# নদীরপাড়ে অবৈধভাবে দখলে বেশিরভাগ
# পরিবেশের ক্ষতির সাথে জনজীবন অতিষ্ট
# বেপরোয়া সিমেন্টবাহী ট্রাকেও প্রতিনিয়ত ঝড়ছে প্রাণ
কোন শহরে একটি নদী থাকলেই তাকে সেই শহরের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু কোনো শহরের মধ্য দিয়ে যদি একটি নদী বয়ে যায়, তিন পাশে থাকে আরও তিনটি বড় নদী এবং দুই ডজনের বেশি খাল শিরা-উপশিরার মতো এসব নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে সেই শহর অনায়াসে ভূস্বর্গ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। নারায়ণগঞ্জ এমনই একটি নদীসমৃদ্ধ শহর। কিন্তু এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত নগরীতে পরিণত হচ্ছে নদীর পাশে কতগুলো সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর কারণে। আর এতে করে এই ফ্যাক্টরীগুলো জেলার অভিশাপে পরিণত হচ্ছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। এর পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা এই এি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ধলেশ্বরী নদী। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদও জেলার পশ্চিম দিক দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদরে ধলেশ্বরী নদীতে মিলিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ^রী নদীর তীরে গড়ে ওঠা ১৭টি সিমেন্ট কারখানা আশীর্বাদ না হয়ে যেন অভিশাপে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সিমেন্ট কারখানাগুলো বায়ু দূষণসহ বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষের জীবন একে একে কেড়ে নিচ্ছে। সিমেন্ট কোম্পানির যন্ত্রণার পাশাপাশি তাদের ট্রাকগুলোর বেপরোয়া চলাচল কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। গত কয়েক বছরে সিমেন্ট কোম্পানীগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যানের চাপায় না ফেরার দেশে চলে গেছে পুলিশ, গার্মেন্টের মালিক, সাংবাদিক, স্কুলছাত্রসহ অনেক সম্ভাবনাময় প্রাণ। এছাড়াও সিমেন্ট কোম্পানীগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যানগুলো ওভারলোডের কারণে সড়কগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই প্রতিনিয়ত সড়কপথে চলতে হচ্ছে যাত্রীসাধারণকে।
একাধিক সিমেন্ট ফ্যাকরীর কর্মরত প্রবীন ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানাযায়, নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত সিমেন্ট আমদানী করেই চলতে হতো বাংলাদেশকে। কিন্তু ১৯৯৫ সালের পর থেকে বদলেছে চিত্র। দেশেই গড়ে ওঠেছে অসংখ্য সিমেন্ট কারখানা। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীর তীরেই ১২ টি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী।
এগুলো হলো শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বন্দরের নবীগঞ্জে আকিজ সিমেন্ট, মদনগঞ্জে সিমেক্স সিমেন্ট (ইনসি) বাংলাদেশ লিমিটেড, মদনগঞ্জে বসুন্ধরা সিমেন্ট, সিদ্ধিরগঞ্জে ইষ্টার্ন (সেভেন হর্স) সিমেন্ট লিমিটেড, সৈয়দপুর মুক্তারপুর এলাকায় প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেড, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ^রী নদীর তীরে মুক্তারপুর এলাকায় শাহ সিমেন্ট ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড, ধলেশ^রী নদীর তীরে মুক্তারপুর এলাকায় ক্রাউন সিমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড, মেট্রোসেম সিমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড, এ্যামিরেটস সিমেন্ট কোম্পানী।
পরিবেশবিদদের মতে, মানুষের জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বায়ু তথা পরিবেশের প্রতি তাঁদের বড় ধরণের উদাসীনতাও দৃশ্যমান। ঠিকমতো ডাস্ট কন্ট্রোল প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় এসকল সিমেন্ট কারখানা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে, সালফার ও সিলিকনযুক্ত সূক্ষ্ম ধুলিকণা। সিমেন্ট উৎপাদন বায়ুমান নিয়ে,
খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) পরিবেশ বিদদের করা ২০১৭ সালের এক গবেষণা ফলাফল বলছে- প্রতি মেট্রিকটন সিমেন্ট উৎপাদনে ধুলো তৈরী হয় ৫১ গ্রাম। আর, একটি সিমেন্ট কারখানা থেকে বছরে ৫০.২ মেট্রিকটন ধুলো ছড়ায় তার চারপাশে। যার মধ্যে থাকে ক্যালসিয়াম অক্সাইড, সিলিকন অক্সাইড, অ্যাল্যুমিনিয়াম অক্সাইড, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাউড, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং অতি সুক্ষ্ম ধুলিকণা পিএম ০.৫।
আইন অনুযায়ী বায়ুতে ভাসমান বস্তর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২০০ পিপিএম। কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার ধূলিকণা বায়ুতে ছাড়ছে নারায়ণগঞ্জের। এসকল সিমেন্ট কারখানার কোনো কোনোটি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি ধূলিকণা ছাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশীরভাগ সিমেন্ট কারখানার নেই ধুলা প্রতিরোধক ব্যবস্থা।
এদিকে সিমেন্ট কারখানাগুলো যেমন দূষণ ছড়াচ্ছে তেমনি তাদের কারখানাগুলোর ট্রাক কাভার্ডভ্যানগুলোও চলছে অতিরিক্ত সিমেন্ট বোঝাই করে। যে কারণে নারায়ণগঞ্জের বেশীরভাগ সড়কই নির্মাণের কিছুদিনের ব্যবধানেই ভেঙ্গে যাচ্ছে। বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটি পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
১৮ অক্টোবর রাতে ফতুল্লায় শাহ সিমেন্ট কারখানার একটি ট্রাকচাপায় পিষ্ট হয়ে শফিকুল ইসলাম জনি নামে এক সাংবাদিক নিহত হয়েছে। ১৮ অক্টোবর রাত ৯টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় একটি অজ্ঞাত ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ২৬ বছর বয়সী সিমা বেগম নামে এক গৃহিনীর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার সময় ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে ফতুল্লার পঞ্চবটির দিকে পালিয়ে যায়।
ধারনা করা হচ্ছে ওই ট্রাকটিও কোন সিমেন্ট কোম্পানীর ট্রাক হতে পারে। ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কের গোগনগরে প্রিমিয়ার সিমেন্টের কাভার্ডভ্যানের চাপায় দ্ইুজন নিহত হয়েছে। নিহত অটোরিকশা চালক জামাল হোসেন (৪০) সদর উপজেলার গোগনগরের ভাসানী সরদারের ছেলে ও যাত্রী মাসুদ মিয়া (৪২) রাজধানীর কামরাঙ্গিরচর এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে।এলাকাবাসীর অভিযোগ, আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির গাড়ি এ রাস্তা দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে।
২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ বন্দরে বসুন্ধরা সিমেন্ট কারখানার গেইটের সামনে সিমেন্ট বোঝাই কভার্ডভ্যানের চাপায় ট্রাক হেলাপর নিহত হয়েছে। একই বছরের ৬ জুন নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় সিমেন্টভর্তি একটি কাভার্ড ভ্যানের চাপায় পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আরিফুল হক আরিফ নিহত হয়েছেন।
রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়কের কাশীপুর হাটখোলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তাই সচেতন মহলের মতে এই সকল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা আবার অনিয়মে চলতে থাকে। তাদের এই অপিশাপ থেকে বাচতে প্রশাসনের এখনি ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ বলে মনে করেন পরিবেশ বিদরা।
এবিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।


