Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

বাংলা বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২২, ০৪:২৪ পিএম

বাংলা বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা
Swapno

যদিও পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নিয়ে ব্যাপক মন্তব্য রয়েছে। কিন্তু বাংলা সনের প্রবর্তনে সবার আগে যার নামটি আসে তিনি হলেন মুঘল সম্রাট বাবরের নাতি এবং হুমায়ুনের ছেলে সম্রাট আকবরের নাম। মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ভারতবর্ষের সম্রাটরা কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতে হিজরী পঞ্জিকা অনুসরণ করতো।

 

কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভর করায় প্রতি বছর সূর্যের হিসেব অনুযায়ী এবং ইংরেজি বছরের সাথে পার্থক্য থাকায় প্রতি বছরই সময় পিছিয়ে আসতো। ফলে তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এ কারণে সম্রাট আকবর প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দিয়ে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

 

তার আদেশে তখনকার রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি (যার নামে নারায়ণগঞ্জ জেলায় একটি মাঝার শরীফ আছে এবং ফতুল্লা নামের একটি এলাকা আছে) সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম চালু করেন। তখন থেকেই মূলত বাংলা সন গণনা শুরু হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন,

 

পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। তখন থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তবে ১৯৮৯ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রার সংযোজনের পর বাংলা বর্ষ অনুষ্ঠান আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। পরে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে।

 

মূলত স্বৈরাচারী শাসনের (এরশাদ সরকারের) বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে প্রবর্তন হয়। প্রথমে আনন্দ শোভাযাত্রা নাম দিয়ে শুরু করে পরে ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে নাম লাভ করে।

 

‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ প্রথমে ঢাকা শহরে এটি প্রবর্তিত হলেও পরে তা একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়।

 

যেমন বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি, বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, হাতি, কুমীর, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ এবং সাজসজ্জ্বা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য। স্থান পায় পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরো অনেক শিল্পকর্ম। এই আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু থেকেই জনপ্রিয়তা পেয়ে আসছে।

 

এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শিল্পী সামছুল আলম আজাদ বলেন, দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার আবারও বাংলা বর্ষবরণের আয়োজন শুরু হয়েছে। যদিও এখন মানুষের আর্থিক অবস্থা তেমন একটা ভাল নেই। আমরা স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি, আমাদের যা কিছু অন্যায্য, যা কিছু অন্যায় তা যেন আমরা পূণ্যের ছোঁয়ায় গড়ে তুলতে পারি।

 

আমাদের এবারের আয়োজনটাকে কিছুটা সীমিত করে আনা হয়েছে কারণ বেশিরভাগ ছাত্রদেরই পরীক্ষা চলছে তাছাড়া রমজান মাস অনেকেই রোজা রাখে। তিনি বলেন মানুষ কোন না কোন আয়োজনের মাধ্যমেই তার কৃষ্টি বা কালচারকে ধরে রাখে। সংস্কৃতি বা ধর্ম যেটাই বলেন না কেন এর মূল কাজ হলো মানুষের সম্পর্কটাকে ধরে রাখা।

 

আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে অর্থনীতি যতই উন্নত হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ততই অবনতি ঘটছে শ্রেনি বা গোষ্ঠি বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক মানদন্ড দিয়েই মানুষকে বিচার করে। এ জিনিসগুলো আমরা চাই না। এগুলোর উর্দ্ধে এসে সকল মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে কোন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে অসাম্প্রদায়িক হওয়টাই চাওয়া। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের সকলকে (একজনকে আরেক জনের) কাছাকাছি নিয়ে আসে। না হলে আমাদের আয়োজনটাই বৃথা।

 

তিনি বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৯৮৯সালে ঢাকা ইউনিভাসিটি থেকে শুরু হয়। সমস্ত ধর্ম বা গোষ্ঠীর মধ্যে একটি যাত্রা আছে। যেমন মুসলমানদের তাজিয়া মিছিল শোকের বার্তা বহন করে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আছে রথযাত্রা। তেমনি সমস্ত জাতি গোষ্ঠীর মধ্যেই যাত্রা আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই যাত্রাটি প্রথমে আনন্দ যাত্রা নামে শুরু হয়েছিল। এর কয়েক বছর আগেই পহেলা বৈশাখকে সরকার ছুটি ঘোষণা করে।

 

তিনি বলেন, আমাদের যে শিক্ষা পদ্ধতি বা কারিকুলাম তা ওয়েস্ট থেকে আসে। তবে আমাদের চারুকলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল অবেদীন একটি বীজ বপন করে গেছেন যে, আমাদের লোকশিল্পকে সারা বিশ্বের মধ্যে খুবই সমৃদ্ধ করে রাখতে হবে। মানুষের সবচেয়ে সহজাত শিল্প হচ্ছে লোকশিল্প। কোন কিছু না শিখে হাতের সামনে যা পাবে তা দিয়েই যা কিছু করে তাই লোকশিল্প।

 

দেখা যাচ্ছে এই শিল্পটা অনেক পুরানো, হাজার বছরের পুরানো। কবে এই আল্পনা আসছে, শখের হাঁড়ি আসছে, ডালা আসছে আমরা কেউ জানি না। মানুষ তার জীবনের প্রয়োজনেই জিনিসটা টিকিয়ে রাখছে। চারুকলা ইন্সটিউট কিংবা চারুকলা শিল্প এই সকল মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য একসাথে করার জন্য পুরানো ঐতিয্যগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। যেটা দেখে গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে যে, আমার ঘরে যা আছে তা ঢাকা শহরে বড় আকারে করতেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা মানুষের সাধারণ কর্মকে বড় প্রকাশ করতে চাচ্ছে, দেখাচ্ছে।

 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন