (পশ্চিম) ইউসিতে জনাব লতিফ সরদার, খঅনপুর ইউসি জনাব সুলতান খান,
চাষাড়া ইউসি জনাব গোলাম রব্বানী খান, দেওভোগ ইউসি জনাব জহির হোসেন, নারায়ণগঞ্জ ইউসি জনাব জহির হোসেন, নারায়ণগঞ্জ ইউসি জনাব এসএ হালিম, শীতলক্ষ্যা ইউসি জনাব লাল মিয়া, পাইকপাড়া ইউসি জনাব আবদুল জলিল, সোনাকান্দা ইউসি জনাব ইসাক মিয়া, বন্দর ইউসি জনাব মোহাম্মদ আলী, কদমরসুল ইউসি জনাব আলহাজ্ব এ লতিফ
নবীগঞ্জ ইউসি জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ, ধামগড় ইউসি জনাব (ইন্ডাষ্ট্রিয়াল) আলহাজ্ব আবদুর রফিক।’ এই ১৪ জন আহবায়কের মধ্যে চাষাড়া ইউসি জনাব গোলাম রব্বানী খান ছিলেন ওই সময়কার রাইফেল ক্লাবের সেক্রেটারি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘গত রবিবার শান্তিকমিটির উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবভবনে মিলাদুন্নবী যথাযোগ্য মর্যাদার সহিত উদযাপিত হয়।
এছাড়া মুনতাসীর মামুনের লেখা ‘শান্তিকমিটি ১৯৭১’ বইয়ের ২২৫ পৃষ্টায় শান্তিকমিটির তালিকায় নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া ইউসিতে গোলাম রব্বানীর নাম স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু এরপরেও চলতি বছরের ২৪ মার্চ গত ২৪ মার্চ জেলা প্রশাসনের কাছে বীর মুক্তিযোদ্ধঅ মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করেন।
স্থানীয় সরকারের উপ পরিচালক ফাতেমা তুজ জান্নাত প্রত্যয়নপত্রটি গ্রহন করেন। প্রত্যয়ন পত্রে উল্লেখ করা হয়, গোলাম রাব্বানী খান শান্তি কমিটির কেউ নন। তিনি রাজাকারও ছিলেন না। বরং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি ছিলেন। নারায়নগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের অস্ত্রাগারের চাবি তখন তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা খবির আহাম্মদ ও বীর মুক্তিয়োদ্ধা শফিউদ্দিন সারোয়ার ওরফে বাবু সারোয়ারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
গোলাম রাব্বানী খান আদৌ স্বাধীনতা বিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তিনি মুসলিম লীগের একজন নেতা ছিলেন মাত্র। প্রত্যয়নপত্রে আরও বলা হয়, ‘মুনতাসির মামুন তার রচিত “শান্তিকমিটি ১৯৭১” বইয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য বা প্রমাণাদি ছাড়াই মরহুম গোলাম রাব্বানী খানকে শান্তি কামটির সদস্য উল্লেখ করেছেন।
এ প্রত্যয়নপত্র জমা দেয়ার সময় ডিসি অফিসে উপস্থিত ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা সামিউল্লাহ মিলন, মুক্তিযোদ্ধা এড. নূরুল হুদা, মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান ভুইয়া জুলহাস, মুক্তিয়োদ্ধা খবির আহাম্মদ, মুক্তিযোদ্ধা হাজী আবদুল মমিন, মুক্তিযোদ্ধা এড. তারাজউদ্দিন, মুক্তিয্দ্ধোা মোহর আলী চৌধুরী, মুক্তিয়োদ্ধা রমিজউদ্দিন রমু প্রমুখ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গোলাম রাব্বানী খানকে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী দাবী করে দেয়া প্রত্যয়নপত্রে মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মোহাম্মদ আলীসহ ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা (!) স্বাক্ষর করেছেন।
এদিকে স্বীকৃত রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়ক বানানোর চেষ্টা করায় ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। নানা প্রান্ত থেকে গোলাম রব্বানীর শান্তি কমিটিতে থাকার প্রমাণাদি বেরিয়ে আসছে। আর এতে সমালোচনার তীক্ষè তীরে বিদ্ধ হচ্ছেন মোহাম্মদ আলী। দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার বরাত দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন মোহাম্মদ আলীর দিকে।
তিনি বলেন, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর দিকে সম্মান জানিয়ে বলতে চাই, এটি আপনি কী করলেন? মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা সম্মান জানাই। মুক্তিযোদ্ধারা যেন মৃত্যুর পরেও সম্মান পান সেটিও আমরা চাই। কিন্তু কতিপয় মুক্তিযোদ্ধারা যে স্মারকলিপি দিয়ে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করলেন। তারা বললেন, মুনতাসির মামুনের বইয়ে নাকি সত্য বলা হয়নি, ওই সময়ের পত্রিকাগুলোও কি মিথ্যা কথা বলছে।
সেসব তো পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রাধীন পত্রিকাগুলো কী বলছে। তারা তো বলছে, গোলাম রব্বানী খান শান্তিকমিটির সদস্য ছিল। তাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলতে চাই, সত্যকে সত্য বলুন, আর মিথ্যাকে মিথ্যা। মিথ্যাকে সত্য বানানোর চেষ্টা করলে এই প্রজন্ম আপনাদের মেনে নেবেনা, শ্রদ্ধা করবেনা। শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ আলী ভাই, মিথ্যা মিথ্যাই। সত্য আড়াল করা যাবেনা। সঠিক ইতিহাসটা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরুন।


